মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ছেঁকে অক্সিজেন বের করল নাসার রোভার, এবার হুড়হুড়িয়ে তৈরি হবে ফুরফুরে শ্বাসবায়ু

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তবে কি মঙ্গলে গিয়ে কয়েকদিন কাটিয়ে আসতে পারবেন নভশ্চররা?

পৃথিবী থেকে আর টানাটানি করে অক্সিজেন নিয়ে যেতে হবে না। মঙ্গলের বাতাস ছেঁকে দিব্যি ফুরফুরে অক্সিজেন বানিয়ে দেবে নাসার রোভার পারসিভিয়ারেন্স। শ্বাসবায়ু তো বটেই রকেটের জ্বালানির জন্য আর বিশেষ মাথা ঘামাতে হবে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে পৃথিবী থেকে জ্বালানি ভরে নিয়ে আসার দরকার নেই। রোভার পারসিভিয়ারেন্স তো আছেই! চাইলেই মিলবে যোগান। ভাবা যায়!

না, সত্যিই ভাবনাচিন্তার বাইরে। এতদিন এই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যই তো বিজ্ঞানীদের এত গবেষণা, চেষ্টা, লড়াই। চাঁদের মাটিতে বাঙ্কার বানাতে হবে, মঙ্গলেও আস্তানা তৈরি করতে হবে। তার জন্য সবার আগে দরকার অক্সিজেন। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণই  তো আশ। চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই, কিন্তু মঙ্গলে আছে। ফিনফিনে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের স্তর হলেও আছে। যদি কোনওভাবে এই কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেনে বদলে দেওয়া যায় তাহলেই কেল্লাফতে। আর সেটাই হয়েছে।

NASA's Perseverance Mars Rover Extracts First Oxygen From Red Planet

ছ’চাকার রোভার গড়গড়িয়ে চলছে মঙ্গলে। বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড খামচে তার থেকে অক্সিজেন ছেঁকে বের করছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেনে বদলে দেওয়ার পদ্ধতি রোভারকে আগেই শিখিয়ে দিয়েছিলেন নাসার বিজ্ঞানীরা। মঙ্গলে তো শুধু জল বা প্রাণের খোঁজ করতেই যায়নি পারসিভিয়ারেন্স, তার দায়িত্ব অনেক। যার মধ্যে একটি হল অক্সিজেন তৈরি করা। এর জন্য রোভারে রয়েছে ‘মার্স অক্সিজেন ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন এক্সপেরিমেন্ট’ (MOXIE) বা মোক্সি। এই যন্ত্রের কাজ হল কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন বের করা। গত ২০ এপ্রিল মানে মঙ্গলের দিনের হিসেবে ৬০তম মার্সিয়ান ডে-তে এই অক্সিজেন ছেঁকে বের করার পরীক্ষা করে ফেলেছে রোভার। তাতে সাফল্যও এসেছে।

Illustration of the MOXIE instrument, depicting the elements within the instrument.

মোক্সি-র প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর মাইকেল হেচেট বলেছেন, মঙ্গলে যদি ‘ম্যানড মিশন’ করতে হয়, অর্থাৎ নভশ্চরদের নিয়ে যেতে হয়, তাহলে অক্সিজেন দরকার। জ্বালানির জন্যও দরকার অক্সিজেন। চারজন নভশ্চর রকেটে চেপে মঙ্গলে যেতে কম করেও ১৫ হাজার পাউন্ড বা ৭ মেট্রিক টন জ্বালানি দরকার পড়বে। তার জন্য ৫৫ হাজার পাউন্ড বা ২৫ মেট্রিক টন অক্সিজেন দরকার হবে। জ্বালানি ও শ্বাসবায়ু—দুইয়ের জন্যই লাগবে অক্সিজেন। এই বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন পৃথিবী থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তার জন্য খরচও পড়বে বিশাল। তাই এই কাজ মঙ্গলের মাটিতেই সেরে ফেলতে পারলে অনেক সুবিধা হবে বিজ্ঞানীদের কাছে। চাইলেই জ্বালানি ভরে চট করে মঙ্গল থেকে চাঁদেও পাড়ি দেওয়া যাবে। পরিকল্পনা বিরাট, তাকে বাস্তবায়িত করার প্রক্রিয়া তাই এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে। বিজ্ঞানী মাইকেল বলছেন, মোক্সি যন্ত্রে কম করেও ২৫ টন অক্সিজেন তৈরি হতে পারে।

NASA's Perseverance Mars Rover Extracts First Oxygen from Red Planet | NASA

কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরি করতে হলে প্রচণ্ড তাপ দরকার। অন্তত ১৪৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় এই করভারশনটা হয়। এই তাপে যাতে রোভারের কোনও ক্ষতি না হয় তার জন্যও ব্যবস্থা আছে। মোক্সিকে তাপ-প্রতিরোধী নিকেল অ্যালয় দিয়ে মুড়ে রাখা রয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় ১০ গ্রাম করে অক্সিজেন তৈরি করতে পারবে পারসিভিয়ারেন্স রোভার।

NASA's Perseverance rover just turned CO2 into oxygen. The technology could help future astronauts breathe on Mars. | Business Insider India

মঙ্গলের বায়ুস্তর পৃথিবীর ১০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। দিনের বেলা প্রচণ্ড তাপে তেতে থাকে মাটি। যদি মঙ্গলের পিঠে সামান্য জলও থাকে তাহলে তা সবই উবে যাবে সূর্যের তাপে। সেই উবে যাওয়া জল উপরে উঠে বাষ্প হয়ে ভেসে বেড়াবে। মনে হবে মেঘ জমেছে মঙ্গলের আকাশে। রাত বাড়লে যখন তাপমাত্রা পৌঁছবে মাইনাস ১২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেই জল জমে ঝিরিঝিরি বরফ হয়ে নেমে আসবে। পৃথিবীর থেকে মঙ্গলের শীত এতটাই বেশি যে বরফ গলে জল হওয়ার সম্ভাবনা কম। দিনের সময় যেটুকু জল অন্তঃসলিলা হয়ে থাকে সেটুকুই। রাতের বেলা আবার সব জমে কঠিন বরফ হয়ে যায়। লাল গ্রহের দক্ষিণের শীত আবার বেশ বেশি। সেখানে মাঝেমাঝে তুষার ঝড়ও হয়। এভাবে মঙ্গলে দিন-রাতের ফারাক যেমন হয়, তেমনি ঋতুরও বদল হয়।

To Make Oxygen on Mars, NASA's Perseverance Rover Needs MOXIE | Science | Smithsonian Magazine

নাসার পারসিভিয়ারেন্স এতদিনে মঙ্গলের হালহকিকত সব ধরে ফেলেছে। লালগ্রহের শব্দও রেকর্ড করে পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। রুক্ষ-সূক্ষ পাহাড়ের গায়ে খট খট করে রশ্মির প্রতিফলনে সে শব্দও বিচিত্র। কয়েক সেকেন্ডের সেই অডিও ক্লিপ শুনিয়েছে নাসা। ল্যান্ডার মঙ্গলের মাটিতে ল্যান্ড করার সময় ধুলো ওড়ানোর শব্দ ধরেছে রোভার। ধুলোর ঝড়ের শনশন শব্দও রেকর্ড করা হয়েছে। নীচু স্বরে বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছে পারসিভিয়ারেন্স। ক্রেটারের পাশে ২৩ ফুট উচ্চতার পাহাড়ে লেসার রশ্মি ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার সময় যে শব্দ হচ্ছে তাও রয়েছে নাসার সংগ্রহে। পারসিভিয়ারেন্স এখন অক্সিজেন বানানোর পাশাপাশি পাহাড়ের শব্দ শুনছে। মঙ্গলের গিরিখাত, উপত্যকা, পাহাড়ি খাঁজের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি রেকর্ড করবে যত্ন করে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More