পশুদের শরীরে করোনা ঢুকছে কী করে? হাই-রিস্ক গ্রুপে কোন প্রাণিরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশুদের শরীরে কি মানুষের মতো করোনা সংক্রমণ ছড়াতে পারে?

এই উত্তরটা খুঁজতে তোলপাড় করে গবেষণা চালাচ্ছে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। করোনাভাইরাসের সঙ্গে যখন পরিচিত হতে শুরু করে মানুষ, তখন বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন পশুদের শরীরে ভাইরাস ঢোকার সম্ভাবনা খুব কম। প্রায় নেই বললেই চলে। এমনকি পশুদের থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর তেমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কাজেই চিন্তার কারণ নেই।

বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অবশ্য মানেননি অনেকেই। চিনে করোনা যখন অতিমহামারী, তখন পোষ্য বিড়াল, কুকুরদের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করতে দেখা গিয়েছিল অগণিত মানুষকে। পশু হত্যার সেই নির্মম দৃশ্য দেখে শিউরে উঠেছিল বিশ্ব। এরপর বিজ্ঞানীরা বলেন, করোনাভাইরাসের সার্স-কভ-২ প্রজাতির বাহক বাদুড় ও মধ্যবর্তী বাহক প্যাঙ্গোলিন। এদের থেকে সংক্রমণ পশুদের মধ্যে ছড়ালেও ছড়াতে পারে। বিশেষ করে বিড়ল বা বিড়াল গোত্রের প্রাণিদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়ায় কয়েকটি পোষ্য বিড়ালের মধ্যে কোভিড সংক্রমণের উপসর্গও দেখা দেয়। ফলে পশুদের শরীরে কোভিড সংক্রমণ বাসা বাঁধতে পারে কিনা, সে নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়ে যায়।

COVID-19 crisis: In a first in India, eight lions test positive in Hyderabad zoo

সম্প্রতি হায়দরাবাদের নেহেরু জুলজিক্যাল পার্কের ৮টি সিংহ কোভিড পজিটিভ হওয়ার পরে চিন্তা আরও বেড়েছে। মানুষের মতোই নাকি তাদের সংক্রমণের উপসর্গ দেখা গিয়েছে। খাবারের অনীহা, শ্বাসকষ্ট, শুকনো কাশি। রিয়েল টাইম আরটি-পিসিআর টেস্ট করিয়ে নমুনায় ভাইরাল স্ট্রেনও পাওয়া গিয়েছে। মনে পড়ে, এ বছরই ফেব্রুয়ারিতে লাহোরের চিড়িয়াখানায় ১১ মাসের দুটি সাদা বাঘের ছানার মৃত্যু হয়েছিল কোভিড সংক্রমণে। তাদেরও নমুনায় মিলেছিল ভাইরাসের স্ট্রেন। কাজেই পশুদের শরীরেও যে সার্স-কভ-২ বাসা বাঁধতে পারে, সে নিয়ে এখন আর কোনও সন্দেহই নেই বিজ্ঞানীদের। তবে চিন্তাটা অন্য জায়গায়। তা হল, এই ভাইরাস পশুদের শরীরে ছড়াচ্ছে কীভাবে, মানুষের থেকে কি তার মানে সংক্রমণ পশুদের শরীরে ঢুকছে, নাকি অন্য কোনও কারণ আছে—সম্ভাব্য কয়েকটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

Dutch Minks Infected By COVID-19 — And Appear To Infect Humans : Goats and Soda : NPR

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানাচ্ছে, কুকুর, বিড়াল ও বিড়াল গোত্রের প্রাণিদের মধ্যে সার্স-কভ-২ ভাইরাস ছড়াতে পারে। বাঘ, সিংহ, পুমা, স্নো লেপার্ড, রেকুন, ফেরেট, মিঙ্ক জাতীয় প্রাণীরা করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি মানুষের মতোই সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিতে পারে এই প্রাণিদের শরীরে। আবার বাঁদর, গোরিয়া, শিম্পাঞ্জিদের মতো প্রাণিরাও মানুষের মতো করোনায় আক্রান্ত হতে পারে।

Cartoon of a cat, bats, ferret, mink and pig holding name cards as if in a police lineup with a virus shaped spotlight on them

চিড়িয়াখানা, অভয়ারণ্যে থাকা বন্য প্রাণিরা যেমন কোভিড আক্রান্ত হতে পারে তেমনি খামারে পালিত পশুদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিঙ্ক জাতীয় প্রাণিদের প্রতিপালন করা হয় ফার্মগুলিতে ভয়ঙ্কর সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। খামারের পর খামার উজাড় হয়ে গিয়েছিল। শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছিল প্রাণিগুলির। নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, পোলান্ডের মিঙ্ক ফার্মগুলিতে একই ঘটনা ঘটেছিল। মিশিগানের একটি মিঙ্ক ফার্মের সংক্রমিত প্রাণিদের থেকে আবার মানুষের মধ্যেও ছড়িয়েছিল সংক্রমণ। বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, মিঙ্কের শরীরে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের একপ্রকার মিউটেশন বা জিনের বিন্যাসগত বদল হয়েছে। যে কারণেই প্রাণির শরীর থেকে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়েছে ভাইরাসের সংক্রমণ। সে ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম।

Coronavirus outbreak: Zoos asked to remain on high alert | Deccan Herald

এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রাণিদের শরীরে করোনা ঢুকছে কী করে? বেলজিয়ামের বায়োলজিস্ট সোফি গ্রিসেলসের একটি গবেষণার প্রতিবেদন বেড়িয়েছে নেচার পত্রিকায়। তিনি বলেছেন, অনেকগুলো কারণে বন্যপ্রাণিরা বা খামারের পালিত পশুরা কোভিড আক্রান্ত হতে পারে। এক, মানুষের সংস্পর্শ। বিশেষ করে চিড়িয়াখানা বা অভয়ারণ্যে যেখানে মানুষের কাছাকাছি বন্যপ্রাণিরা রয়েছে, সেখানে এই সম্ভাবনা বেশি। পশুদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কারও যদি কোভিড সংক্রমণ থেকে থাকে, তাহলে পশুদের শরীরে ভাইরাস ঢুকে পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়। সংক্রমিত একটি পশুর থেকে বাকিদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

Frontiers | The Potential Intermediate Hosts for SARS-CoV-2 | Microbiology

এমনও দেখা গেছে, বিড়াল ও ফেরেট জাতীয় ইউরোপীয়ান পোলক্যাটের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেন নাকি খুব সহজে বিড়ালের শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, আক্রান্ত একটি বিড়ালের থেকে সংক্রমণ বাকিদের মধ্যেও ছড়াতে পারে।

দুই, Rhinolophus spp নামে বাদুড়ের একটি প্রজাতি থেকে বন্য পশুদের শরীরে সংক্রমণ ঢুকতে পারে। বিশেষ করে, বনে জঙ্গলে যে প্রাণিরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের এইভাবে সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে। বিজ্ঞানী বলছেন, খামারের পশুদের সংক্রমণ ধরার শঙ্কা কিছুটা হলেও কম, কারণ তাদের পরিচর্জা করা হয়, ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। কিন্তু বন্য প্রাণিরা সে সুরক্ষা পায় না। যদি বনে-জঙ্গলে প্রাণিদের মধ্যেও সংক্রমণ ঢুকে পড়তে শুরু করে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তিন, বিজ্ঞানী বলছেন সার্স-কভ-২ ভাইরাস এয়ারবোর্ন, মানে হাওয়ার সূক্ষ্ম কণা বা অ্যারোসলে ভেসে বহুদূর অবধি ছড়াতে পারে। অ্যারোসল এত সূক্ষ্ম কণা যে তাতে ভর করে ভাইরাস দীর্ঘক্ষণ বাতাসে বেঁচে থাকতেও পারে। হতেই পারে চিড়িয়াখানা বা অভয়ারণ্যগুলিতে মানুষের থেকেই সংক্রমণ অ্যারোসলে ভেসে পশুদের শরীরেও ঢুকে পড়ছে। এইভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে। ঠিক যেমন হায়দরাবাদের চিড়িয়াখানায় ৮টি সিংহ আক্রান্ত হয়েছে পর পর।

বিজ্ঞানী সোফি বলছেন, প্রাণিদের শরীরে সংক্রমণ কীভাবে ছড়াচ্ছে এবং তা রোধ করা যায় কীভাবে সে নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব অ্যানিমাল হেলথ। কোন কোন পশু হাই-রিস্ক গ্রুপে আছে তা চিহ্নিত করে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More