মানুষ-বাঁদরের সংকর, আজব কাণ্ড! দুই মিলিয়ে কী তৈরি করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুকুমার রায়ের সেই ‘খিচুড়ি’ কবিতার কথা মনে আছে তো! “হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না), হয়ে গেলে ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না”… হাঁসজারু হোক বা বকচ্ছপ বা টিয়ামুখো গিরগিটি…এক প্রাণীর সঙ্গে অন্য প্রাণীর মিলমিশের কথা সুকুমার রায় বহু বছর আগেই বলে গিয়েছিলেন। সেই চেষ্টা এখন হচ্ছে।

সংকর বা হাইব্রিড প্রাণী তৈরির চেষ্টা অবশ্য অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু আইনকানুন, নীতি বিশেষজ্ঞদের যুক্তির ধারে তা সম্ভব হয়নি সেভাবে। মানুষের কোষ শুয়োরের ভ্রূণে ঢুকিয়ে মানুষ-শুয়োরের হাইব্রিড প্রায় তৈরি করেই ফেলেছিলেন বিজ্ঞানীরা। শুয়োরের ভ্রূণে দিব্যি মানুষের মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হতেও শুরু করেছিল। তবে সে ভ্রূণ বেশিদিন বাঁচেনি। শুয়োরের সঙ্গে মানুষের হাইব্রিড নিয়ে বিস্তর জলঘোলাও হয়েছিল। তাই এখন শুয়োর ছেড়ে মানুষেরই পূর্বপুরুষ বাঁদরদের প্রজাতির ভ্রূণ নিয়ে মিলমিশ করার চেষ্টা করছেন গবেষকরা।

Scientists used stem cells to create a hybrid human-monkey embryo - The Academic Times

বিশ্বে প্রথম এমন চমকে দেওয়ার মতো ঘটনাই ঘটেছে। ডজনখানেক মানুষের কোষ আর বাঁদরের কোষ মিলে গিয়ে তৈরি হয়েছে মানুষ-বাঁদরের ভ্রূণ। এই ভ্রূণের বিশিষ্ট্য হল এর কোষের অনেকটা বাঁদরের হলেও, বাকিটা মানুষের। বাঁদরের ভ্রূণে বাইরে থেকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল মানুষের স্টেম কোষ। মূলত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষই ইনজেক্ট করেছিলেন গবেষকরা, কারণ এই ধরনের স্টেম কোষ থেকে মানুষের বিভিন্ন অঙ্গের কোষ ও কলা তৈরি হয়।

‘সেল’ জার্নালে এই গবেষণার খবর সামনে এসেছে। মানুষ-বাঁদরের সংকর অবশ্য বেশিদিন বাঁচেনি। গবেষণাগারে পেট্রিডিশে মাত্র ২০ দিনই বেঁচেছিল এই হাইব্রিড। তবে গবেষণা সফল হয়েছে। মানুষ আর বাঁদরের হাইব্রিড তৈরির প্রথম ধাপ পেরিয়ে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

Human-Monkey Hybrid Embryo Created by Joint China–U.S. Scientist Team

মানুষ-বাঁদরে মিলমিশ

দুই প্রজাতির সংকর করতে হলে তাদের ডিএনএ বা জিন মেলাতে হবে। কোষে-কোষে বন্ধুত্বও দরকার। বিজ্ঞানীরা বাঁদরের (Cynomolgus macaques) ডিম্বানু বের করে ল্যাবরেটরিতে তাকে পরিণত করেন। এরপরে এই ডিম্বানুর সঙ্গে একই প্রজাতির বাঁদরের শুক্রাণু মিশিয়ে নিষেক করেন। ৬ দিন পরে সেই নিষিক্ত কোষের বিভাজন হয়ে ব্লাস্টোসাইট তৈরি হয়। সাধারণত এই ব্লাস্টোসাইটই জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হয় এবং বেড়ে পরিপূর্ণ ভ্রূণ তৈরি করে। গবেষকরা কিন্তু এই ব্লাস্টোসাইটকে গর্ভে স্থাপন করলেন না। তাঁরা ল্যাবরেটরিতে একটি পেট্রিডিশে একে পরিণত হতে দিলেন।

Embryo

ব্লাস্টোসাইটের বাইরের স্বচ্ছ আবরণ জোনা পেলুসিডা সরিয়ে তাতে মানুষের স্টেম কোষ ইনজেক্ট করলেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের ২৫টি ‘এক্সটেনডেড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম’ (EPS) কোষ সেই ব্লাস্টোসাইটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন বিজ্ঞানীরা। ১৩২ টি এমন মানুষ-বাঁদরের সংকর ভ্রূণ তৈরি হয়েছে ল্যাবরেটরিতে। এগুলোর মধ্যে ১০৩টি ১০ দিন টিকে ছিল, বাকি কয়েকটির জীবনকাল ছিল ২০ দিন। গবেষণা এখনও চলছে। এমন সংকর ভ্রূণ আরও তৈরি হচ্ছে।

Scientists Have Created Human-Monkey Embryos, and That's Ethically OK – Reason.com

হঠাৎ করে এমন হাইব্রিড প্রজাতি তৈরিতেই বা মেতেছেন কেন বিজ্ঞানীরা? আসলে মানুষের প্রয়োজনেই এমন হাইব্রিড প্রজাতি তৈরি করছেন গবেষকরা। সংকর ভ্রূণের মধ্যে মানুষের স্টেম কোষ থাকায় সেখান থেকেই কোষ, কলা বা কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বানিয়ে নেওয়া সম্ভব, যা আগামীদিনে অর্গ্যান ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা মানুষের শরীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। অর্গ্যান ডোনার বা দাতার অভাবে বহু মানুষের মৃত্যু হয় প্রতি বছর। সঠিক সময় প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গও পাওয়া যায় না। তাই হাইব্রিড তৈরি হলে সহজেই গবেষণাগারে সেই অঙ্গ বানিয়ে নিতে পারবেন বিজ্ঞানীরা। আর বাঁদরের সঙ্গে যেহেতু মানুষের অনেক মিল, কোষ-কলারও সাদৃশ্য আছে, তাই এই কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে।

Scientists generate part human and part monkey embryo for the first time

মানুষের সঙ্গে অন্য প্রজাতির প্রাণীর হাইব্রিড তৈরি হলে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানে কতটা উন্নতি হবে সেটা পরের কথা, এই গবেষণা নিয়ে বিতর্কটাই এখন বেশি হচ্ছে। নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের স্টেম কোষ বাঁদর বা অন্য প্রাণীর ভ্রূণে প্রতিস্থাপিত হলে, একসময় দেখা যাবে সেই সংকর প্রাণীর মস্তিষ্ক মানুষের থেকেও উন্নত হচ্ছে বা সেই প্রাণীর মুখ বা শরীরের নানা অঙ্গও মানুষের মতো দেখতে হচ্ছে। অথবা এমনও হতে পারে মানুষের মুখের আদল নিয়েই জন্মাল সেই প্রাণী। তখন সমস্যা আরও বাড়বে। তাই একদিকে যেমন হাইব্রিড তৈরিতে উৎসাহ রয়েছে বিজ্ঞানীমহলের একাংশের, তেমনি এই গবেষণার অন্য দিকের কথা ভেবেও উদ্বেগ বেড়েছে অনেকের।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More