করোনায় ভয়ে নিজেরাই ডাক্তারি করছেন! মুঠো মুঠো ওষুধ খেয়ে বিপদ আরও বাড়ছে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন নেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেই। করোনা থেকে বাঁচতে দেশবাসীরা নিজেরাই ডাক্তারি করে ওষুধ খেয়ে ফেলছেন। আর যে সে ওষুধ নয়, অ্যান্টি-ভাইরাল কড়া ডোজের হাইড্রক্সোক্লোরোকুইন, ইভারমেকটিন বা স্টেরয়েড ডেক্সামিথাসোন। ফল হচ্ছে আরও মারাত্মক। ওষুধের ডোজে শরীরের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এমনটাই দেখা গিয়েছে ভারতে। দিল্লি, হরিয়ানা, গুরুগ্রামের নামী হাসপাতালের ডাক্তাররা বলছেন, হাসপাতালে এখন বেশিরভাগ রোগী আসছেন নানারকম ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। একেই করোনা রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে, তার ওপর সংক্রমণ সারাতে গিয়ে নিজেরাই মুঠো মুঠো অ্যান্টি-ভাইরাল ট্যাবলেট খেয়ে বিপদ বাড়িয়ে ফেলছেন। রোগ যতটা না ধরছে তার থেকেও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি।

 

রোগ সারাতে এখন নিজেরাই ডাক্তার, কোন ওষুধের কী প্রভাব জানেন তো!

গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতালের চেয়ারম্যান যতীন মেহতা বলছেন, গত কয়েকদিনে হাসপাতালে অন্তত ১০ জন রোগী এসেছেন যাঁরা কোভিড মনে করে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ খেয়ে বিপত্তি বাঁধিয়েছেন। ইভারমেকটিন বা ডক্সিসাইক্লিনের মতো ওষুধ যেগুলো বিভিন্ন রকম ভাইরাল সংক্রমণ সারাতে ব্যবহার করা হয়, তাই খেয়ে ফেলছেন রোগীরা। করোনায় এই দুই ওষুধ কী ডোজে খেতে হবে, কতদিনের ব্যবধানে খেতে হবে তা না জেনেই ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেকেই

Ivermectin for COVID-19: Worth a Shot? | MedPage Today

রোহতকের পন্ডিত ভাগওয়াত দয়াল শর্মা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের ডাক্তারবাবুরা বলছেন, যে কোনও অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের নির্দিষ্ট ডোজ থাকে। সেটা রোগীদের বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, রোগের ইতিহাস, অ্যালার্জির ধাত ইত্যাদি নানা বিষয় দেখে ঠিক করেন ডাক্তাররা। আর করোনার মতো ছোঁয়াচে রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের ডোজ খুবই সাবধানে দিতে হয়। কারণ কোভিড সংক্রমণে এমনিতেই নানা জটিল রোগ ধরে যায় শরীরে। তাই কোন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা বিচার করেই ডোজ ঠিক করতে হয়। করোনার জন্য যেসব ওষুধের প্রয়োগ হয়েছে এখনও অবধি যেমন—হাইড্রক্সোক্লোরোকুইন, ডেক্সামিথাসোন, টোসিলিজুমাব, রেমডেসিভির ইত্যাদি ওষুধ শুধুমাত্র হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধের ডোজ নিতে বারণ করেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। করোনা থেরাপিতে এই ওষুধগুলোর ব্যবহারের আলাদা আলাদা গাইডলাইনও আছে। তাই সেসব না জেনেশুনে ওষুধ খেয়ে ফেললে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য।

আরও পড়ুন: মুঠো মুঠো ওষুধে বাড়ে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি, জল টেনে নেয় শরীর, সুস্থ থাকার টিপস দিলেন বিশেষজ্ঞরা

Coronavirus | No WHO bar on India testing HCQ as a preventive drug, says WHO chief scientist Soumya Swaminathan - The Hindu

যেমন ধরা যাক ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সোক্লোরোকুইন, এর বেশি ব্যবহারে মৃত্যু অবধি হতে পারে। গত বছরও এমন কিছু ঘটনা সামনে এসেছিল। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, হাইড্রক্সোক্লোরোকুইন বেশিমাত্রায় খেয়ে ফেললে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ আগে থেকেই রয়েছে যাঁদের, তাঁরা যদি নিয়ম না মেনে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খান তাহলে মৃত্যু অবধি হতে পারে। ওষুধের মাত্রা যদি ২ গ্রামের বেশি হয়ে যায়, তাহলে সেটা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

What is Dexamethasone? | What Is News,The Indian Express

আবার ধরা যাক স্টেরয়েড ডেক্সামিথাসোন। করোনা রোগীদের জন্য এই স্টেরয়েডকে ‘জীবনদায়ী ওষুধ’ বলা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেক্সোমিথাসোন সকলের জন্য নয়। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম রয়েছে যাদের বা সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগী যাদের শরীরে ইনফ্ল্যামেশন বা তীব্র প্রদাহ রয়েছ এমন রোগীদের ক্ষেত্রে ডেক্সামিথাসোন কার্যকরী হতে পারে। সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণে শরীরে সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে তীব্র প্রদাহ তৈরি হয়, যাকে ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ বলে। ডেক্সামিথাসোন এই সাইটোকাইন স্টর্ম রুখে দিতে পারে। তাই অ্যালার্জি, ত্বকের যে কোনও সংক্রামক রোগ, র‍্যাশ, সোরিয়াসিস, মাল্টিপল মায়োলোমার ট্রিটমেন্টে ও কেমোথেরাপিউটিক অ্যাজেন্ট হিসেবে এই ওষুধের ব্যবহার চলে। তবে রক্তে যদি সিআরপি প্রোটিনের মাত্রা ১০-এর কম থাকে, তাহলে ডেক্সামিথাসোনের থেরাপি করলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেকটাই। রোগীকে ভেন্টিলেটরে সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তাই সব রোগীদের জন্য এই ওষুধ প্রযোজ্য নয়।

Explained: What's Remdesivir And Does It Cure Covid-19?

রেমডেসিভিরও তাই। মৃদু বা মাঝারি সংক্রমণ ঠেকাতে রেমডেসিভিরের কোনও ভূমিকা নেই। রোগীর শরীরে ভাইরাল লোড যদি বেশি হয় এবং জটিল রোগ দেখা দিতে থাকে তখন প্রোটোকল মেনে রেমডেসিভিরের থেরাপি করা যেতে পারে। ধরা যাক, কোনও করোনা রোগী প্রবল শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। শ্বাসনালীর সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। তাঁর বুকের এক্স-রে ও সিটি-স্ক্যান করে সংক্রমণ দেখা গেছে। তখন তাঁকে রেমডেসিভিরের থেরাপিতে রাখা যেতে পারে। কিন্তু সামান্য সংক্রমণ বা উপসর্গহীন রোগীদের জন্য ওই ওষুধের ট্রিটমেন্ট একেবারেই কার্যকরী নয়।

ডাক্তারবাবুরা বলছেন, নিজেরা বাহাদুরি করে ওষুধ খাবেন না। সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিলে করোনা পরীক্ষা করান, ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এখন টেলি মেডিসিনের সুযোগও রয়েছে। সেখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন। করোনা পরিস্থিতিতে অডিও-ভিজুয়াল সিস্টেমও চালু হতে চলেছে। সেখানে ভিডিও কলে ডাক্তারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা যাবে, কী ধরনের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে তা বোঝানো যাবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More