আব বাস করো! ‘ভিক্ষা নয়, অধিকার চাই’, ব্রিগেডে সমর্থনের স্রোতে ভাসলেন পীরজাদা সিদ্দিকি

রফিকুল জামাদার

বাংলায় শেষ কবে কোনও সংখ্যালঘু নেতা উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা থেকে উৎখাত করতে হবে!’

শেষ কবে কোনও সংখ্যালঘু নেতা গলার শিরা ফুলিয়ে বলেছেন, ‘আর ভিক্ষা চাই না। আমরা গর্বিত ভারতীয়। আমরা ভাগিদারি চাই, অধিকার চাই।’

শেষ কবে কোনও সংখ্যালঘু নেতা চোখে চোখ রেখে বলেছেন, ‘দিদির দাদাগিরির বিরুদ্ধে কেউ বলতে পারে না। কমিশন ভোট ঘোষণা করেছে। এ বার ভয় পাওয়ার দিন শেষ।’

ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা তথা আব্বাসউদ্দিন সিদ্দিকি নামে এক তরুণ সংখ্যালঘু নেতাকে কিছুদিন আগে চিনেছে তামাম বাংলা। শুধু এ রাজ্য নয়, দিল্লির পোড় খাওয়া বিশ্লেষকরাও এখন তাঁর নাম জানেন। তাঁর নতুন দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট তথা আইএসএফ তৈরি হওয়ার মাস খানেকের মধ্যেই এখন বেশ পরিচিত।

সেই আব্বাসউদ্দিন সিদ্দিকিকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করল রবিবাসরীয় ব্রিগেড। সকাল থেকেই ব্রিগেডের থইথই ভিড়ে বাম কংগ্রেসের পতাকার সঙ্গে মিলে মিশে উড়তে দেখা যাচ্ছিল আইএসএফের পতাকা। ব্রিগেডে আব্বাস যখন পৌঁছন তখন দুপুর ২ টো। মঞ্চে অধীর চৌধুরী বক্তৃতা দিচ্ছেন। আব্বাস মঞ্চে উঠতেই যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় মাঠ জুড়ে। স্লোগান, চিৎকার, হর্ষধ্বনি, হাততালি লহমার জন্য গুলিয়ে যায়, একুশের প্রথম ব্রিগেড মহাজোটেরই তো! নাকি আব্বাসের একার।

ব্রিগেডের মঞ্চে বক্তৃতা করা যে কোনও রাজনীতিকেরই স্বপ্ন থাকে। আব্বাস বয়সে তরুণ। একে তাঁর প্রথম ব্রিগেড, তায় এই বিপুল সমর্থন—আবেগে ভেসে যান তিনিও। তবে আব্বাস নিজেকে শুধু সংখ্যালঘু নেতা হিসাবে মেলে ধরতে চাননি। বরং তুলে ধরতে চেয়েছেন, বাঙালির নিজের ছেলে- এক সর্বজনের নেতা হিসাবে।

বক্তৃতার শুরুতে তাই প্রথাগত পথে না হেঁটে বলেন, “আমার প্রিয় দেশবাসী, আমার বাংলা ভাষাভাষী,জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমার মাতৃভূমির সন্তানেরা..। এই বিগ্রেডের জনসমুদ্রে আসা বাংলার প্রত্যেকটি লাঞ্ছিত অত্যাচারিত বঞ্চিত ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি আমার ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জানাই”। এমন সম্মোধনের পর ভিড়ের মধ্যে থেকে আবেগ উতলে ওঠাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। প্রতি অভিনন্দনের হাততালি ও চিৎকারে মুহূর্ত গর্জণ উঠেছে ব্রিগেড থেকে।

বস্তুত রাজনৈতিক দল গঠনের আগে থেকেই বাংলায় শাসক দলের বিরুদ্ধে সমালোচনায় ক্ষুরধার ছিলেন আব্বাস। এদিনও তাঁর বক্তৃতায় সেই ধার ও ভার ছিল অটুট। বামেদের সঙ্গে ইতিমধ্যে তাঁর আসন সমঝোতা হয়ে গিয়েছে। তাঁর দলকে ৩০ টি আসন ছেড়েছেন বামেরা। সেই প্রসঙ্গ টেনেই আব্বাস বলেন, এই সমঝোতা আরেকটু আগে যদি হতো, তা হলে কী ভাল যে হতো। গত শুক্রবার জুম্মার নমাজের আগে আমি ঘোষণা করেছিলাম, ব্রিগেডে আমরা সামিল হব। আর সাত দিন আগে যদি এই সিদ্ধান্ত হত, তা হলে আজ ব্রিগেডে দ্বিগুণ জমায়েত করতাম।
এ কথা বলেই ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে চড়া সুরে আক্রমণ করেন আব্বাস। বলেন, এই ভিড় দেখে নিশ্চয়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। কথা দিচ্ছি, যেখানে বাম শরিকরা প্রার্থী দেবেন, সেখানে দরকারে রক্ত দিয়ে তাঁদের জেতাব।
তাঁর কথায়, বিজেপির কালো হাত যেমন ভাঙতে হবে। তেমনই বাংলা থেকে উৎখাত করতে হবে তৃণমূলকে। কারণ, বিজেপি আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই টিম। এই ভোটে তাঁদের বিদায় নিশ্চিত।
আব্বাসের এদিনের বক্তব্য রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই। এক সময়ে বাংলায় সংখ্যালঘু ভোট বাক্সে বামেদের আধিপত্য ছিল। তৃণমূল জমানায় তা শাসক দলের একাধিপত্যে পরিণত হয়েছে। এতোটাই যে আম ধারনায় পরিণত হয়েছে যে সংখ্যালঘু ভোট মানেই তৃণমূলের বাক্সে যাবে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এদিন সেই ধারনাই ভাঙতে চেয়েছেন আব্বাস। বোঝাতে চেয়েছেন, ক্ষমতা দখলের জন্য আর তাঁদের ঘাড়ে বন্দুক রাখা যাবে না। ভিক্ষা নয়। ইমাম ভাতা নয়। সংখ্যালঘুরা এ বার অধিকার চায়। রাজনৈতিক ভাগিদারি চায়। তবে তাঁদের এও বক্তব্য, শুধু একটা ব্রিগেড দেখে উপসংহার টানলে অবশ্য ভুল হতে পারে। ব্রিগেডের এই জনসমর্থন আব্বাস কতটা নিজের ও বামেদের ভোট বাক্সে পৌঁছে দিতে সফল হবেন তা সময় বলবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More