মেক্সিকোর গহ্বরে লুকিয়ে ডাইনোসরদের ধ্বংসের কারণ, সাড়ে ৬ কোটি বছর আগের রহস্যের জট খুলল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবী তখন অশান্ত। ঘন ঘন উল্কাবৃষ্টি হচ্ছে। ফুঁসে উঠছে আগ্নেয়গিরি। মহাজাগতিক বস্তুরা পৃথিবীর আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। বিশালাকার ধূমকেতুর সঙ্গে টক্কর হচ্ছে পৃথিবীর। আজ থেকে আনুমানিক ৬.৬ কোটি বছর আগের কথা। সে সময়ে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াত ডাইনোসররা। তার পর ঠিক কী হল যে একটা আস্ত প্রজাতিই উবে গেল পৃথিবী থেকে?

ডাইনোসরদের বিলুপ্তির কারণ নিয়ে অনেক তথ্যই আছে। বছরের পর বছর ধরে এই নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশালাকার এই সরীসৃপদের ধ্বংসের কারণ জানতে পারলে সে সময়ের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও ভূতাত্ত্বিক গঠনের অনেক তথ্যই পাওয়া যাবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি একটা কারণ তুলে ধরেছেন যা নিয়ে হইচই হচ্ছে বিজ্ঞানীমহলে। গবেষকরা বলছেন, ডাইনোসরদের বিলুপ্তির রহস্য লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বুকেই। মেক্সিকোর গহ্বর এই রহস্যের জট খুলছে।

Dinosaur-Killing Chicxulub Asteroid Hit Earth at Angle of 60 Degrees | Geoscience, Paleontology | Sci-News.com

চিকসুলুব গহ্বর, মেক্সিকোর উপত্যকায় এই গহ্বর নিয়ে আগেও রহস্য তৈরি হয়েছিল। গবেষকরা এখানকার ধুলো, মাটি নিয়ে পরীক্ষা করে মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন। মহাজাগতিক ধুলো ছড়িয়ে আছে এই গহ্বরে যা এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে। ধুলো, মাটির স্তরে পাওয়া গেছে ইরিডিয়াম যা ডাইনোসরদের জীবাশ্মের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছে অনেকবারই। অর্থাৎ এই রাসায়নিক সে সময়ও ছিল যখন ডাইনোসররা চলে ফিরে বেড়াত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে।

Ancient life signs under dinosaur-killing Chicxulub crater | Space | EarthSky

আরও পড়ুন: প্রাচীনতম দৈত্যাকার ডাইনোসরের জীবাশ্ম মিলল আর্জেন্টিনায়, হারিয়ে গিয়েছিল ১৪ কোটি বছর আগে

Dinosaur-Killing "Chicxulub" Asteroid Everyone's Talking About: Key Facts, Numbers and Figures

হার্ভার্ডের গবেষকরা বলছেন, চিকসুলুব ইম্প্যাক্টর হল দানব গ্রহাণু যা আছড়ে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে। বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিবীর মাটিতে আছড়ে পড়ার আগে বায়ুর কণার সঙ্গে ঘর্ষণে আগুন জ্বলে যায়। অজস্র আগুনে কণা উল্কার মতো ছিটকে পড়ে পৃথিবীতে। বিশাল ফাটল তৈরি হয় মেক্সিকান পেনিনসুলায়। এই গ্রহাণু দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় ১১ থেকে ৮১ কিলোমিটার। পৃথিবীর পৃষ্ঠে ১৫০ কিলোমিটার পরিধির গর্ত তৈরি করে যার গভীরতা প্রায় ২০ কিলোমিটার। ভূবিজ্ঞানী অ্যান্টোনিও কামারাগো ও গ্লেন পেনফিল্ড পেট্রোলিয়ামের খোঁজ করতে গিয়ে এই গহ্বর আবিষ্কার করেন। তারপর থেকেই পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। এখন তো এই গহ্বরে মহাজাগতিক ধুলোরও খোঁজ মিলেছে।

Chicxulub residents hope for more exposure for meteorite crater – The Yucatan Times

গবেষকরা বলছেন, এই গ্রহাণু বা অ্যাস্টরয়েড ধূমকেতুর অংশ। মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে ছিটকে যাওয়া পাথর বা ধাতব খণ্ড প্রবল বেগে ঢুকে পড়েছিল আমাদের পৃথিবীতে। জ্বলতে জ্বলতে আছড়ে পড়ছিল পৃথিবীর মাটিতে। সেই উল্কাবৃষ্টির কারণে পৃথিবীর বুকে অজস্র ক্ষতও তৈরি হয়েছিল। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বহু প্রাণ।

What Really Killed the Dinosaurs? Asteroid and Volcanoes Might Share the Blame | Space

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বয়স আনুমানিক ৪৫০ কোটি বছর। জন্মের প্রথম ৫০ কোটি বছরে পৃথিবী পৃষ্ঠ অনেক বেশি উত্তপ্ত ছিল। সেই সময়েই বারে বারেই উল্কাপিণ্ডের মতো মহাজাগতিক বস্তুরা পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। এই চিকসুলুব খাত যেমন তার উদাহরণ। গবেষকরা বলছেন, প্রাণ কেন ধ্বংস হয়েছিল তা জানা যায় এই ক্রেটার বা গহ্বরগুলিকে পরীক্ষা করলে।

Dinosaur Killer Chicxulub Crater To Be Drilled For First Time - Universe Today

হার্ভার্ডের অধ্যাপক কসমোলজিস্ট লিজা র‍্যানডেল বলেছেন, গ্রহাণু বা ধূমকেতুর বিচ্ছিন্ন অংশ পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার তাদের ক্রিয়া-বিক্রিয়া শুরু করে। আর এ কাজে সাহায্য করেছিল ওই সব মহাজাগতিক বস্তুরই সঙ্গে করে আনা বরফ। যা ধূমকেতুর আঘাতে পৃথিবীর বুকে তৈরি হওয়া বিশালাকার গর্তগুলোকে ভরে দিয়েছিল জলে। যা থেকেই তৈরি হয় সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের আড়ালেই আগ্নেয়গিরির তাপে নিজেদের মধ্যে বিক্রিয়া করতে থাকে মহাজাগতিক বস্তুর আনা কণাগুলো। গবেষকদের মত, লক্ষ কোটি বছর আগের মহাজাগতিক বস্তুরা সঙ্গে করে বরফ আর রাসায়নিক কণা নিয়ে এসেছিল যা প্রাণ তৈরির অন্যতম উপাদান, যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে।

লক্ষ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া এমনই তিনটি উল্কাপিণ্ড নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তার মধ্যে একটি আছড়ে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৬৯ সালে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন এই উল্কাপিণ্ডগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এদের মধ্যে রাইবোজ (Ribose) গোত্রের বায়ো-এসেন্সিয়াল সুগার রয়েছে। তা ছাড়া রয়েছে আরাবিনোজ (arabinose) ও জাইলোজ (xylose) সুগার গোত্রের দু’টি যৌগ। তিনটি উল্কাপিণ্ডেই রয়েছে কার্বন যা প্রাণ তৈরির উৎস। NWA 801 (টাইপ সিআর২) এবং মুর্চিসন (Murchison)টাইপ সিএম২) এই দু’রকম কার্বনের হদিস পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More