শুক্রাণু-ডিম্বানু ছাড়াই পরীক্ষাগারে তৈরি হল মানবভ্রূণ, বিশ্বে প্রথম বড় আবিষ্কার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুক্রাণু নেই, ডিম্বানুও নেই। নিষেকও হয়নি। তাও জন্ম নিয়েছে মানবভ্রূণ।

চিন্তাভাবনারও যা বাইরে, তাই করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রথম গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে মানবভ্রূণের আদিদশা তৈরি করা হয়েছে। যে কোষ মায়ের গর্ভে বেড়ে মানবশিশুর চেহারা নেবে, তারই প্রাথমিক রূপটা তৈরি করে ফেলেছেন গবেষকরা। সোজা কথায় বলতে গেলে, কৃত্রিমভাবে মানুষ তৈরির প্রক্রিয়ার প্রথম সিঁড়িতে পা দিয়ে ফেলেছেন গবেষকরা।

Scientists create first complete human embryo model in Petri dish | Science| In-depth reporting on science and technology | DW | 17.03.2021

স্ত্রী ও পুরুষের শরীর থেকে নেওয়া ডিম্বানু ও শুক্রাণুর মিলন ছাড়াই কৃত্রিমভাবে মানুষের ভ্রূণ তৈরি করার চেষ্টা চলছিল বহু বছর ধরেই। নানা রকম গবেষণা হয়েছে। কিন্তু বারে বারেই ব্যর্থতা এসেছে। সেই সঙ্গে নীতিগতভাবে নানা নিয়মকানুনের বাধাও টপকাতে হয়েছে। একই মানুষের প্রতিরূপ বা হিউম্যান ক্লোনিং নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক, আইনি ঝামেলা, প্রতিবাদ-আন্দোলন সবই হয়েছে। এই গবেষণার ওপর নিষেধাজ্ঞাও চাপানো হয়েছে। একই রকম সমস্যা ছিল কৃত্রিমভাবে মানবভ্রূণ তৈরির গবেষণা নিয়েও। তবে এই প্রথমবার এত বড় পরীক্ষাতে সাফল্য এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মানুষের ভ্রূণ তৈরির কোষ কৃত্রিমভাবে বানিয়ে ফেলেছেন। ‘নেচার’ সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার খবর ছাপা হয়েছে।

Skin cells used to produce first complete model of early human embryo

বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন কৃত্রিম ‘এমব্রায়ো’ বা ভ্রূণ ‘ব্লাস্টয়েড’ ।  এই ব্লাস্টয়েড থেকেই মানব শরীর, অঙ্গপ্রতঙ্গ তৈরি হবে। ব্যাপারটা খুলে বলা যাক। বিজ্ঞানীরা দুভাবে এই পরীক্ষা করেছেন। প্রথমত, মানুষের ত্বকের কোষ নিয়ে তার মধ্যে জিনের গঠনবিন্যাস নতুন করে সাজিয়েছেন। মানে জেনেটিক্যালি রিপ্রোগ্রাম করে সেই কোষকে ভ্রূণের প্রাথমিক চেহারা দেওয়া হয়েছে। ভ্রূণ ঠিক যেমন আকৃতির সেই গোলাকার রূপ দিয়েছেন গবেষকরা। আর এই কোষ দেখতে হয়েছে অবিকল মানুষের ভ্রূণের কোষ ব্লাস্টোসিস্টের (Blastocyst) মতো।

Graphic showing the difference between iBlastoid and human-blastocyst development

দ্বিতীয় গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা পূর্ণবয়স্ক মানুষের স্টেম কোষ (Stem Cell) নিয়ে একইরকম গবেষণা করে ব্লাস্টোসিস্ট তৈরি করেছেন।

Human embryo-like model created from human stem cells

এখন প্রশ্ন হল ব্লাস্টোসিস্ট কী?  সহজ করে বলতে গেলে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ভ্রূণ তৈরির আদিদশাকে বলে ব্লাস্টোসিস্ট। শুক্রাণু-ডিম্বানুর মিলন হওয়ার পাঁচ দিন পরে যে কোষ প্রাথমিকভাবে তৈরি হয় তাকেই ব্লাস্টোসিস্ট বলে। প্রথম পর্যায়ে ১৬টি কোষ নিয়ে গোলাকার বলের মতো গঠন তৈরি হয়। এর পরিধি হয় ০.১-০.২ মিলিমিটার। ধীরে ধীরে এই গোলাকার বলটা বড় হতে থাকে। ২০০-৩০০ কোষ থাকে। এই কোষেগুলির আবার বিভাজন শুরু হয়। এরপর ব্লাস্টোসিস্ট জরায়ুর মধ্যে ইমপ্ল্যান্ট হয় এবং ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ভ্রূণের চেহারা নিতে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার গবেষকরা এই ব্লাস্টোসিস্টই তৈরি করে ফেলেছেন।

Examples of human blastocyst morphology evaluation. (A) High-quality... | Download Scientific Diagram
ব্লাস্টোসিস্ট

গবেষকরা বলছেন, কৃত্রিমভাবে তৈরি ব্লাস্টোসিস্টের মধ্যে এমন কোষও ঢোকানো হয়েছে যার থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হতে পারে। শুক্রাণু-ডিম্বাণুর নিষেকে তৈরি সাড়ে তিন দিন বয়সি একটি স্বাভাবিক ভ্রূণ থাকলে মাতৃজঠরে যা যা পরিবর্তন ঘটার কথা, এ ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই ঘটতে পারে। অর্থাৎ এই পরীক্ষা যদি শেষ অবধি সফল হয়, তাহলে গবেষণাগারেই কৃত্রিমভাবে প্রথম মানব শিশু তৈরি করা সম্ভব হবে। তবে সেই অবধি গবেষণা এগোতে এখন অনেক সময় লাগবে।

আইভিএফের সঙ্গে এই আবিষ্কারকে গুলিয়ে ফেললে কিন্তু চলবে না। প্রাকৃতিক বা জৈবিক উপায়ে যাঁরা সন্তান লাভ করতে পারছেন না, আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান তাঁদের জন্য বিকল্প বন্দোবস্ত করেছে। ভিট্রো কথার মানে হল শরীরের বাইরে। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে শরীরের বাইরে জীবন সৃষ্টি করা হয় বলে পদ্ধতিটিকে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বলে। পরিচিত নাম, টেস্ট টিউব বেবি। সেক্ষেত্রে কিন্তু শুক্রাণু ও ডিম্বানু আবশ্যক। অর্থাৎ নারী ও পুরুষের প্রয়োজন। কিন্তু এই গবেষণা তার থেকে একেবারেই আলাদা। এখানে শুধুমাত্র মানব শরীরের কোষ প্রয়োজন। বাকিটা জিনের খেলা। গবেষকরা বলছে, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে এই গবেষণা মাইলফলক হতে পারে। যে মহিলারা এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা ফাইব্রয়েডে ভুগছেন তাঁদের মধ্যে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা বেশি। শুক্রাণুর অস্বাভাবিকতা, ডিম্বাশয়, ডিম্বনালী বা জরায়ুর সমস্যা, ডিম্বাণু নিঃসরণে অসুবিধে, এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রেও গর্ভধারণে সমস্যা হয়। সেক্ষেত্রেও এই গবেষণা অন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তবে সমস্যাও আছে। কৃত্রিমভাবে মানুষের জন্ম দেওয়ার উপায় আয়ত্ত করে ফেললে তার পরিণাম আগামীদিনে কী হতে পারে সে নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাচ্ছে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More