ধ্বংসের মধ্যেই সৃষ্টি! ডাইনোসরদের বিলুপ্তির কারণ যে দানব গ্রহাণু, তাই সৃজন করে আমাজন বৃষ্টিঅরণ্য

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একদিকে ধ্বংস, অন্যদিকে সৃষ্টি।

পৃথিবীর আদিম যুগের কথা। যখন ফুঁসে উঠত আগ্নেয়গিরি। ঘন ঘন উল্কা আর ধূমকেতুরা ভীষণ চেহারা নিয়ে চোখ রাঙিয়ে যেত। পৃথিবীর আশপাশে হুঙ্কার দিয়ে ঘুরে বেড়াত দানবের মতো মহাজাগতিক বস্তুরা। লাভা আর অগ্ন্যুৎপাতে ভেসে যেত সবুজ প্রান্তর। আজ থেকে প্রায় ৬.৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর চেহারা এমন ছিল না। নীল গ্রহের শরীরে তখন তেজ বেশি ছিল। আগ্নেয় গোলার মতো ফুটন্ত লাভারা টগবগ করত পৃথিবীর অন্দরে। ডাইনোসরের মতো বিশাল আকৃতির সরীসৃপরা দাপিয়ে বেড়াত। একদিন এই পৃথিবীর সঙ্গেই টক্কর হয়েছিল এক রাক্ষুসে গ্রহাণুর। তার আগুনে শরীর থেকে টুকরো টাকরা খসে পড়ে উল্কাবৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে। মহাপ্রলয় হয়েছিল। পৃথিবীর থেকে মুছে গিয়েছিল এক তৃতীয়াংশের বেশি প্রাণ। ডাইনোসরদের বিলুপ্তির কারণও এই গ্রহাণু, তেমনটাই এখন অনুমান করেন বিজ্ঞানীরা। তবে পুরোটাই কি ধ্বংস হয়েছিল? নাকি ধ্বংসের আড়ালে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল? সে নিয়েই গবেষণা এতদিনে সাফল্যের মুখ দেখল।

Asteroid impact

১২ কিলোমিটার পরিধির দানব গ্রহাণু আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল, ধ্বংস করেছিল মাইলের পরে মাইল জুড়ে সবুজ প্রান্তর। বেশ কিছু প্রজাতির উদ্ভিদ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন জন্মও হয়েছিল। পানামার স্মিথসোনিয়ান ট্রপিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সম্মিলিত গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই আশ্চর্য তথ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সবুজ নষ্ট হয়েছিল, আগুনের গোলায় ছাড়খাড় হয়ে গিয়েছিল।

Dino-Killing Asteroid May Have Formed Earth's Rainforests

Asteroid that eliminated dinosaur gave rise to Amazon rainforest

কিন্তু এর কয়েক হাজার বছর পর থেকে সে জায়গাতেই নতুন জঙ্গল তৈরি হতে শুরু করেছিল। মস, ফার্ন ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের জায়গায় বড় বড় গাছ, ফুলের গাছ জন্ম নিতে শুরু করেছিল। বীজ ছড়িয়ে পড়েছিল ঝলসে যাওয়া মাটিতে। বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫০ হাজার রেণু ও ৬ হাজার পাতার জীবাশ্ম পরীক্ষা করে এই খোঁজের কথা জানিয়েছেন। সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার খবর ছাপাও হয়েছে।

মুখ্য বিজ্ঞানী ডক্টর মোনিকা কারভালো বলছেন, ফসিল হয়ে যাওয়া রেণুর কিছুটা ডাইনোসর পূর্ববর্তী যুগের, বাকিটা পরবর্তী সময়ের। পাতার জীবাশ্মও তেমনই। এই দুই সময়ের ফসিল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডাইনোসরদের জীবনকালে যে ধরনের উদ্ভিদ বা বীজ জন্মাতো, পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত প্রজাতির উদ্ভিদের জন্ম হয় পৃথিবীর মাটিতে। এমনকিও এও দেখা যায়, মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে আসা ধুলো, পাথর ও রাসায়নিক কণা নতুন উদ্ভিদ জন্মের জন্য দায়ী।

Asteroid That Eliminated Dinosaur Gave Rise To Amazon Rainforest | Science  & Tech

ডাইনোসরদের সময় এত ঘন অরণ্য ছিল না পৃথিবীতে। মাটিতে ছোট ছোট গুল্ম জাতীয় গাছ বেশি জন্মাত। তাছাড়া ছিল কনিফার জাতীয় অ্যাঞ্জিওস্পার্ম উদ্ভিদ। গ্রহাণু আছড়ে পড়ার পরবর্তী সময়ে যখন নতুন করে প্রাণের জন্ম হতে থাকে তখন কনিফার উদ্ভিদের বদলে ফুল ও ফল সৃষ্টিকারী জিমনোস্পার্ম জাতীয় উদ্ভিদের জন্ম হয়। মানে এখন আমরা যে বড় বড় গাছপালা দেখি, ঘন অরণ্য দেখি, তা সৃষ্টি হয় সেই মহাপ্রলয়ের পরেই।

গবেষকরা বলছেন, গ্রহাণু আছড়ে পড়ার পরেই তৈরি হয়েছিল চিকসুলুব গহ্বর। মেক্সিকোর উপত্যকায় এই গহ্বর নিয়ে আগেও রহস্য তৈরি হয়েছিল। গবেষকরা এখানকার ধুলো, মাটি নিয়ে পরীক্ষা করে মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন। মহাজাগতিক ধুলো ছড়িয়ে আছে এই গহ্বরে যা এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে। ধুলো, মাটির স্তরে পাওয়া গেছে ইরিডিয়াম যা ডাইনোসরদের জীবাশ্মের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছে অনেকবারই। ওই এলাকাতেও যে গাছপালার জন্ম হয়েছে তার জীবাশ্মের মধ্যে মহাজাগতিক কণার খোঁজ পাওয়া গেছে।

Amazon Rainforest Origin: Did the Asteroid That Caused Dinosaur Extinction  Started It? | Science Times

পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন বৃষ্টিঅরণ্য সৃষ্টির জন্যও ওই মহাপ্রলয় দায়ী, এমনটাই দাবি বিজ্ঞানীদের। দক্ষিণ আমেরিকায় আমাজন নদীর অববাহিকায় প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে যে বৃষ্টিঅরণ্য গড়ে উঠেছে তার বয়স আনুমানিক তিন হাজার বছর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, রাজকীয় এই অরণ্যে এত লক্ষ কোটি উদ্ভিদের জন্ম হয়েছে সেই গ্রহাণু আছড়ে পড়ার পরেই। গ্রহাণু বা ধূমকেতুর বিচ্ছিন্ন অংশ পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার তাদের ক্রিয়া-বিক্রিয়া শুরু করে। আর এ কাজে সাহায্য করেছিল ওই সব মহাজাগতিক বস্তুরই সঙ্গে করে আনা বরফ। যা ধূমকেতুর আঘাতে পৃথিবীর বুকে তৈরি হওয়া বিশালাকার গর্তগুলোকে ভরে দিয়েছিল জলে। যা থেকেই তৈরি হয় সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের আড়ালেই আগ্নেয়গিরির তাপে নিজেদের মধ্যে বিক্রিয়া করতে থাকে মহাজাগতিক বস্তুর আনা কণাগুলো। গবেষকদের মত, লক্ষ কোটি বছর আগের মহাজাগতিক বস্তুরা সঙ্গে করে বরফ আর রাসায়নিক কণা নিয়ে এসেছিল যা প্রাণ তৈরির অন্যতম উপাদান। মহাজাগতিক বস্তুকণার রাসায়নিক মাটিতে মিশে আরও সুজলা সুফলা ধরিত্রী তৈরি করেছিল। ধ্বংসের পরে যেখানে নতুন করে প্রাণের সৃজন হয়েছিল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More