স্মৃতি হাতড়ে ঘরে-বাইরের সৌমিত্রকে খুঁজছেন চকদিঘির বাসিন্দারা

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে চকদিঘির জমিদারদের বাগানবাড়িতে টানা বেশ কয়েকদিন ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ‘ঘরে বাইরে ’ ছবির শ্যুটিং চলছিল তখন। প্রিয় শিল্পীকে একেবার কাছ থেকে দেখতে নাওয়া খাওয়া ভুলে চকদিঘির বহু মানুষ তখন পড়ে থাকতেন এই বাগানবাড়িতে। সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে চকদিঘির কয়েকজন যুবক ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। রবিবার তাঁর চলে চলে যাওয়ার খবর জানতে পারার পর থেকেই তাই স্মৃতি হাতরাচ্ছেন চকদিঘির মানুষ।

ইংরাজ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব কালে এই বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন হয়। সেই সময়কার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জামালপুরের চকদিঘির জমিদারদের নামও। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জমিদারি গেলেও ১০০ বিঘা জমি জুড়ে থাকা চকদিঘির বাগান বাড়ি আজও সেই জমিদারি ঐতিহ্যের স্বাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন চকদিঘির জমিদার পরিবারের একজন কাছের মানুষ। এই বংশের খ্যাতি শীর্ষে পৌঁছেছিল জমিদার সারদাপ্রসাদ সিংহরারের সময়। চকদিঘি বাগানবাড়ির পরিবেশ মুগ্ধ করেছিল খ্যাতনামা চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে। আশির দশকে তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ সিনেমার প্রায় পুরো শ্যুটিংই হয়েছিল এই বাগানবাড়িতে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর ব্যানার্জী, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত-সহ অন্যান্য শিল্পীরা দীর্ঘ সময় শুটিংয়ের জন্য চকদিঘির বাগানবাড়িতে কাটিয়েছেন।

সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে ঘরে বাইরে ছবিতে পালকি বাহকের চরিত্রে চকদিঘি এলাকার যে চারজন অভিনয় করেছিলেন তাঁদেরই একজন হলেন সত্যজিৎ সেন। সেদিনের যুবক সত্যজিৎ সেন এখন সত্তরোর্ধ্ব। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েছে শরীর। বললেন, ‘‘সৌমিত্রবাবু আর বেঁচে নেই এই কথাটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। সেই ‘ঘরে বাইরে’ ছবির শ্যুটিংয়ের জন্য টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় বাগানবাড়িতে কাটিয়ে ছিলেন ওঁরা । জমিদারদের বৈঠকখানা ঘর জুড়েই শ্যুটিং হয়েছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সত্যজিৎ রায়কে সামনে থেকে দেখার জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাদিন এখানে পড়ে থাকতাম। ওই সময়েই সুদর্শন সুপুরুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে কিছুটা হলেও কাছ থেকে দেখার ও সংলাপ শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।’’

স্মৃতি রোমন্থন করার সময়েই তিনি জানান “চকদিঘির জমিদারদের একটি বাড়ি আমি দেখাশোনা করতাম। সেই সুবাদে বাগানবাড়ির বৈঠকখানা ঘরের একেবারে কাছে চলে যেতে পারতাম। একদিন সৌমিত্রবাবু ও সত্যজিৎ রায় বৈঠকখানা ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎই সত্যজিৎ রায় ডেকে বললেন পালকিবাহকের পার্শ্ব চরিত্রে কয়েকজন যুবককে দরকার। আমি জোগাড় করে দিতে পারব কি না জানতে চাইলেন। আমি ও আমার চার সঙ্গী সেখানে অভিনয় করলাম।’’

বাগানবাড়ির লাগোয়া একটি বাড়িতে বসবাস করেন কাঞ্চন ঘোষ। তাঁর কথায়, ‘‘ঘরে বাইরে সিনেমার শুটিং চলার সময়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে একবার কাছ থেকে দেখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয়নি। তবে কিছুটা দূর থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখতে পেয়েছিলাম। ওই দৃশ্যে ভিক্টর ব্যানার্জী ঘোড়ায় চাপছিলেন আর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েছিলেন সৌমিত্রবাবু।’’

একেকজনের স্মৃতিতে একেকভাবে রয়েছেন তিনি। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই নিজেদের মতো করে বর্ষীয়ান অভিনেতাকে খুঁজে নিচ্ছেন চকদিঘির মানুষ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More