সাপের মতো মানুষেরও বিষ হয় নাকি! ভারতীয় বিজ্ঞানীদের গবেষণা চমকে দিল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাপ তো এক ছোবলে ছবি করে দিতে পারে। মানে বিষাক্ত ভেনোমাস সাপ আর কী! মানুষও তেমনটা পারে নাকি?

সায়েন্স ফিকশনের গল্পে, পুরাণ বা নানা লোককথায় বিষকন্যা, বিষাক্ত মানুষের কথা আমরা শুনেছি। তাদের রক্তেই নাকি বিষ তৈরি হয়, কামড়ালেই নির্ঘাত মৃত্যু। তবে এসবই গল্প কথা। বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরাই বলছেন, মানুষও নাকি বিষ তৈরি করতে পারে। মানে বিষ তৈরির জন্য যে প্রক্রিয়া দরকার, তার প্রাথমিকটুকু মানুষের শরীরে আছে। বিবর্তনের ধারায় আগামী সময়ে মানুষও ভেনোমাস হয়ে উঠবে কিনা জানা নেই, তবে বিষ তৈরির যন্ত্রপাতি যে মানুষের শরীরে আছে তা জেনেই চমকে গেছেন বিজ্ঞানীরা।

না, কোবরা বা র‍্যাটল স্নেকের মতো মানুষ বিষ উগড়ে দিতে পারবে না। তবে বিষাক্ত কিছু প্রোটিন তৈরি হয় মানুষের শরীরেই। সেটা কেমন? জাপানের ওকিনাওয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ভারতীয় গবেষক অগ্নীশ বড়ুয়া বলছেন, মানুষের শরীরে এমন কিছু জিন আছে যারা এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে। তার মানে এমন নয় যে এইসব জিন থেকে টক্সিক উপাদান তৈরি হচ্ছে। আসল ব্যাপারটা হল, বিষ তৈরির জন্য যে মেকানিজম দরকার সেটা চালনা করতে পারে এইসব জিন। বিজ্ঞানের ভাষায় ভেনোম সিস্টেম (Venom System)-এর দেখাশোনা করতে পারে এই জিনগুলি।

আরও সহজ করে বলা যাক। এই যে সাপ, কয়েক প্রজাতির মাকড়সার মধ্যে বিষ থাকে তা তৈরি হয় ওরাল ভেনোম গ্ল্যান্ড থেকে। ওই ওরাল ভেনোম গ্ল্যান্ড হল আরও পরিবর্তিত স্যালিভারি গ্ল্যান্ড। থুতুর মধ্যে মিশে যায় বিষাক্ত প্রোটিন। সেই থুতু বা কষ শরীরে ঢুকলে স্নায়ুর দফারফা করে ফেলে। অস্ট্রেলিয়া কুইনসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট ব্রায়ান ফ্রাই বলছেন, এই গবেষণার এটাই হল ল্যান্ডমার্ক। যত ঘটনার ঘনঘটা ওই ওরাল স্যালিভারি গ্ল্যান্ডেই। মানুষের থুতুতে একরকম প্রোটিন বের হয় যার নাম কাল্লিক্রেইনস (Kallikreins) । এই প্রোটিন অন্যান্য প্রোটিনগুলোকে গিলে ফেলতে পারে। মানে নষ্ট করে দিতে পারে। এই প্রোটিন বিষ তৈরির অন্যতম উপাদান হতে পারে।

Venoms to the rescue | Science

গবেষক বড়ুয়া বলছেন, এই প্রোটিনের যদি মিউটেশন শুরু হয় তাহলে এমন বিষ তৈরি করতে পারে যা খুবই যন্ত্রণাদায়ক এবং প্রাণঘাতী। গবেষক আরও বলছেন, প্রাণীজগতে যত ভেনোমাস জীব আছে তাদের বিষের অন্যতম উপাদান এই প্রোটিন। কারণ কাল্লিক্রেইন খুবই সক্রিয় এনজাইম। তাই মানুষকে যদি সাপের মতো ভেনোমাস হতে হয়, তাহলে এই প্রোটিন প্রাথমিকভাবে দরকার।

The king cobra genome reveals dynamic gene evolution and adaptation in the  snake venom system | PNAS
কাল্লিক্রেইন এনজাইমও আছে সাপের বিষে

এখন ভেনোমাস আর পয়জনাসের মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। যে সব প্রাণীর কামড়ে বিষ শরীরে ঢোকে তারা ভেনোমাস। আবার যে সব প্রাণীকে খেয়ে ফেললে তাদের শরীরে সঞ্চিত বিষ আমাদের শরীরে ঢুকে যায় তারা পয়জনাস। সাপের বিষ তৈরি হয় তাদের ওরাল ভেনোমাস গ্ল্যান্ডে। সাপের চোয়ালের ঠিক পেছনে থাকে বিষথলি। আগেই বলেছি এই বিষথলি হল লালাগ্রন্থি বা স্যালিভারি গ্ল্যান্ডের পরিবর্তিত রূপ। এখানেই তৈরি হয় বিষাক্ত প্রোটিন যা লালার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। সব সাপের বিষে যে একরকম উপাদান থাকে তা নয়, বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিষ বিশ্লেষণ করে শতাধিক যৌগের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাপের বিষে থাকে প্রোটিন, এনজাইম (ট্রান্সফারেজ, হাইড্রোলেজ ও অক্সিডোরিডাকটেজ)। এই বিষ প্রাণঘাতী বটে, তবে স্বল্প মাত্রায় বিষের প্রয়োগ হলে শরীরের ইমিউনিটি বাড়ে। এর কারণই হল ওই সক্রিয় এনজাইমগুলোর উপস্থিতি।

গবেষকরা বলছেন, এই নতুন গবেষণার উদ্দেশ্যও তাই। মানুষকে ভেনোমাস করে তোলা বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য নয়, বরং এই বিষ তৈরির প্রক্রিয়া এবং কোন কোন জিন এই প্রক্রিয়ার পেছনে আছে তা জানতে পারলে অনেক দুরারোগ্য ব্যধির চিকিৎসা সম্ভব হবে। যেমন ভ্যামপায়ার বাদুড়দের বিষাক্ত লালা ব্লাড ক্লট রুখতে পারে। যে কোনও ক্ষত নিরাময়ে এই সেই লালা কাজে আসে। সাপের বিষকে কাজে লাগিয়ে ওষুধ তৈরির পদ্ধতি বহুকাল থেকেই আছে আমাদের দেশে। কাজেই মানুষের মধ্যেও যদি বিষ তৈরির যন্ত্রপাতি থাকে তাহলে সেটিকে মানুষের উপকারের কাজেই লাগানো যেতে পারে। তার জন্য সেই বিশেষ জিনগুলোকে খুঁজে বের করছেন বিজ্ঞানীরা। এই জিনের কারসাজি ধরে ফেললেই অনেক মারণ রোগের প্রকোপ থেকেও জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More