বৃহস্পতির চাঁদ থেকে ভেসে আসছে এফএম সিগন্যাল, ভিনগ্রহীদের বার্তা কি! হইহই বিজ্ঞানী মহলে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেই কবে থেকে বৃহস্পতির অন্দরে চোখ রেখে বসে আসে নাসার জুনো মহাকাশযান। কম করেও পাঁচ বছর হতে চলল। কই এমনটা তো আগে হয়নি! গুরুগ্রহ বৃহস্পতি মাঝেসাঝে চমক দেয় ঠিকই। কখনও তার দুই মেরুতে প্রবল ঝড় ওঠে। একেবারে তছনছ করে দেয় সবকিছু। কখনও আবার গ্রহণ লাগে বৃহস্পতিতে। সেসব বার্তা এতদিন নিয়ম করেই পাঠিয়েছিল জুনো। এবার কিন্তু বড়সড় ব্যাপারই ঘটেছে। বৃহস্পতির ৭৯টি ঘনিষ্ঠ উপগ্রহ তথা চাঁদের একটির থেকে এফএম রেডিও সিগন্যাল ভেসে আসতে দেখা গিয়েছে। সেই বার্তা কেমন তা পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনে ইতিমধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছে জুনো।

বৃহস্পতি আমাদের সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে বড় গ্রহ। আকারে-আয়তনে, ভরে পেল্লায় হওয়ায় একে গুরুগ্রহই বলে মহাকাশবিজ্ঞানীরা। এই বৃহস্পতির ৭৯টি উপগ্রহ আছে। কোনও গ্রহের উপগ্রহকে সাধারণত চাঁদ বলেই ডাকা হয়। তো বৃহস্পতির এই ৭৯টি চাঁদের সবকটিই গ্যাসীয় পিণ্ড। তাতে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা খুব একটা আছে কিনা সে নিয়ে পাকাপোক্ত তথ্য এখনও দিতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। এমনিতেই ভিন গ্রহে প্রাণের খোঁজ নিয়ে সেই কবে থেকেই তোলপাড় চলছে। নাসা এক্সোপ্ল্যানেট হান্টার কবে থেকেই ভিন গ্রহদের পাড়ায় চক্কর কেটে চলেছে। এই প্রথমবার বৃহস্পতির একটি উপগ্রহ গ্যানিমিড থেকে এমন এফএম সিগন্যাল ভেসে আসতে দেখা গেছে। পৃথিবীতে যেমন এফএম রেডিও সিগন্যাল বা তরঙ্গ আছে, ঠিক তেমনই তরঙ্গ ভেসে আসতে দেখা গেছে গ্যানিমিড থেকে।

NASA Spacecraft Detects FM Radio Signal Coming From Jupiter's Largest Moon  | Curiosmos

বৃহস্পতির এই চাঁদ কেমন, রহস্য ঘনিয়েছিল আগেও

বলে রাখা ভাল, এই গ্যানিমিড উপগ্রহ নিয়ে আগেও একবার হইচউ হয়েছিল। হাবল টেলিস্কোপ দেখিয়েছিল, গ্যানিমিডের পিঠে জমে আছে চাপ চাপ বরফ। সেই বরফের চাদরের তলায় ঢাকা পড়ে আছে জলের স্তর। সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে নানা মতামত দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় এও দেখা গিয়েছিল, গ্যানিমিডে নাকি এত বড় জলের ভাণ্ডার আছে যা পৃথিবীর সমুদ্রের চেয়েও বড়।

Jupiter's Moon Ganymede - Universe Today
বৃহস্পতির চাঁদ গ্যানিমিড

আরও একটা ব্যাপার আছে গ্যানিমিডে। তা হল, জোরালো চৌম্বক ক্ষেত্র। পৃথিবীর মতোই বৃহস্পতির এই চাঁদে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র আছে বলেই জানিয়েছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। এই চৌম্বক ক্ষেত্র আছে গ্যানিমিডের দুই মেরুতে। পৃথিবীর মতোই সেই চৌম্বক ক্ষেত্রের টানে গ্যানিমিডের দুই মেরুতে উজ্জ্বল আলোর স্রোত দেখা যায়। অেকটা অরোরার মতো। আয়নিত কণার সমষ্টি ভেসে বেড়ায় সেখানে। ‘নেচার’ সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট ছাপাও হয়েছিল। এবং অরোরার কৌণিক অবস্থান দেখে অনুমানও করা হয়েছিল যে, বৃহস্পতির এই চাঁদে জল থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। ঠিক যেভাবে আলো ঠিকরে বের হচ্ছে তার থেকেই ওই অনুমান করা হয়েছিল।

Discovery in Space: FM radio signal coming from Jupiter's moon Ganymede

সুতরাং, গ্যানিমিডে কী রহস্য রয়েছে তা জানতে বহুদিন ধরেই আগ্রহী বিজ্ঞানীরা। সেখান থেকেই এখন এফএম রেডিও সিগন্যাল ভেসে আসার কারণে কৌতুহল আরও বেড়েছে। যদিও নাসার বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, কোনও ভিনগ্রহী প্রাণী নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণেই এই রেডিও তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে। যার অন্যতম বড় কারণ, গ্যানিমিডের সেই শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। এমন এক ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে যেখানে আটকে পড়েছে ইলেকট্রন কণার স্রোত। তাদেরই চলাচলে এমন তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে। এই ঘটনাকে বলা হচ্ছে ‘ইলেকট্রনিক-সাইক্লোট্রন মেজ়ার’ ইনস্টেবিলিটি।

Strange FM signal discovered coming from one of Jupiter's moons | Fox News

নাসার জুনো আরও চমক দেখিয়েছে

১৯৮৯ সালে বৃহস্পতিতে মহাকাশযান গ্যালিলিও (Galileo Spacecraft) পাঠিয়েছিল নাসা। ২০০৩ সালে গ্যালিলিও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে নাসার জুনোই এখন বৃহস্পতির সর্বক্ষণের সঙ্গী। গ্যালিলিও আভাস দিয়েছিল, জুনো প্রমাণ করেছে, গত সাড়ে ৩০০ বছর ধরে তুমুল ঝড় বয়ে চলেছে বৃহস্পতির পিঠে সুবিশাল একটা এলাকা জুড়ে। এমন প্রলয়ঙ্কর, এত দীর্ঘমেয়াদী ঝড় এখনও পর্যন্ত এই সৌরমণ্ডলের আর কোনও গ্রহে দেখা যায়নি। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে নাসার জুনো দেখায়, বৃহস্পতির উত্তর মেরুতে (North Pole) ন’টা এবং দক্ষিণ মেরুতে (South Pole) ছ’টা সাইক্লোন পাক খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ঝড় থামার থামারও নাম নেই, শান্ত হওয়ারও কোনও লক্ষণ নেই।

Why Jupiter's Great Red Spot and other storms last so long - Business  Insider

জ্যোতর্বিজ্ঞানীরা এই ঝড়ের নাম দিয়েছিলেন গ্রেট রেড স্পট’ (জিআরএস) Great Red Spot। বৃহস্পতির মেরু থেকে ২২ ডিগ্রি দক্ষিণে এই এলাকা দেখতে দগদগে লাল ক্ষতের মতো। আয়তনে প্রায় ১০ হাজার বর্গ মাইল বা ১৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার। জুনোর জোভিয়ান ইনফ্রারেড অরোরাল ম্যাপার (JIRAM)’-এ ধরা পড়েছে একটি ষড়ভুজাকৃতি কেন্দ্রের (Hexagonal Center) চারপাশে পঞ্চভুজের মতো পাক খাচ্ছে একাধিক প্রলয় সাইক্লোন। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য টেক্সাসের আয়তন যতটা, এই প্রলয় সাইক্লোনগুলির এক একটার আয়তন ঠিক ততটাই। কী কারণে এত প্রলয়ঙ্কর ঝড় বয়ে চলেছে গত সাড়ে ৩০০ বছর ধরে, তার কারণ জানার চেষ্টা করছে জুনো।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More