মগজাস্ত্র! শার্লক হোমসের কেন এত বুদ্ধি, আলোর বেগে ছোটে আইকিউ, জানেন কি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মগজাস্ত্র!

তাই মনে হয় পাঠকের মনে ঝড় তোলা শার্লক হোমসের ট্যাগলাইন ‘ব্রেনি ইজ দ্য নিউ সেক্সি!’

স্যাপিওসেক্সুয়ালিটির চলমান প্রতীক শার্লক হোমস। মগজাস্ত্রই যার সবচেয়ে বড় সেক্স অ্যাপিল। ‘থিঙ্কিং মাস’ বললে বাংলার ফেলুদা-ব্যোমকেশ আর বিদেশি শার্লকের ধারেকাছে জনপ্রিয় মনে হয় এখনও কেউ নেই। শার্লকের লম্বা ট্রেঞ্চকোট-মাফলার, মেঘ-গর্জনের মতো কণ্ঠস্বর, ঝকঝকে শান দেওয়া দৃষ্টি, ক্ষুরধার মগজ আর আলোর গতিতে ছুটে চলা চিন্তা-ভাবনাই তো মনে ঝড় তুলেছে। হি-ম্যান টাইপ মাসল সর্বস্ব পুরুষের সেখানে ঠাঁই নেই, আইকিউয়ের ঝকঝকে প্রতিফলনই তাঁর স্টাইল-স্টেটমেন্ট।

Sherlock's Visual Map

আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু তাঁর মগজাস্ত্র খুব যত্ন করে গড়া হয়েছে। মগজের প্রতিটি খাঁজে-ভাঁজে চকচকে তলোয়ারের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে বুদ্ধি। ভাবনারা সেখানে জট পাকিয়ে নেই, সমুদ্রের গভীর থেকে রত্ন তুলে আনার মতো অতীতের মন্থন করতে হয় না, যেটা দরকার অনায়াসেই স্মৃতির সিঁড়ি বেয়ে চটপট উঠে আসে। বুদ্ধিরা ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো। চাইলেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এমন ক্ষুরধার মগজ নিয়ে মনোবিদদের গবেষণার শেষ নেই। কী এমন রয়েছে সেই ব্রেনে যা আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। এত বুদ্ধি রাখা থাকে কোথায়, স্মৃতিরা মিলেমিশে না গিয়ে আলাদা আলাদা কুঠুরিতে দিব্যি গা এলিয়ে থাকে, এমনটা তো অবিশ্বাস্য।

Sherlock Holmes and Doyle's introduction of Analysis and Deduction | The  Policy Chronicle

শার্লকের এই মগজাস্ত্র নিয়েই আস্ত একটা বই লিখে ফেলেছেন রাশিয়ান-আমেরিকান লেখিকা ও মনোবিদ মারিয়া কোনিকোভা। শার্লকের মগজ নিয়ে তাঁর বই ‘মাস্টারমাইন্ড: হাউ টু থিঙ্ক লাইক শার্লক হোমস’। কীভাবে শার্লকের মতো শান দেওয়া বুদ্ধি পাওয়া যাবে আমাদের মাথার মধ্যে যে হাজারো চিন্তা, অপ্রয়োজনীয় ভাবনার জট পেকে আছে তার থেকে মূল্যবান রত্নগুলোকে তুলে আনা যায় কীভাবে, সে নিয়েই নিজের মতামত লিখেছেন মারিয়া।

সুকুমার রায়ের মতো বলতে গেলে, “আয় তোর মুণ্ডুটা দেখি, আয় দেখি ‘ফুটস্কোপ’ দিয়ে, দেখি কত ভেজালের মেকি আছে তোর মগজের ঘিয়ে। কোন দিকে বুদ্ধিটা খোলে, কোন দিকে থেকে যায় চাপা”…

সুকুমার রায় ঠিকই ধরেছিলেন, আমাদের মগজের বেশিরভাগটাই ঘিরে রেখেছে মেকি, ভেজাল চিন্তা-ভাবনা, আর যে কারণেই মস্তিষ্কের কুঠুরিগুলো ভরে উঠে টইটম্বুর হয়ে গেছে। এই ভিড়ে ঠাসা কুঠুরি থেকে দরকারি জিনিসপত্র বের করে আনা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই যদি এখন স্কুলের ভূগোলের বইয়ের পড়া মনে করতে যাই, তাহলে খাবি খেতে হবে। বোর্ডের পরীক্ষার মুখস্থ পড়া মনে করতে গেলে একেবারে হরিবোল হয়ে যাবে। এটাই হল কারণ, আমরা গাদা গাদা তথ্য জোর করে চেপেচুপে মাথার ভেতরে ভরে রাখি। তারপর কম্পিউটারে মেমরির মতো তার ওপর পরতে পরতে আরও তথ্য জমা হতে থাকে। এইভাবে মাথার ভেতরের কুঠুরিগুলো কানায় কানায় ভরে ওঠে। গিজগিজে ভাবনার জট ছাড়িয়ে দরকারি জিনিসপত্র আর হাতের কাছে থুরি মনের কাছে পাওয়া যায় না।

মারিয়া কোনিকোভা আরও ভাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁর বইতে। তিনি বলেছেন, মস্তিষ্ককে যদি লাইব্রেরির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে শার্লকের মাথার সঙ্গে সাদৃশ্য পাওয়া যাবে। শার্লকের মস্তিষ্ক হল সাজানো গোছানো পরিপাটি লাইব্রেরির মতো। বিভিন্ন বইয়ের জন্য আলাদা আলাদা র‍্যাক। প্রতিটিতে লেবেল সাঁটা। কোন বই কোথায় আছে খুঁজতে একটুও বেগ পেতে হয় না। শার্লকের বুদ্ধিসুদ্ধিও এই বইয়ের মতো। লেবেল লাগিয়ে মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা কুঠুরিতে বন্দি। ভাবনারা যেহেতু জট পাকিয়ে নেই, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বেশি। কোথায় কোন বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে তা ঝটাপট ঠিক করে ফেলতে পারেন শার্লক। কাল্পনিক চরিত্র হলেও মনোবিজ্ঞানের থিওরিতে এমন ঝকঝকে মস্তিষ্কেই বুদ্ধির হাওয়া খেলতে পারে।

আর আমাদের মস্তিষ্ক কেমন? মারিয়ার কথায়, ছাদের চিলেকোঠা ঘরের মতো। অপ্রয়োজনীয় আসবাবে ঠাসা। প্রতিদিনের দরকারে যা লাগে না, তাই জমা হয় চিলেকোঠায়। মারিয়া বলছেন, জিনিসের পর জিনিস জমতে জমতে চিলেকোঠার একেবারে ঠাসাঠাসি দশা। আমাদের মস্তিষ্কও তেমন। কাজের থেকে অকাজের জিনিসপত্র বেশি। তাছাড়া মাথাতে তো আর চিমনি লাগানো নেই, যে কখনও সখনও দূষিত ধোঁয়ার মতো অকাজের বুদ্ধি বাষ্প করে বের করে দেওয়া যাবে, আবার কম্পিউটারের মতো সিফট-ডিলিট কি নেই, যে চাইলেই লহমায় মেমরি সাফ করে ফেলা যাবে।

A 4-step method for problem solving, inspired by Sherlock Holmes – Big Think  Edge

তাহলে উপায়? মনোবিদ মারিয়া কোনিকোভা বলছেন, আজেবাজে তথ্যে মাথা বোঝাই না করে বরং স্মার্ট-থিওরিটিক্যাল ও প্র্যাকটিকাল তথ্য জমা করা ভাল। ধরা যাক, নতুন কোনও থিওরি পড়ছি, তাহলে গাঁকগাঁক করে মুখস্থ না করে বরং বাস্তবে তার প্রয়োগ কীভাবে হতে পারে সে বিষয়টা মাথায় রাখলেই যে কোনও জটিল সূত্র সহজেই মনে থাকবে। ছবি দেখলে, কানে শুনলে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস আরও চাঙ্গা হয়। প্রকৃতি ও পরিবেশের তথ্য বায়োস্কোপের মতো মগজে সেঁধিয়ে যায়। মানে মনোবিদ যা বলতে চেয়েছেন তার সহজ মানে করলে দাঁড়ায়, হিজিবিজি ভাবনাগুলো স্রেফ ডিলিট করে মগজের জন্য পুষ্টিকর ও জীবনের জন্য দরকারি তথ্যগুলো মাথায় পুরে রাখলে তবেই ঘিলুর ফাঁকফোঁকর দিয়ে বুদ্ধির তাজা বাতাস বেরিয়ে আসতে পারে।

What makes human intelligence special? - The Week

Ask a Scientist: How do thoughts work in our brain?

সুকুমার রায়ের আবোল-তাবোলে সেই ‘বুঝিয়ে বলা’ কবিতার কথা মনে পড়ে, যেখানে শ্যামাদাসকে প্রকৃতির তত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে বলা হয়েছিল, “আজকে তোকে সেই কথাটা বোঝাবই বোঝাব—না বুঝবি তো মগজে তোর গজাল মেরে গোঁজাব।”। আসলে মগজে যা ঢোকে না তাই যদি জোর করে ঢুকিয়ে রাখা হয় তাহলে মস্তিষ্কের ভারটাই বাড়ে, বুদ্ধির ধার বাড়ে না। শার্লক তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ককে বলেন ‘মাইন্ড প্যালেস’, যেখানে উপস্থিত বুদ্ধিই শুধু নেই, চুলচেরা পর্যবেক্ষণও আছে। কাজেই মস্তিষ্কের সঙ্গে পঞ্চইন্দ্রিয়ের যোগাযোগটাও বাড়াতে হবে। শার্লক হোমসের সঙ্গে মগজ-ডুয়েলে জিততে হলে ‘থিঙ্কিং প্রসেস’ হতে হবে স্মার্ট, ঝকঝকে। এটা একদিনে আসবে না, ধীরে ধীরে গ্রে-মেটারের পুষ্টি-বৃদ্ধি হবে। চেষ্টাটা করেই দেখুন না!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More