প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় বলয়ে পৃথিবীর সুপ্রাচীন ব্যাসল্ট শিলার খোঁজ, কত বয়স বলুন তো

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর প্রাচীনতম খনিজের বয়স ৪২৪ কোটি বছর। ওড়িশায় খোঁজ পেয়েছিলেন এক বাঙালি ভূবিজ্ঞানী। পৃথিবীর প্রাচীন শিলাগুলির খোঁজে গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়েই। পৃথিবীর অন্দরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, ওই গনগনে লাভার স্রোতের মধ্যে সৃষ্টির কত গোপন, অজানা রহস্যেরা ভেসে বেড়াচ্ছে, তার খোঁজই ভূবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য। প্রাচীন শিলার খোঁজে এবার আরও একধাপ অগ্রগতি হল বিজ্ঞানীদের। সাত দেশের ভূবিজ্ঞানীদের সম্মিলিত চেষ্টায় প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় বলয়ের কাছে খোঁজ মিলল সুপ্রাচীন আগ্নেয়শিলার। বয়স কম করেও পাঁচ কোটি বছর।

জাপানের মাউন্ট ফুজি আগ্নেয়গিরির থেকে হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আমামি সানকাকু বেসিনে সমুদ্রের তলদেশ থেকে একটি ব্যাসল্ট শিলার খোঁজ পেয়েছেন ভূবিজ্ঞানীরা। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ব্রিটেন, সুইৎজারল্যান্ড ও চিনের গবেষকরা সমুদ্রের তলায় ৬ কিলোমিটার অবধি খননকাজ চালিয়ে ওই ব্যাসল্ট শিলা তুলে এনেছেন।

4.6-billion-year-old meteorite is the oldest volcanic rock ever found | New Scientist

‘নেচার কমিউনিকেশন’ সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার খবর ছাপা হয়েছে। ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিলাটির বয়স কম করেও পাঁচ কোটি বছর। লাভাস্রোত জমাট বেঁধে তৈরি হয়েছে ওই আগ্নেয়শিলা। এর উপাদানে রয়েছে লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম। শিলাটি যেখানে পাওয়া গেছে তার থেকে আরও দেড় কিলোমিটার গভীরে গিয়ে আরও নানা খনিজ উপাদানের খোঁজ পেয়েছেন গবেষকরা। ওই সমস্ত উপাদানই কোটি কোটি বছরের পুরনো। এই গবেষণা পৃথিবীর অন্দরমহলের অনেক অজানা রহস্যের জট খুলে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

New Basalt Rock Formed After Volcanic Eruption Beneath the Pacific Ocean | Science Times
লাভা উদ্গীরনের পরে তৈরি ব্যাসল্ট শিলা

ব্যাসল্ট শিলা হল আগ্নেয়শিলা। পৃথিবীর ৯০ শতাংশ আগ্নেয়শিলাই ব্যাসল্টিক। পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে এই ধরনের শিলার খোঁজ মেলে। এর উপাদান হল লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম। আগ্নেয়গিরির গলিত লাভা তাপ বিকিরণ করে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে জমাট বেঁধে এই শিলা তৈরি করে। ভূবিজ্ঞানীরা আগ্নেয়শিলাকে পৃথিবীর আদিমতম শিলাও বলেন। লাভা বা ম্যাগমা পৃথিবীর অন্দর থেকে উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায় উঠে এসে পৃষ্ঠদেশে ঘনীভূত হয়, কাজেই এই লাভা জমাট বেঁধে যে শিলা তৈরি হয় তার রসায়ন পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগের বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করে। আর এই শিলা তো সেই পাঁচ কোটি বছর আগে জমাট বেঁধে এতদিন সমুদ্রের অতল গভীরে পড়ে ছিল। কাজেই বিজ্ঞানীদের কৌতুহল আরও বেড়েছে।

Environment - Green Catalyst
প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় বলয়

এই শিলার খোঁজ আগামীদিনে ভূবিজ্ঞানের গবেষণায় কেন মাইলফলক হতে পারে তার আরও একটা কারণ আছে। ব্যাসল্ট শিলাটি পাওয়া গেছে প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এর কাছে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের ‘রিং অব ফায়ার’ বা ‘ফায়ার বেল্ট’ নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। কারণ এই এলাকাই হল পৃথিবীর বৃহত্তম ভূকম্পন প্রবণ এলাকা। বিশ্বজুড়ে দুটি বিশাল ভূমিকম্প বেল্ট রয়েছে—এক, সার্কাম প্যাসিফিক বেল্ট, দুই, আলপাইড বেল্ট। এই সার্কাম-প্যাসিফিক বেল্টের আরেক নাম ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’।

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ৪০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সর্ববৃহৎ ভূমিকম্প বলয় হল এই এলাকা। দেখতে অনেকটা ঘোড়ার ক্ষুরের মতো। এই আগ্নেয় বলয়ের চারদিকে পেরু, চিলি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, বলিভিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পানামা, জাপান, রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ মোট ৩৫টি দেশ রয়েছে। ভূবিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে যত বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে তার শতকরা ৮০-৯০ ভাগেরই কেন্দ্রস্থল এই প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার। সবচেয়ে বড় কথা হল, সমুদ্রের তলদেশে এই আগ্নেয় বলয়ে সাড়ে চারশোর বেশি আগ্নেয়গিরি রয়েছে যার ৭৫ শতাংশই সক্রিয়। সমুদ্রের গভীরে অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে প্রায়ই, আগুন জ্বলছে ধিকি ধিকি। নতুন আবিষ্কৃত ব্যাসল্ট শিলাটিও মিলেছে এখানেই।

ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর অতল-অন্দরের প্রাচীন রহস্য ভেদ করাই উদ্দেশ্য। ভূবিজ্ঞানের গবেষণাতেই উঠে আসবে সৃষ্টির আদিম পর্যায়ে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং টেকটোনিক প্লেটের গঠন। আর এটা তো সবারই জানা যে, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে বিশদে জানতে গেলে শিলার বিন্যাস খুব ভাল করে বুঝতে হবে। কারণ শিলার মধ্যেই সংরক্ষিত থাকে পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগের নানা রহস্য। সেখানে এই শিলাটি থেকে কতটা জানতে পারা যাবে সেটাই এখন দেখার।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More