গান গাইতে ভুলেছে, ভুল সুর তুলছে, প্রেমও করতে পারছে না বিপন্ন পাখিরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নীল দিগন্তে ছোট ছোট দুটি ডানা মেলাতেই আনন্দ। গাছগাছালির মধ্যে শরীর ডুবিয়ে মিষ্টি সুরে ভৈরবী ধরত তারা। গানের সুরে জানান দিত ভোর হয়েছে। ঘুম ভাঙানোর গান এক। প্রেমিকাকে ডাক পাঠানোর গান আরেক। তাতে সুর আরও মিষ্টি। সুর তাল লয় ছন্দে বাংলার কোকিলের মতোই অস্ট্রেলিয়া রিজেন্ট হানিইটারদের বেশ নামডাক আছে। মনের আনন্দেই তাদের গলায় সুর খেলে। এই সুর আবার মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যমও। সেই সুরই কিনা ভুলতে বসেছে হানিইটাররা! যে গান ছিল তাদের মজ্জায়, তাই ভুলে গেছে পাখিরা।

গান কখনও ভোলা যায়? এ প্রশ্ন যদি ওঠে, তাহলে বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদরা বলবেন, পাখিরা তাদের গান ভুলে যাচ্ছে। ভুল সুর গাইছে, গানের কথাও বদলে যাচ্ছে। অন্য প্রজাতির গান নকল করছে। হারিয়ে ফেলছে নিজস্বতা। রিজেন্ট হানিইটারদের অবস্থা এখন এমনই। আর জন্য দায়ী একশো শতাংশ দায়ী মানুষ। বিপন্ন পাখিরা তাদের বাসস্থান হারাচ্ছে, মা-বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ হচ্ছে ছানাদের, তার ওপর রয়েছে শব্দ দূষণ। মিহি সুরের গান আর তাদের কানে পৌঁছচ্ছে না। তাই ভুল হচ্ছে সুরে, ছন্দে।

ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পক্ষীবিদ ডক্টর রস ক্রেটার বিপন্ন প্রজাতির পাখিদের নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরেই গবেষণা করছেন। রিজেন্ট রিজেন্ট হানিইটাররা এখন বিপন্ন শুধু নয়, বিরল প্রজাতির তালিকায় চলে গেছে। বিশ্বজুড়ে হানিইটারসদের সংখ্যা তিনশোর বেশি হবে না। এই পাখিদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েই বিজ্ঞানী দেখেছেন, নিজের প্রজাতির মধ্যে ভাব বিনিময়ের যে মাধ্যম, তাই ভুলে গেছে পাখিরা। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে এখন তারা অন্য প্রজাতির গান নকল করছে। কোকিল যদি এখন হঠাৎ করে অন্যরকম গান ধরে, তাহলে ব্যাপারটা যেমন হবে ঠিক তাই। ডক্টর রস বলছেন, এই গবেষণা পাখির গান ভুলে যাওয়া নিয়ে নয়, মনুষ্য সৃষ্ট দূষণ আর পরিবেশ বদলের যে ভয়ঙ্কর প্রভাব আসতে চলেছে বিশ্বজুড়ে তার সূচনা হযে গেছে। ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি জার্নালে এই গবেষণার খবর ছাপা হয়েছে।

আরও পড়ুন: নতুন গান গাইছে চড়াইরা, বদলে যাচ্ছে সুর, ছড়িয়ে পড়ছে মাইলের পর মাইল, অবাক হয়ে শুনলেন বিজ্ঞানীরা

ভুল সুরে গাইছে, প্রেমও জমছে না পাখিদের, বাধা আসছে মিলনে

কেন গান ভুলছে পাখিরা? ডক্টর রস বলছেন, মানুষের মতো পাখিদেরও নিজেদের সমাজ, গোষ্ঠী থাকে। ছানা পাখিদের বুলি ফোটে মা বা বাবা পাখির থেকে। যদি ডিম ফোটার আগে মা বা বাবা তার বাসা ছেড়ে চলে যায়, তাহলে সেই প্রজাতির অন্য পাখিদের থেকে সুর শিখে নেয় ছানারা। গণ্ডগোলটা হচ্ছে এখানেই। বাসস্থান হারানোর ফলে সংখ্যায় কমছে হানিইটাররা। যে কটা পাখি বেঁচে আছে তারা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই গানের সুর পরবর্তী প্রজন্ম অবধি পৌঁছতেই পারছে না।

দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়াতেই রিজেন্ট হানিইটারদের খোঁজ বেশি মেলে। এখন সেখানেই পাখির সংখ্যা হাতে গোনা। গবেষক বলছেন, প্রায় দু’দশক ধরে  ভুল সুরে গান গাইছে এই পাখিরা। গলা ছেড়ে সুর তুলতেও ভুলেছে। পুরুষ পাখিদের মধ্যে এই পরিবর্তনটা দেখা গেছে। তাই পাখিদের প্রেম আর জমছেই না। স্ত্রী রিজেন্ট হানিইটাররা যে গান শুনে ছুটে আসত বহু দূর থেকে, সে গানই তো ভুল। তাই প্রেমিকের বাড়ির ঠিকানা খুঁজেই পাচ্ছে না প্রেমিকারা। পাখিদের মিলনেও বাধা পড়ছে। রিজেন্ট হানিইটারদের বংশ লোপ পেতে চলেছে।

পাখিদের অবলুপ্তির জন্য মানুষের কাণ্ডকারখানাকেই দায়ী করছেন পরিবেশবিদরা। জঙ্গল সাফ হয়ে যাচ্ছে, গাছ কেটে কংক্রিটের বাড়ি উঠছে, পাখিরা বাস্তুহারা হচ্ছে। মোবাইলের মাইক্রোওয়েভ রশ্মি, টাওয়ার থেকে ভেসে আসা তরঙ্গ, গাড়ির আওয়াজে দিশাহারা হচ্ছে পাখিরা। ভাব বিনিময়ের পদ্ধতিই ভুলে যাচ্ছে। এই গবেষণা আগামী পৃথিবীর কাছে এক অশনি সঙ্কেতই বটে। গবেষকরা বলছেন, একটা সময় আসবে যখন পৃথিবী থেকে মুছে যাবে পাখির গান। হারিয়ে যাবে সমস্ত সুরেলা পাখিরা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More