ভুতুড়ে, বহুরূপী ‘নিউট্রিনো’ কণার খোঁজ! বিশ্বের গভীরতম বৈকাল হ্রদের নীচে টেলিস্কোপ বসাল রাশিয়া

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির জট খুলতে কতই না আকুলি বিকুলি। সষ্টির সে আদিম পর্যায়ে আলোর কণা ফোটনদের সঙ্গেই যারা জন্ম নিয়েছিল সেই কণারা জাদুকরী । বিজ্ঞানীরা বলেন ভুতুড়ে কণা। তারা অশরীরী। চোখে দেখা যায় না। অথচ কোটিতে কোটিতে তারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে আমাদেরই চারপাশে। ভেদ করে যাচ্ছে শরীর অথচ বুঝতেই পারছি না আমরা। এই কণার মধ্যেই লুকিয়ে সৃষ্টির আদিম রহস্য। তার খোঁজেই এবার আদাজল খেয়ে নেমেছেন রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা। ধরাছোঁয়ার বাইরে যারা, পালিয়ে বেড়াচ্ছে দিবারাত্র তাদের খোঁজ মিলবে কোথায়? একটা উপায় আছে। অতল জলের গভীরে ছায়ার মতো মাঝে মাঝে তারা ঝলক দিয়ে যায়। তাই ভুতুড়েদের খুঁজতে অতল জলের অন্দরেই ফাঁদ পেতেছেন বিজ্ঞানীরা।

Siberia's Lake Baikal Is the World's Oldest and Weirdest | HowStuffWorks

আরও সহজ করে বললে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদের নাম সকলেরই জানা। বিশ্বের গভীরতম সেই হ্রদের আয়তন সাড়ে ৩১ হাজার বর্গকিলোমিটার। গভীরতা প্রায় ১৬৩৭ মিটার। এই হ্রদের গভীরেই দানবাকার টেলিস্কোপ বসিয়ে দিয়েছেন রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা। লক্ষ্য সেই অশরীরীদের দেখা পাওয়া। চোখে না দেখলেও যদি তাদের গতিপথ অনুসরণ করা যায়, তাহলেই কেল্লাফতে। এই ভুতুড়েদের সকলেই যে ধরাছোঁয়ার বাইরে এমনটাও নয়। কয়েকটি নাগালে আনা সম্ভব। তার জন্য গভীর জলস্তর, পুরু বরফের চাদর, অন্ধকার গা ছমছমে খনি, দুর্গম থেকে দুর্গমতম স্থানে যেতে হবে বিজ্ঞানীদের। তাই বৈকাল হ্রদের অন্দরে ঢুঁ মারার চেষ্টা করছেন গবেষকরা।

Why Russian scientists just deployed a giant telescope beneath Lake Baikal  | Live Science

যে কণাকে দেখা যায়, কিন্তু তার অস্তিত্ব আছে তারই নাম নিউট্রিনো (Neutrino)। এই নিউট্রিনোদের নাগাল পেতে কত বছর ধরে গবেষণা, অনুসন্ধান চলছে। নিউট্রিনোদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সামনে এনে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছিলেন আর্থার ম্যাকডোনাল্ড ও তাকাকি কাজিতা নামে দুই বিজ্ঞানী। কী বৈশিষ্ট্য তাঁরা দেখেছিলেন সে কথায় পরে আসা যাবে। রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হল এই নিউট্রিনোদের দর্শন পাওয়া। তার জন্য বৈকাল হ্রদের গভীরে বৈকাল-জিভিডি নামে একটা বিশাল মাপের টেলিস্কোপ তারা বসিয়ে দিয়েছেন।

Russian scientists deploy giant telescope in Lake Baikal to study tiniest  known particles

বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিউট্রিনোরা তার চারপাশে ঘুরে বেড়ানো শক্তিদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করে না। তাই সেইসব শক্তির উৎস ধরে নিউট্রিনোদের ধরা অসম্ভব ব্যাপার। অশরীরীরা নিজেদের মর্জি মাফিক ছুটে বেড়ায় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কী ভীষণ সেই গতি। যদি তাদের চারপাশে অন্যান্য শক্তিরা ঘিরে ধরে তাহলে নিউট্রিনোরা কিছুতেই দেখা দেবে না। সে কারণেই বৈকাল হ্রদের মতো গভীরতম হ্রদের তলদেশকেই বেছে নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, এই হ্রদের অন্দরে সূর্যের ঝাঁঝাঁলো অতিবেগুনী রশ্মি ঢুকতে পারে না। হ্রদের ওপর বরফ জমে একটা আস্তরণও তৈরি করে। এমন নিরাপদ জলের আশ্রয়েই নিউট্রিনোরা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেই ধারণা বিজ্ঞানীদের। তাই তাদের টিকি পেতে জলের গভীরেই ফিট করা হয়েছে টেলিস্কোপ।

হ্রদের আড়াই মাইল অবধি বরফের স্তরে বসানো হয়েছে নিউট্রিনো ডিটেক্টর। এই ডিটেক্টরের নীচের অংশ কাঁচ ও স্টেনলেস স্টিলের তৈরি। নিউট্রিনোদের ধরতে স্বচ্ছ মাধ্যম তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। হ্রদের ঝকঝকে স্বচ্ছ বিশুদ্ধ জলের মধ্যে দিয়ে ভুতুড়ে কণারা যখন ছুটে যাবে তখন তাদের নাগাল পেতেই এই ব্যবস্থা।

Neutrino - definition of a neutrino
জাদু কণা নিউট্রিনো, বহুরূপী, বেপরোয়া, কাউকে পাত্তা দেয় না

সেই যে মহা বিস্ফোরণ ‘বিগ ব্যাং’, এর পরেই নাকি আলোর কণা ফোটনের মতো লক্ষ লক্ষ নিউট্রিনো কণারাও ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল। নিজের মধ্যে সংঘর্ষ, মারামারি করে লক্ষাধিক বছর তারা এদিক ওদিক দিকভ্রান্তের মতো দৌড়ে বেড়িয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্দাম গতিতে। প্রায় আলোর কণা ফোটনের মতোই গতিবেগ তাদের। এই ব্রহ্মাণ্ডের কোনও শক্তি, কোনও কণা তাদের চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

The mystery of neutrino mass could soon be solved - Tech Explorist

বিজ্ঞানীরা বলেন, নিউট্রিনোদের ধরা যায় না। তাদের চরিত্রও বড় অদ্ভুত। কোনও শক্তির সঙ্গে গা মেলায় না তারা। কোনও কণার সঙ্গে মেলামেশা নেই। ব্রহ্মাণ্ডের কোনও কিছুকেই পরোয়া করে না নিউট্রিনোরা। বেপরোয়া অশরীরীরা কাউকে পাত্তা দিতেই চায় না। উন্মত্ত জলরাশির মতো এই কণাদের স্রোত নিরন্তর ছুটে চলেছে। সবকিছু ভেদ করে চলে যাচ্ছে। মহাজাগতিক বস্তুদের সঙ্গেও কোনও সংযোগ নেই এদের, বরং যে কোনও কিছুকেই ছিঁড়েফুঁড়ে চলে যেতে পারে এরা। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই কণাদের স্রোত অনুসরণ করতে পারলে সূদূর মহাকাশে গ্রহ, নক্ষত্রমণ্ডলীর চরিত্রও বোঝা সম্ভব হবে।

Neutrinos Suggest Solution to Mystery of Universe's Existence | Quanta  Magazine

সূর্য থেকেও ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে এই নিউট্রিনোরা। তবে এদের সিকিভাগই পৌঁছচ্ছে পৃথিবীতে। অগ্নিকুণ্ড সূর্যের গনগনে তেজ থেকে জন্ম হচ্ছে নিউট্রিনোদের। আগুনের উৎস আসলে হল যেখানে হাইড্রোজেন হিলিয়ামে বদলে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অন্যতম উপাদানও নিউট্রিনো। সুতরাং বিজ্ঞানীরা বলেন, এই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের মূলেও আছে নিউট্রিনোদের অবদান। এদিকে পৃথিবীতে যন্ত্র সাজিয়ে নিউট্রিনোদের ধরতে যে বিজ্ঞানীরা ফাঁদ পেতে আছেন, তাঁরা দেখছেন সূর্য থেকে সামান্য কণাই পৃথিবীতে পৌঁছচ্ছে। অনেক সময়ে পৃথিবীতে আসার আগে তারা নিজেদের স্বভাব-চরিত্রও বদলে ফেলছে। কেউ কেউ আবার গায়েব হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বুঝেছেন নিউট্রিনোরা আসলে বহুরূপী।

গবেষকরা বলছেন, ইলেকট্রনের মতোই মৌল কণা নিউট্রিনো যাদের আর ভাঙা যায় না। এদের তিনটি রকম আছে। একবার যদি নিউট্রিনোদের বাগে আনা যায়, তাহলে মহা বিস্ফোরণের রহস্য ভেদ করা সম্ভব হবে। বিস্ফোরণের পরে কাদের জন্ম হয়েছিল, কী কী পরিবর্তন ঘটেছিল ব্রহ্মাণ্ডে তার সবই নখদর্পণে চলে আসবে বিজ্ঞানীদের। শুধু তাই নয়, মহাশক্তিধর নিউট্রিনোদের নাগালে আনতে পারলে পৃথিবীর যে কোনও শক্তিকেই কব্জা করা সম্ভব হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More