স্বপ্ন দেখছে দেশ, দাদার চ্যালেঞ্জ দাদার সঙ্গেই

দেবার্ক ভট্টাচার্য্য

সালটা ১৯৯৯। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে কলঙ্কতম অধ্যায়। ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে ছারখার ভারতীয় ক্রিকেট। আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজার মতো ক্রিকেটাররা নির্বাসিত। সমর্থকরা মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন এই খেলা থেকে। ক্রিকেটারদের কুশপুতুল পোড়ানো হচ্ছে। ভাঙচুর হচ্ছে বাড়ি। ঠিক সেই মুহূর্তে অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন বেহালার এক তরুণ। কতই বা বয়স তখন। মাত্র ২৬। বাকিটা ইতিহাস।

 

শচীন তেণ্ডুলকর, রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষ্মণ, অনিল কুম্বলের সঙ্গে মিলে ভারতীয় ক্রিকেটের খোলনলচে বদলেছেন বেহালার বীরেন রায় রোডের সেই ছেলেটা। নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। এই ফ্যাব ফাইভের ক্যারিশমাতেই তো ফের প্রাণ ফিরে পেয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট।

২০০১ সাল। মাঠে টসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে টানা ১৬ টেস্ট জয়ী স্টিভ ওয়। স্টিভকে ইডেনের সবুজ গালিচায় দাঁড় করিয়ে সৌরভ নিজে দেরিতে নেমেছিলেন টস করতে। স্টিভের চোখে চোখ রাখতে বিন্দুমাত্র ভয় লাগেনি তাঁর। নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, তুমি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারো, কিন্তু এটা আমার ঘরের মাঠ। এই মাঠেই অস্ট্রেলিয়ার জয়ের ঘোড়া থামিয়েছিল ভারত। তাও আবার ফলো অন খাওয়ার পর।

কাট টু ২০০২ সাল। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে শেষ ওভারে যখন জয়ের রান পূর্ণ করছেন মহম্মদ কাইফ ও জাহির খান তখন লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে জার্সি খোলার সাহস ক’জন দেখাতে পারেন। এখনও পর্যন্ত ক্রিকেটের ইতিহাসে লর্ডসে এই দাদাগিরি কিন্তু একবারই দেখা গিয়েছে। পরে সৌরভ বলেছিলেন, ওটা ছিল ভারতে এসে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের জার্সি খোলার বদলা। লর্ডসের ব্যালকনিতে তখন সৌরভের পাশে ছিলেন ভিভিএস লক্ষ্মণ। পরে অনেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সৌরভকে জার্সি খোলা থেকে আটকানোর অনেক চেষ্টা করেও পারেননি তিনি।

পরের বছরই দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে রূপকথা লেখে সৌরভের টিম ইন্ডিয়া। ফ্যাব ফাইভ তো ছিলেনই সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন বীরেন্দ্র সেহওয়াগ, যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফ, হরভজন সিং, জাহির খানের মতো তরুণ তুর্কিরা। অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো এই দলকে নিয়ে উঠেছিলেন ফাইনালে। যদিও ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে তাঁর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হয়।

তারপরেই যেন গ্রহণ লাগে ভারতীয় ক্রিকেটে। বোর্ডের সঙ্গে রীতিমতো ঝগড়া করে গ্রেগ চ্যাপেলকে কোচ করে এনেছিলেন সৌরভ। সেই চ্যাপেলই তাঁকে ছাঁটাই করে দেন দল থেকে। তবে থেমে থাকেননি তিনি। মহারাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিলেন ২০০৭ সালে।

নিজের শেষ টেস্ট সিরিজে করেছেন তাঁর সর্বোচ্চ স্কোর। ভারতের হয়ে বিশ্বকাপে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান তাঁর নামের পাশেই লেখা। টিম ইন্ডিয়াকে বিদেশের মাটিতে জিততে শিখিয়েছিলেন সৌরভ। তাঁর অধিনায়কত্বেই একের পর এক বিশ্বমানের ক্রিকেটার পেয়েছে ভারত।

Image

বেহালার সেই ছেলেটা খেলা ছাড়ার পরেও খেলা তাঁকে ছাড়েনি। মাঠে না নামলেও যোগ দিয়েছেন প্রশাসনে। ২০১৫ সাল থেকে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট। আর সম্প্রতি তিনি হয়েছেন বিসিসিআই-এর সভাপতি। ক্রিকেট বোর্ডের মসনদে বসেছেন সৌরভ। দায়িত্ব পেয়েই তিনি বলেছেন, বোর্ডের মধ্যে স্বচ্ছতা আনবেন। রঞ্জি স্তর থেকে ক্রিকেটার তুলে আনবেন। বিরাটের সঙ্গে মিলে এক নতুন ‘টিম ইন্ডিয়া’ তৈরি করবেন।

হ্যাঁ, তিনি পারবেন। এই বিশ্বাস দেশের প্রতিটি ক্রিকেট ভক্তের রয়েছে। ‘৯৬ সালে লর্ডসে যে ছেলেটার দলে সুযোগ পাওয়ারই কথা ছিল না ( নভজ্যোৎ সিং সিধু ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে ঝগড়া করে দেশে ফিরে যাওয়ায় জায়গা হয় সৌরভের ) সেই ছেলেটাই তিন বছর পরে দলের ব্যাটন সামলেছেন। ভারতীয় ড্রেসিং রুমের ‘দাদা’, মাস্টার ব্লাস্টার শচীন তেণ্ডুলকরের ‘দাদি’ পারেন না এমন কিছু নেই। খেলোয়াড় জীবনে ক্রিকেট বিশ্বকে দাপট দেখিয়েছেন এই বাঙালি। দলকে জয়ের মানে বুঝিয়েছেন। আর এখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই টালমাটাল অবস্থায় তিনি পারবেন না। তা কি হয়?

তিনি যে ক্রাইসিস ম্যানেজার। খেলোয়াড় জীবনেও ছিলেন। প্রশাসক হিসেবেও তাঁর কাছে সেটাই আশা কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের।

পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More