কোয়াসারদের ‘কোয়াড’! ডজনখানেক জট পাকিয়ে অক্ষ তৈরি করছে, বিরল মহাজাগতিক ঘটনা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডজনখানেক কোয়াসার একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে। মহাকাশে গুজগুজ, ফিসফিস চলছে। ব্ল্যাকহোলদের জটলা এখানে সেখানে থোকা থোকা হয়ে অক্ষ তৈরি করছে। যেন কোনও যুদ্ধের আগের প্রস্তুতি। মহাকাশে শক্তিশালী জোট তৈরি হচ্ছে। তারা ভাঙছে, গড়ছে, আলাদা আলাদা দল তৈরি করছে। এমন মহাজাগতিক ঘটনা বিরলই বটে।

কোয়সারদের কোয়াড তৈরি হয়েছে মহাকাশে, প্রথম খোঁজ দিয়েছে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) । সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের (ডিএসটি) গবেষকরা টেলিস্কোপ তাক করে দেখেছেন, ঝাঁকে ঝাঁকে ব্ল্যাকহোল যারা আকারে, ভরে দৈত্যের মতো, তারাই জট পাকিয়ে কোয়াড তৈরি করেছে। লেন্সে আলাদা করে এই অক্ষগুলিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

Seeing Quadruple – W. M. Keck Observatory

এখন প্রশ্ন হল কোয়াসার কী? কোয়াসার হল গ্যালাক্সির নিউক্লিয়াস তার মধ্যে দৈত্যাকার ব্ল্যাকহোল বা সুপার-ম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর মহাজাগতিক মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে। এই ব্ল্যাকহোলরা সূর্যের ওজনের চেয়ে ভারী হয় কয়েক লক্ষ থেকে কয়েকশো কোটি গুণ। এমন দৈত্যাকার ব্ল্যাকহোল একটি করে সব গ্যালাক্সিতেই থাকে। রয়েছে আমাদের মিল্কিওয়ে (ছায়াপথ) গ্যালাক্সিরও কেন্দ্রেও, পৃথিবী থেকে ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে, যার নাম ‘স্যাজিটারিয়াস-এ*’।

Astronomers discover quasars warped by naturally occurring cosmic lens-  Edexlive

আরও পড়ুন: ঝাঁকে ঝাঁকে তারারা জোট বেঁধেছে, পৃথিবীর প্রতিবেশী হয়ে এসেছে নতুন গ্যালাক্সি ক্লাস্টার

এই দানবের মতো ব্ল্যাকহোলদের নিজস্ব অভিকর্ষজ বল আছে, যার সাহাজ্যে এরা নক্ষত্র, মহাজাগতিক মেঘ বা মহাজাগতিক বস্তুকে নিজেদের দিকে টেনে আনতে পারে। মোদ্দা কথা, এই ব্ল্যাকহোলদের ধারেকাছে যারাই পড়বে তাদের নিজেদের দিকে জোরালো অভিকর্ষজ বল দিয়ে টেনে নেবে। সাধারণত দেখা যায়, যে কোনও গ্যালাক্সির মাঝে থাকা ব্ল্যাক হোলের অভিকর্ষ টান সাঙ্ঘাতিক হয়। ঘন জমাট বাঁধা গ্যাসের মেঘ বা তারা কাছে এসে পড়লে ওই রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোলগুলি তাদের জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে সেগুলিকে গিলে নেয়। সেগুলি আর ব্ল্যাক হোল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। খিদে মিটলে তার ভিতর থেকে উজ্জ্বল আলোর বিচ্ছুরণ দেখা যায়। যেগুলি আসলে প্রচণ্ড শক্তিশালী এক্স-রে বা গামা-রশ্মির স্রোত। যদি দেখা যায় কোনও বিশাল তারার সঙ্গে লড়াই বেঁধেছে ব্ল্যাক হোলের তাহলে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দও পাওয়া যায়। তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বেরিয়ে আসতে থাকে গ্যালাক্সি থেকে এবং মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায়।

 

আরও পড়ুন: মহাকাশে জমাট বেঁধেছে মেঘ, শোনা যাচ্ছে ‘হার্টবিট’, ছায়াপথের কাছেই ঘনিয়ে উঠছে রহস্য

ব্ল্যাকহোলদের ভুরিভোজের সময় এই যে প্রচণ্ড শক্তির বিকিরণ হয় তার তেজ ব্ল্যাকহোলদের অভিকর্ষজ বলের থেকেও বেশি। এই আলোক বিচ্ছুরণের কারণেই অন্ধকার মহাকাশে কোনও গ্যালাক্সির ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কোয়াসারগুলিকে দেখা যায়। আর যখন তারা নিজেদের মধ্যে জোট বাঁধে, তখন যে প্রচণ্ড শক্তি তৈরি হয় তার টানে গরম, উত্তপ্ত, গ্যাসীয় মেঘ কোয়াসারগুলিকে ঘিরে ফেলে। এই উত্তপ্ত মেঘ কোনও নতুন তারার জন্ম দিতে পারে না। কারণ শিশু তারার জন্মের জন্য ঘন ও ঠান্ডা জমাট মেঘের দরকার হয়। বিজ্ঞানীরা বলেন, গ্যালাক্সির মধ্যে শক্তিশালী অভিকর্ষজ বলের টানে ঘন থকথকে হয়ে জমাট বেঁধে থাকে গ্যাসীয় স্তরেরা। এই ঘন গ্যাসীয় পিণ্ড থেকেই খাবার সংগ্রহ করে কচি তারারা। ঠিক মাতৃগর্ভের মতোই। শিশু তারার জন্মের পরে তাকেও ঘিরে থাকে মেঘের স্তর। গ্যাসের ও জমাট বাঁধা ধুলোর স্তর থেকে পুষ্টি নিয়েই শরীর তৈরি হয় তারাদের।

Astronomers discover dozen quasars warped by naturally occurring cosmic ' lens' | Science-Environment

গবেষকরা বলছেন, এই অবস্থাটা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বড়জোর এটা হতে পারে ১ কোটি বছর ধরে। কোনও গ্যালাক্সির জীবন-চক্রের নিরিখে যা নেহাতই সামান্য বলা যায়। গ্যালাক্সির বিবর্তনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ারই অন্যতম এই ঘটনা। ডিএসটি ও আর্যভট্ট রিসার্চ ইনস্টিউট অব অবজারভেশনাল সায়েন্সের গবেষকরা বলছেন এই কোয়াসারের কোয়াড হল ‘সোনার খনি’। মহাকাশে অনেক অজানা রহস্যের সমাধান করবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More