কড়কড় করে বিদ্যুৎ চমকালে শুদ্ধ হয় দূষিত বাতাস, জ্বলেপুড়ে যায় মিথেন, গ্রিন হাউস গ্যাসেরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কালো মেঘের বুক চিরে যখন বিদ্যুতের আলপনা ফুটে ওঠে আকাশে তখন ঠিক কেমন লাগে? ঝোড়ো হাওয়ায় বিদ্যুতের কড়কড়ানি বুকে কাঁপন ধরায় ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুতের চমকানি আসলে পরিবেশকেই বিশুদ্ধ করে।

অবাক হচ্ছেন তো! এটাই সত্যি। বৈজ্ঞানিক উপায় পরীক্ষিত সত্যি। আকাশের এ পার থেকে ও পার অবধি যখন যখন ঝলসে ওঠে বিদ্যুতের শাখাপ্রশাখা, তখন তারা বাতাস পরিশোধনের কাজই করে। তীব্র বেগে ছুটে চলা বিদ্যুতের প্রবাহ বাতাসে মিশে থাকা দূষিত গ্রিন হাউস গ্যাসগুলোর বুক চিরে ফালাফালা করে দেয়। জ্বলেপুড়ে যায় মিথেন গ্যাস। বাতাসের দূষিত কণাগুলো ভেঙেচুরে গিয়ে ঝলসে যায়। বিজ্ঞানীরা এই প্রথম এমন পর্যবেক্ষণ করেছেন। ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ’ জার্নালে এই গবেষণার খবর সামনে এসেছে।

Study Says Lightning Produces an 'Atmospheric Detergent'

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে বাতাস পরিশোধনের কী সম্পর্ক আছে?

সম্পর্কটা বেশ গভীরই বটে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিদ্যুৎ যখন গর্জায় তখন বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অনুগুলো মিলেমিশে গিয়ে নাইট্রিক অক্সাইড ও ওজোন তৈরি করে। আবার হাইড্রজেন অক্সাইডও তৈরি হয়—হাইড্রক্সাইল (OH) + হাইড্রপেরোক্সাইল (HO2)। এই হাইড্রক্সাইল যৌগ মিথেনের যম। গ্রিন হাউস গ্যাসের দফারফা করতে পারে।

এমনিতে বিদ্যুতের চমক আর বৃষ্টির রসায়নটা আমাদের অনেকেরই জানা। তবে গোড়া থেকে বললে বুঝতে সুবিধা হবে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে বেশি থাকে নাইট্রোজেন, প্রায় ৭৮ শতাংশ। ১৪ গ্রাম আণবিক ভরবিশিষ্ট নাইট্রোজেন পরমাণু নিজের সঙ্গে শক্তিশালী ত্রি-বন্ধনে যুক্ত হয়ে নাইট্রোজেন গ্যাসে (N2) পরিণত হয়। আমাদের বায়ুমণ্ডলে এটিই সবচেয়ে বেশি থাকে। যখন বজ্রপাত হয় তখন ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই নাইট্রোজেন অণু বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) তৈরি করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO3) হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ে ও মিশে যায়। তারপর মাটির কার্বোনেট লবণের সঙ্গে মিলে গিয়ে নাইট্রেট লবণ তৈরি করে। এই নাইট্রেট লবণ গাছপালার পুষ্টি জোগায়। কারণ গাছপালা এই লবণ তাদের মূল দিয়ে মাটি থেকে শুষে নেয়। আবার যখন উদ্ভিদের মৃত্যু হয় তখন তাদের শরীর অনুজীবররা পচিয়ে দিয়ে নাইট্রোজেন আবার বাতাসে ফিরিয়ে দেয়। একে বলে নাইট্রোজেন চক্র। এই প্রক্রিয়া চক্রাকারে চলতেই থাকে।

How Lightning Helps Clean the Air by Breaking Down Greenhouse Gases |  Nature World News

বিদ্যুৎ যখন চমকায় তখন একদিকে ওজোন তৈরি হয় যা পরিবেশের জন্য দরকার, অন্যদিকে হাইড্রজেন যৌগ তৈরি হয় যার হাইড্রক্সাইল রেডিকাল গ্রিন হাউস গ্যাসগুলিকে আক্রমণ করে। বিশেষত মিথেন গ্যাসকে ভেঙে দেয়।

বিশ্ব উষ্ণায়ণের জন্য যে গ্যাসগুলি দায়ী তাদের আমরা সকলেই চিনি। কার্বন, সালফার, নাইট্রোজেনের মনোক্সাইড ও ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন ইত্যাদি। আমাদের নিঃশ্বাসের CO2 থেকে শুরু করে উনুন, শুকনো পাতা বা গাছের গোড়া পোড়ানো (CO), গাড়ি ও কলকারখানার ধোঁয়া, শীতাতপ যন্ত্রের নিঃসরণ এবং বাজি, সবাই দূষণকারী গ্যাসের উৎস। নাইট্রোজেন ও সালফারঘটিত কিছু গ্যাস আবার বাতাসের অক্সিজেন বা বৃষ্টির জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অক্সাইড, সালফেট ও নাইট্রেট জাতীয় অজৈব পদার্থের কণিকা, সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে। এই অজৈব পদার্থের কণাগুলো নিজেরা অনবরত ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতে থাকে এবং বায়ুমণ্ডলের ওজন অণুকেও ভাঙতে থাকে। এর ফলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে পড়ে, যা জীবজগতের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

Too Much of a Good Thing

বিশ্ব উষ্ণায়ণকে রোধ করার জন্য পৃথিবী জুড়ে এত ক্যাম্পেন, সচেতনতার প্রচার চলছে। ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ কমানোর অঙ্গীকার করেছে এই চুক্তিতে সামিল দেশগুলি। সবই হচ্ছে কিন্তু পরিবেশ পরিশোধনের কাজে মানুষ এখনও যথেষ্ট তৎপর নয়। সে কাজই সকলের চোখের আড়ালে করে চলেছে প্রকৃতি। সামান্য পরিমাণে হলেও প্রকৃতি তার নিজের ক্ষত মেরামতের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। তবে বজ্রপাত প্রতিদিন হয় না, বিদ্যুতের ঝলকানিও একটা সময়ের পরে থেমে যায়। তখন মানুষের তৈরি দূষণ আবার আকাশকে কালো করে তোলে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ যে ভয়ঙ্কর ক্ষত তৈরি করে রেখেছে তা প্রকৃতির প্রচণ্ড শক্তি দিয়েও মেরামত করা সম্ভব নয়, তার জন্য সচেতন হতে হবে মানুষকেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More