চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে এই শিকারি গাছ, সে ফাঁদেই চুম্বকের মতো আটকে যায় শিকার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিকারি গাছ বা কার্নিভোরাস প্ল্যান্টের কথা আমরা সবাই জানি। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের সেই গল্প ‘সেপ্টোপাস’ তো হাড়হিম করে দেয়। পশু নয়, মানুষও খেতে পারে সে গাছ। তবে সেপ্টোপাস কাল্পনিক চরিত্র, সায়েন্স থ্রিলারে এর পরিচিতি। আদতে উদ্ভিদবিজ্ঞানের জগতে চেনাপরিচিত সে কার্নিভোরাসরা আছে তারা পোকামাকড়, পাখি, নেহাত ব্যাঙ, গিরগিটি, টিকটিকি, মাকড়সাতেই সন্তুষ্ট। কেউ তাদের কলসীর ঢাকনা খুলে গপাত করে গিলে নেয় শিকার, কেউ আবার সরু সরু রোঁয়া দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। শিকারের রস নিঙড়ে ছিবড়ে করে ফেলে দেয়। এ ফাঁদ থেকে পালাবার কোনও উপায় নেই।

How Venus flytraps evolved their taste for meat

শিকার ধরার জন্য শিকারিরা নানরকম কৌশল আয়ত্ত করে। কিন্তু কোনও গাছ যদি শিকারকে চুম্বকের মতো টেনে নেওয়ার জন্য আস্ত একটা চৌম্বক ক্ষেত্রই সাজিয়ে ফেলে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন রহস্যজনক হয়ে দাঁড়ায়। একে গাছ, তার ওপর নিজে থেকেই চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে ফাঁদ পাতছে, ভাবাই যায় না! তলিয়ে দেখলে কেমন একটা হিংস্র খাদ্য-খাদক সম্পর্ক ভাবনায় উঁকি দিয়ে যায়। তবে এটা কিন্তু নিছক কল্পনা বা সায়েন্স ফিকশনের গল্প নয়। এমন শিকারি গাছ আছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল এমন কার্নিভোরাস গাছের নাম আমরা ছোটবেলাতেই জীবনবিজ্ঞানে পড়ে এসেছি। ভেনাস ফ্লাই ট্র্যাপ (Venus Flytrap)। খপ করে ধরে পোকাদের চিড়েচ্যাপ্টা করে দেয় যে গাছ, তারাই কিন্তু তৈরি করতে পারে চৌম্বক ক্ষেত্র। এমন অবাক করা খোঁজ জীববিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

ফাঁদের কৌশলে পরে আসা যাবে, আগে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের ব্যাপারে জেনে নেওয়া যাক। চলতি কথায় বলে পতঙ্গভুক উদ্ভিদ। সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর ও দক্ষিণ ক্যারোলিনায় এদের বাস। তবে আমাদের দেশেও বিস্তর পাওয়া যায়। কলসপত্রী বা পিচার প্ল্যান্টের মতো ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপও বেশ পরিচিত পতঙ্গভুক উদ্ভিদ। উচ্চতায় ১ ফুটের মতো। দেখতে খুবই সুন্দর। সবচেয়ে আকর্ষণের জায়গা হল এদের পাতা। ঝিনুকের মতো দুটো ভাগ দুই খণ্ডে আলাদা হয়েছে। মাঝে একটা মোটাসোটা মধ্যশিরা আছে। দুই ভেতরের রঙটা টকটকে লাল। এই রঙের মায়ায় দিক ভুলে পোকামাকড়রা দিব্যি গুটিগুটি পাতার ওপর চড়ে বসে। আর তারপরেই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। তবে কীটপতঙ্গদের আকর্ষণ করার আরও ফন্দিফিকির জানে এই গাছ।

Venus flytrap exploits plant defenses in carnivorous lifestyle

ঝিনুকের মতো যে দ্বিখণ্ডিত পাতা ট্র্যাপ বা ফাঁদ সাজায় সেখানে থাকে ট্রিগার হেয়ার। সরু সরু রোঁয়া যেগুলো শিকারকে টেনে আনে ফাঁদের ভেতরে। একে পাতার লাল রঙ, তার ওপর পাতার কিনারায় মিষ্টি মতো স্বাদ পেয়ে একবার পথভোলা পতঙ্গরা ভেতরে ঢুকলেই সর্বণাশ। রোঁয়ায় টান পড়লেই সক্রিয় হয়ে উঠবে গাছ। দুবার টান পড়লেই ঝপাং করে বন্ধ হয়ে যাবে পাতা। সিলিয়াগুলো খাপে খাপে বসে ফাঁকফোকড় বন্ধ করে দেবে। আর পালাবার পথ পাবে না শিকার। তারপর একটু একটু করে চলবে ভোজনপর্ব। জ্যান্ত পোকার রস শুষে ছিবড়ে করে দেবে গাছ।

What Makes a Venus Flytrap Snap | The Scientist Magazine®

ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের শিকার ধরার এটাই হল স্বাভাবিক পদ্ধতি। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, রহস্য আছে এখানেই। প্রথমত শিকারকে বিভ্রান্ত করে টেনে আনা, তারপর তাকে প্রায় আচ্ছন্ন করে পাতায় বসতে বাধ্য করা, শেষে আক্রমণ—এই পুরো পদ্ধতিটাই একটা বিশেষ উপায় হয়। আসলে এই গাছ তার পাতার চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ঠিক যেমন মানুষের স্নায়ু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ তৈরি করে। জোহানেস গুটেনবার্গ ইউনিভার্সিটির অ্যানে ফ্যাব্রিকান্ট বলছেন, এই চৌম্বক ক্ষেত্রকে আবার পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এটা নিছকই দুর্বল। শুধু শিকারের সময় তৈরি করে গাছেরা। তবে এই ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করার মধ্যে বেশ গা ছমছমে একটা ব্যাপার আছে। জীববিজ্ঞানে যাকে বলে ‘বায়োম্যাগনেটিজম’, তারই প্রয়োগ করে এই শিকারি গাছেরা।

Sequence of Venus flytrap photos after stimulation of trigger hairs by... |  Download Scientific Diagram

ধরা যাক, দূর থেকে শিকারের আভাস পেয়েছে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ। সঙ্গে সঙ্গেই নিজেদের চারপাশে তরঙ্গ খেলিয়ে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলবে তারা। এই ইলেকট্রিকাল এনার্জি গাছকে সক্রিয় করে তুলবে। দেখা যাবে, ঠিক কোনও কীট বা পতঙ্গ গাছের পাতায় এসে বসছে। শিকার কাছাকাছি চলে এলে সেনসিটিভ ট্রিগার হেয়ারগুলো আরও সক্রিয় হবে। শিকার বাধ্য হবে ফাঁদে ধরা দিতে।

বিজ্ঞানীরা এই গাছকে তাপে রেখে পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, যখন গাছটি সক্রিয় হচ্ছে অর্থাৎ সোজা কথায় শিকার দেখে লোলুপ হচ্ছে, তখন খুব কম পরিমাণ শক্তির চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যাচ্ছে চারপাশে। বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বেঁধে ফেলছে শিকারকে। গোটা ফাঁদ জুড়ে ইলেকট্রিক কারেন্ট তৈরি হচ্ছে। এই কারেন্টের গুঁতোয় আটকা পড়ছে শিকার। ভবলীলা সাঙ্গ হচ্ছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More