খুনি জিন নিয়ে উড়বে ৭৫ কোটি পুরুষ মশা, মিলন করলেই দলে দলে মরবে রক্তখেকো স্ত্রীরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটুকু ছোঁয়া লাগে….।

প্রেমের ছোঁয়া লাগলেই কিন্তু সর্বণাশ। সুপুরুষ এডিস মশাদের দেখে স্ত্রীরা যদি ঘর বাঁধতে চায় তাহলেই বিপদ। মিলন হলেই মুশকিল। ডিম থেকে যে লার্ভারা বের হবে তারা যদি স্ত্রী হয় তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু, আর পুরুষ হলে বন্ধ্যা হবে। বংশবিস্তারের ক্ষমতাই লোপ পাবে।

মশার বংশ ধ্বংস করতে এবার নতুন পদ্ধতি নিয়েছেন ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা। এতদিন মশার লিঙ্গ বদল, মশার লালায় ব্যাকটেরিয়া ঢুকিয়ে নানারকম চেষ্টাচরিত্র হয়েছে। তাতেও মশা বাহিত রোগ যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হলুদ জ্বর বা চিকুনগুনিয়াতেও খুব একটা লাগাম টানা যায়নি। তাই এবার নতুন ফন্দি এঁটেছেন ব্রিটেনের অক্সিটেক নামক একটি বায়োটেকনোলজি ফার্মের বিজ্ঞানীরা। জিনের বিন্যাসই ওলটপালট করে দিয়েছেন গবেষকরা। এমন মশা তৈরি হচ্ছে যে তার জিনেই মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে ঘুরবে। স্ত্রী মশাদের সঙ্গে মিলন হলেই বন্ধ্যা মশার জন্ম হবে না হলে মৃত্যু হবে। রক্তখেকো স্ত্রী মশাদের থেকেই তো আসলে সংক্রমণ ছড়ায়, তাই তাদেরই বিনাশ করতে এই জিনের ভেল্কি।

GM Mosquitoes Closer to Release in U.S. | The Scientist Magazine®

টার্গেট স্ত্রী এডিস মশারা, ডেঙ্গু-হলুদ জ্বরের ভাইরাস নিয়ে ওড়ে

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) মশা নিয়ে কাজ করছেন। এই মশা ডেঙ্গি ভাইরাসের বাহক। জিকা ভাইরাসও ছড়ায় তাদের লালার মাধ্যমেই। এরা আবার ইয়েলো ফিভার ভাইরাসেরও বাহক। প্রতি বছর মশা বাহিত রোগে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। কাজেই এই এডিস মশাদের দমন করতে না পারলে ডেঙ্গু, হলুদ জ্বরের মতো রোগ থেকে কোনওদিনই রেহাই মিলবে না।

আরও পড়ুন: ‘বন্ধু’ মশা উড়বে অ্যান্টিবডি নিয়ে, রক্ত খেলেও ছড়াবে না ডেঙ্গি, বিপ্লব আনবে নতুন গবেষণা

রোগ কিন্তু ছড়ায় স্ত্রী মশারা, পুরুষরা নেহাতই নিরীহ। ফুলের রেণু খায়, রক্তে তাদের অ্যালার্জি। এই স্ত্রী এডিস মশারা পেটে করে ভাইরাস বয়ে নিয়ে যায়। মশার শরীরে কিন্তু ভাইরাসের কোনও প্রভাব পড়ে না। কিন্তু যার রক্ত শুষে নেবে তার শরীরে ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়ে আসবে। স্ত্রী মশার লালায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে ভাইরাস। মশা যখন তার হুল ঢোকায় শরীরে তার মধ্যে দিয়ে মানুষের রক্তে ঢুকে পড়ে। তারপর সটান শ্বেত রক্তকোষে গিয়ে হামলা চালায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দফারফা করে দেয়। সংখ্যায় বেড়ে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। আর কারও যদি ক্রনিক অসুখ থাকে তাহলে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া হলে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই স্ত্রী মশাদের আটকানোই মূল লক্ষ্য বিজ্ঞানীদের।

Pros and Cons of Genetically Modified Mosquitoes

খুনি জিন নিয়ে উড়বে ৭৫ কোটি পুরুষ মশা

পুরুষ মশাদের জিনে কারিগরি করে তাদের খুনি বানানোর চেষ্টাই হচ্ছে এখন। জিনের বিন্যাস বদলে যে মশা তৈরি হচ্ছে তাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘জেনেটিকালি মডিফায়েড’ (GM Mosquito) মশা। বিজ্ঞানীরা দুটি উপায় ভেবেছেন—এক, পুরুষ ও স্ত্রী মশাদের এমনভাবে বদলে দিতে হবে যাতে তারা রোগ ছড়াতে না পারে।

দুই, মশাদের প্রজনন ক্ষমতাই নষ্ট করে দিতে হবে। না হলে পুরুষ মশাদের জিন এমনভাবে বদলে দিতে হবে যাতে নিষেকের পরে বন্ধ্যা মশার জন্ম হয়। এভাবে মশার বংশকে নির্বংশ করে দেওয়া যাবে।

Genetically modified mosquitoes pass on deadly gene to native mosquitoes,  study finds - YouTube

দ্বিতীয় পদ্ধতিটাই এখন মনে ধরেছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের। তাঁরা কায়দা করে পুরুষ মশার শরীরে ‘সেলফ-লিমিটিং জিন’ ভরে দিয়েছেন। এমন একধরনের প্রোটিন ঢুকিয়ে দিয়েছেন যা মশার প্রজনন ক্ষমতাকে বদলে দেবে। এবার এই বদলানো জিনের পুরুষ মশাদের পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হবে। এদের বলা হবে ‘ট্রান্সজেনিক’ মশা। তারা কী করবে স্ত্রী মশাদের আকর্ষণ করে টেনে আনবে। মিলন হলে স্ত্রী মশারা ডিম পাড়বে। এরপরেই আসল খেলা শুরু হবে। ডিম ফুটে যদি স্ত্রী মশার লার্ভা বের হয় তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই মরে যাবে। কারণ ট্রান্সজেনিক মশার লার্ভা স্ত্রী হলে তার বেঁচে থাকার জন্য একরকম অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার পড়বে। সেই অ্যান্টিবায়োটিক না পেলেই মৃত্যু। আর বিজ্ঞানীরা এমন কৌশল করেছেন যাতে স্ত্রী মশার জন্ম হলে অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিই হবে না। কাজেই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি নিশ্চিত।

আর যদি পুরুষ লার্ভার জন্ম হয় তাহলে সে বন্ধ্যা হয়েই জন্মাবে। প্রজননের কোনও ক্ষমতা থাকবে না। এইভাবে মশার বংশ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে যাবে। ফ্লোরিডায় আপাতত ৭৫ কোটি এমন ট্রান্সজেনিক পুরুষ মশা ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বিজ্ঞানীরা। কোথায়, কবে এমন মশা ছাড়া হবে সে বিষয়ে অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটেছেন সকলেই।

তবে এই গবেষণা নিয়ে এখন নানা মহলে বিতর্কও শুরু হয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, মশার বংশ একেবারে লোপ করে দেওয়ার এই ভাবনা বাস্ত্রতন্ত্রের জন্য ভাল নাও হতে পারে। তাছাড়া যে প্রোটিন নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন, তার কী প্রভাব পড়বে পরিবেশে তাও এখনও অজানা। কাজেই বাধাবিপত্তি বিস্তর রয়েছে। সেসব কাটিয়ে ডেঙ্গু মশাদের কীভাবে জব্দ করা যায় সেটাই এখন লক্ষ্য বিজ্ঞানীদের।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More