মোবাইল, স্টুডিওর পর ঘরে বসেও হচ্ছে কমেন্ট্রি, ধারাভাষ্যেও ‘নিউ নর্মাল’ আনল কোভিড

শুভ্র মুখোপাধ্যায়

বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের প্রেস বক্সে বসে ম্যাচ কভার করা মানে খুব কঠিন বিষয়। ভরা দর্শকের সামনে বসে ম্যাচ বিশ্লেষণ করতে হয়। কানের পাশে সারাক্ষণ চিৎকার হচ্ছে, ‘জিতেগা ভাই, জিতেগা… ইন্ডিয়া জিতেগা…’ তার মধ্যে মনোসংযোগ বজায় রাখা, আর ব্যাট হাতে প্যাট কামিন্সকে সামলানো, একই ব্যাপার।

২ এপ্রিল, ২০১১। যেদিন ভারতীয় দল ২৮ বছর পরে মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ জিতল, ম্যাচের পরে সব সাংবাদিকরা প্রেস বক্সের বাইরে এসে স্টেডিয়ামের দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখছিলেন। কলকাতা অফিস থেকে ততক্ষণে বঙ্গজ সাংবাদিকদের মুঠো ফোনে কর্কশ সেই বক্রোক্তি ভেসে আসছে, ‘‘কি হল কপিটা কতক্ষণে পাঠানো হবে? নাকি কাল ভোরে আসবে স্টোরি?’’

সাংবাদিকদের জীবন আর সার্কাসে জোকারদের জীবন প্রায় একই, বহিঃরঙ্গে যতই উচ্ছ্বাস কিংবা বেদনা থাকুক, বাইরে প্রকাশ হতে পারবে না কিছুই।

খেলা দেখে সবাই ম্যাচের গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে, আর একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের কাজ সেইসময়ই শুরু হয়। বেশ মনে আছে, একবার এক পাড়ার দাদাকে ইডেনে আইপিএল ম্যাচের টিকিট দিয়েছিলাম, যাওয়ার সময় ইডেনে একসঙ্গে গিয়েছি, ফেরার সময় দেখি, খেলা শেষ হতেই আমাকে মোবাইলে ডাকছে, ‘‘কী করে বাড়ি যাবি না, এখনও কিসের খেলা দেখছিস? তোদের আর শখ শেষ হয় না!’’

আমি তাঁকে কী বলব, ভেবে উঠতে না পেরে মোবাইল ফোনটা কেটে সাইলেন্ট করে দিয়েছিলাম। কারণ সেইসময় প্রেস কনফারেন্স চলছিল। সেখানে মোবাইল বেজে উঠলে আপনাকে নয় সকলের সামনে তিরস্কৃত হতে হবে, নয়তো পত্রপাঠ বেরিয়ে যেতে হবে।

ফুটবল মাঠে দর্শকের সামনে রিপোর্টিং করা একবার ঘটেছিল কেরলের ত্রিচূড়ে সন্তোষ ট্রফি কভার করতে গিয়ে, আরও একবার শিলিগুড়িতে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে। বিয়ে বাড়ির প্ল্যাটফর্মের মতো সামনে একটা বসিয়ে দিয়েছে, তাতে সাদা চাদর পাতা। গোলমুখী আক্রমণ হলে দর্শকরা ওটা নেড়েই আনন্দ করছিলেন। ঢকঢক করে ওটা নাড়াচ্ছে, আর ল্যাপটপও নড়ছে, কারোর কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই।

ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে আবার দর্শকরা পাশেই রয়েছেন, কিন্তু তাঁরা নিজেদের সীমানা জানেন। দর্শকদের ভিড়ে বসেই ম্যাচ রিপোর্ট করতে হচ্ছে, কখনও সাংবাদিকদের মনে হচ্ছে না নিরাপত্তা নেই। গোল হলে ‘ওলে, ওলে….’ বলে আনন্দ করছেন, গান গাইছেন। তার মধ্যেও শিক্ষনীয় বিষয়। তাঁদের আনন্দ অন্যের নিরানন্দের কারণ না হয়, সেদিক থেকেও তাঁরা সতর্ক।

মাঠের সাংবাদিকদের মতোই ধারাভাষ্যকারদেরও বহু সমস্যার মধ্যে কাজ করতে হয়। একবার ইস্টবেঙ্গল মাঠের গ্যালারিতে সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন কেন বিপক্ষ দল গোল করার পরে ধারাভাষ্যকার ‘গো…ও…ল…’ বেশি চিৎকার করে বলেছেন। আর ময়দানের তিন ঘেরা মাঠে (মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডান) ধারাভাষ্যকারদের একেবারে কোলের কাছে থাকেন দর্শকরা। তাঁরা একদিকে খেলাও দেখছেন, আবার কান খাঁড়া করে শুনছেন বিশেষজ্ঞ ধারাভাষ্যকার তাঁদের দলের নামে কোনও বিরুদ্ধাচরণ করলেন কিনা!

ধারাভাষ্যেও বহু বদল এসেছে। বাংলা ধারাভাষ্য প্রথম আঞ্চলিক ধারাভাষ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে ১৯৫৭ সালে। বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার প্রদীপ রায় বলছিলেন, ‘‘১৯৯৯ সালে যেবার হ্যানসি ক্রোনিয়ের নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকা দল ইডেনে টেস্ট খেলতে এল। সেইসময় ওদের নাটাল প্রদেশ থেকে জুলু ভাষায় ধারাভাষ্য দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন ভারতবর্ষে প্রথম কোনও আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বাংলাই পথ দেখিয়েছিল, ওঁরা তারিফ করেছিলেন এটা শুনে।

শিয়রেই ইউরো কাপ ও কোপা আমেরিকা কাপ। রাত পোহালেই শুরু হবে ইউরো কাপের আসর। মোট দশটি স্টেডিয়ামে খেলা হবে। কিন্তু এবারও মুম্বইয়ের স্টুডিও থেকে ধারাভাষ্য দেওয়ার কাজ চলবে বাংলা, হিন্দি ও ইংরাজিতে।

ধারাভাষ্যের নানা বিবর্তন এসেছে। একটা সময় অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য্য, পুষ্পেন সরকাররা মাঠ থেকে সরাসরি ধারাভাষ্য দিতেন। অজয় বসুর ‘ইডেনের নন্দনকানন থেকে বলছি…’ এই ভাষ্য তো বাঙালির হেঁশেলে স্থান করে নিয়েছিল একটা সময়।

তিনি রেডিওতে এমনভাবে কথা বলতেন, যেন শ্রোতা রেডিও খুললেই খেলাটিকে দেখতে পান। তাঁদের কথা মানুষ রেডিওতে শুনতেন, দেখতেনও। কারণ মাঠের পরিবেশ, খেলার টেকনিক্যাল বিষয়, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ, সবটাই তাঁরা এমনভাবে বর্ণনা করতেন, মানুষ মনে করতেন তাঁরা মাঠেই বসে রয়েছেন।

সেটা একটা সময়, তারপর টিভি যখন এল, সেইসময় চ্যালেঞ্জটা অন্যভাবে ধরা দিল, দর্শক যেহেতু খেলাটি দেখতে পাচ্ছেন, সেই কারণে খেলার বিভিন্ন দিক, নানা ইতিহাস তুলে ধরে সেগুলি দর্শকদের সামনে রাখা, এটিও ধারাভাষ্যের আরও একটি পর্যায়।

কলকাতা লিগের ম্যাচেই দেখলাম, আকাশবানী থেকে কমেন্ট্রি টিম এসেছে কোনও মেশিন ছাড়াই, আগে পুরো সেটআপ নিয়ে এসে সেটিকে স্থাপন করে কাজ শুরু করতে হতো। মোবাইল ধারাভাষ্য চলে আসার পরে সেই মেশিন ও সেটআপের কোনও প্রয়োজন পড়ল না। প্রযুক্তির সহায়তায় মোবাইল থেকে কমেন্ট্রি দেওয়া শুরু হল। পুরো সিস্টেমটা যদিও স্টুডিওতে বসে কারিকুরি জানা আধিকারিকরা পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু মেশিন মাঠে নিয়ে যাওয়ার ঝক্কি আর পোহাতে হল না।

মোবাইল কমেন্ট্রি থেকে টিভিতে এল স্টুডিওতে বসে ধারাভাষ্য দেওয়ার কাজ। মাঠের সেই শব্দব্রক্ষ্ম নেই, কাঁচের ঘরে বসে টিভি দেখে ম্যাচ বিশ্লেষণ করা। যেহেতু দর্শকরা সবটাই টিভিতে দেখতে পাচ্ছেন, তাই আরও পরিসংখ্যান, আরও নানা ঘটনার সমারোহে পরিবেশন করার মধ্যে আরও বেশি চ্যালেঞ্জ।

অজয় বসুর সফল উত্তরসূরী কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার বরানগরবাসী প্রদীপ রায়ের কথায়, ‘‘স্টুডিওতে বসে প্রথম ধারাভাষ্য আমরা দিয়েছিলাম সাওপাওলো বনাম টিএফএ-র একটা ম্যাচে। জামশেদপুরে প্রথম ম্যাচ মাঠে বসে করলেও, পরের দিল্লি ম্যাচ আমরা স্টুডিওতে বসে প্রথম কাজ করেছিলাম। এখন কৃত্রিম উপায়ে দর্শকদের চিৎকার, কিংবা গ্যালারির একটা শব্দব্রক্ষ্ম তৈরি করা হয়, কিন্তু সেই ছন্দকে ধরে রাখাও ধারাভাষ্যকারদের কাছে কঠিন বিষয়।’’

শেষে এল ঘরে বসে কমেন্ট্রি করা। সেটি এল কোভিড পরিস্থিতির কারণে। লকডাউনে সব যখন অচল, অথচ খেলা হচ্ছে ভিনরাজ্যে। সেইসময় আইএসএলে ধারাভাষ্যকাররা ঘরে থেকে কাজ করেছেন। সেটি ঠিক কীভাবে? প্রদীপ বাবুই জানালেন, ‘‘আগে থেকে প্রোডাকশন টিম আমাদের ঘরে সেটআপ তৈরি করে গিয়েছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে। ঘরটিকে যতটা সম্ভব সাউন্ডপ্রুফ করা হলেও মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসা, এগুলি তো আটকানো যায় না। কিংবা দেখতে হয়, আচমকা কোনও বাচ্চা বাইরে কেঁদে উঠল কিনা, বাড়িতে এসে কেউ কলিং বেল টিপল কিনা, সবটা দেখতে হয়। আচমকা কেউ ঘরে প্রবেশ করলেও বিপত্তি, সব খেয়াল রাখতে হয়।’’

ধারাভাষ্যকাররা আরও একটি সমস্যার কথা জানিয়েছেন। মাঠে কমেন্ট্রি করার সময় কানের পাশে কেউ কথা বলে না, কিন্তু টিভিতে বর্তমানে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ সমানে হেডফোনে নানা নির্দেশিকা দেন। এটি বিরক্তিকর তো বটেই, পাশাপাশি খেলা দেখা, সতীর্থ ধারাভাষ্যকারের বক্তব্য শোনা, সর্বোপরি বিশ্লেষণ করা, সবটাই খুব কঠিন। তবুও এটাও একটা পেশাদারিত্ব কাঠামো, এগুলি মেনেই কাজ করতে হয় ধারাভাষ্যকারদের।
সেই কারণেই সোনি টিভির হয়ে ইউরো কাপে কমেন্ট্রি দিতে গিয়ে বাইচুং ভুটিয়া, রহিম নবিদের মতো প্রাক্তন ফুটবলাররাও বেশ টেনশনে রয়েছেন। তাঁরা হয়তো খেলার মাঠে নিজ ক্ষমতা বলে দক্ষতা দেখাতে পারেন, কিন্তু কমেন্ট্রি দিতে গিয়ে অন্যের নির্দেশও পালন করে কাজ করা সহজ কথা নয়। তাই তো বাইচুং, কিংবা একটা সময় কমেন্ট্রি করা সুনীল ছেত্রীদেরও মত হল, ‘‘আমরা যাঁরা ফুটবলাররা ধারাভাষ্য দিয়ে থাকি, তাঁরা সবসময় মাথায় রাখি, আনুষঙ্গিক বিষয় যতটা সম্ভব উহ্য রেখে খেলার টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে আলোচনা বেশি করতে, তাতে সমস্যা কম হয়।’’

প্রদীপ রায়দের মতো প্রথিতযশা ধারাভাষ্যকারদের কাজ আরওই কঠিন। তাঁদের বাচন শৈলী তো বটেই, গ্যালারির রং, উৎসব, কিংবা বিষাদের পাশে দু’দলের খেলার কারিকুরি বিষয়ও বর্ণনা করতে হয়, তাই কাজ কারও পক্ষেই সহজ নয়, এটা বলে দেওয়া যায়।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More