গাড়ির ভেতরে করোনা থেকে বাঁচবেন কীভাবে, উপায় বললেন গবেষকরা

করোনাভাইরাস এয়ারবোর্ন, এ কথা মেনে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। তার মানে হল বাতাসে ভেসে ছড়াতে পারে করোনা। সেদিক থেকে গাড়ির ভেতরে ভাইরাস ছড়ানোর শঙ্কাও বেশি। পাশে বসা যাত্রীর শরীরে যদি বিন্দুমাত্র সংক্রমণ থেকে থাকে, তাহলে জলকণায় ভেসে সে ভাইরাস চলে আসতে পারে খুব দ্রুত।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বন্ধ গাড়ির ভেতরে কী ছড়াতে পারে করোনাভাইরাস? এ প্রশ্ন এখন বেশিরভাগেরই। এই করোনা কালে বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে যাওয়ার বদলে অনেকেই ট্যাক্সি, ওলা বা উবারে চড়ে যাওয়াই নিরাপদ মনে করছেন। নিজের গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। কিন্তু গাড়ির ভেতরে ভাইরাস ছড়াতে পারে কিনা সে নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। বিশেষত, প্রাইভেট ট্যাক্সি বা গাড়ির ক্ষেত্রে চালক ছাড়াও অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে সওয়ারি করতে হয়। সেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

করোনাভাইরাস এয়ারবোর্ন, এ কথা মেনে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। তার মানে হল বাতাসে ভেসে ছড়াতে পারে করোনা। সেদিক থেকে গাড়ির ভেতরে ভাইরাস ছড়ানোর শঙ্কাও বেশি। পাশে বসা যাত্রীর শরীরে যদি বিন্দুমাত্র সংক্রমণ থেকে থাকে, তাহলে জলকণায় ভেসে সে ভাইরাস চলে আসতে পারে খুব দ্রুত। আর গাড়ির ভেতরে তো ৬ ফুট সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মানা সম্ভব নয়। তাহলে কী করতে হবে?

অসিমাংশু দাস

ব্রাউন স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষক অসিমাংশু দাস বলছেন, গাড়ির ভেতরের জানলা কখনও খুলে রেখে আবার কখনও বন্ধ করে রেখে, নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। প্রথমত, সব জানলা বন্ধ করে যদি এসি অন রাখা হয় তাহলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। বন্ধ গাড়িতে বাতাসের কণায় ভাসমান ভাইরাসকে বাইরে বের করে দিতে পারে না কোনও এয়ার সার্কুলেটিং যন্ত্রই। তাই জানলা বন্ধ রেখে এসি চালানো একেবারেই নিরাপদ নয়।

দ্বিতীয়ত, চালকের পাশের জানলা খুলে রেখে, পিছনের সব জানলা বন্ধ রাখলেও সংক্রমণের শঙ্কা থেকে যায়। গবেষক বলছেন, গাড়ির সব জানলা খুলে রাখাই সেক্ষেত্রে নিরাপদ। বাতাস চলাচল ভাল হবে। ভেতরের বাতাস বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা পাবে। বিশেষত যাত্রীদের পাশে থাকা জানলা খোলা থাকলে ক্রস ভেন্টিলেশন ঠিকঠাক হবে, ভাইরাস ড্রপলেট থাকলেও তা বাতাসে জমে থাকতে পারবে না। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে এ গবেষণার খবর তিনি সামনে এনেছেন।

মানুষের নাক ও মুখ থেকে বেরনো জলকণায় ভাইরাল স্ট্রেন মিশে থাকতে পারে। এই জলকণা যখন বাতাসের সংস্পর্শে আসে তখন জলীয় বাষ্পে ভরাট হয়ে আরও বড় জলকণা তৈরি করে। একে এয়ার ড্রপলেট বলে। এই ড্রপলেটে ভেসে ভাইরাল স্ট্রেন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এখন এই এয়ার ড্রপলেট বা বাতাসে ভাসমান ভাইরাস জলকণা কতদূর অবধি ছড়াতে পারে বা বাতাসে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে সেটা নির্ভর করে নানা ফ্যাক্টরের উপরে। যেমন হাওয়ার গতি, হাওয়ার দিক, বাতাসের আর্দ্রতা, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ইত্যাদি। জলকণার আকার ও বাতাসের গতির উপর নির্ভর করে কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক ঘণ্টা অবধি ভাইরাস পার্টিকল বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। ৬ ফুটেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। জলকণা ভারী হয়ে গেলে সেটা খসে পড়ে মাটিতে বা কোনও সারফেসে জমে থাকে। এই সারফেস বা পদার্থ যদি মসৃণ হয়, তাহলে সেখানেও ভাইরাস পার্টিকলের টিকে থাকার সময় বেড়ে যায়। এই সময়ের মধ্যে ওই জমে থাকা জলকণার সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়।

গাড়ির ভেতরে কীভাবে জানলা খোলা বা বন্ধ রেখে ভাইরাসের সংক্রমণ রোখা যায় তার গ্রাফ বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। সব জানলা বন্ধ রাখলে ভাইরাল লোড বাড়ে (একদম উপরে বাঁ দিকে), সব জানলা খোলা রাখলে ভাইরাস ড্রপলেট কম ছড়ায় (নিচে ডান দিকে)

এই প্রসঙ্গে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্রাক্তনী ও বর্তমানে ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটির গবেষক ভার্ঘিস মাথাই বলেছেন, জানলা খুলে রাখা উচিত না বন্ধ করা সে নিয়ে গবেষণা চলছেই।

প্রাথমিকভাবে যে সূত্রগুলো পাওয়া গেছে তা হল—

১) গাড়ির পিছনের সিটে যদি দু’জন যাত্রীও থাকেন, তাহলে পরস্পরের পাশের জানলা খুলে রাখাই ভাল। কারণ যদি একটা খোলা থাকে এবং অন্যটা বন্ধ, তাহলে হাওয়া চলাচল আটকে যাবে। ধরা যাক, যেদিকের জানলা খোলা তার পাশে বসা যাত্রীর সংক্রমণ রয়েছে। তাহলে নাক বা মুখের জলকণায় ভেসে সেই ভাইরাস ড্রপলেট অন্যদিকে আসবেই। এখন যদি জানলা বন্ধ থাকে তাহলে তাহলে কিছুক্ষণ বদ্ধ বাতাসে ভেসে সেই ভাইরাস সমেত জলকণা খসে পড়ে জমে থাকবে। শরীরে সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ তৎক্ষণাৎ ধরে যাবে।

Disinfecting Your Vehicle Interior to Prevent the Spread of COVID-19

২) গাড়ির পিছনের সব জানলা অবশ্যই খুলে রাখতে হবে। ড্রাইভারের বিপরীতে থাকা সামনের দিকের জানলাও খোলা রাখতে হবে। মাথাই বলছেন, গাড়ির আশপাশে ও ভেতরে ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে হাওয়া বইতে পারে। সাধারণত দেখা যায়, গাড়ির পিছনের দিক দিয়ে হাওয়ার ঝাপটা ঢুকে সামনে দিয়ে বের হয়। যদি জানলাগুলো খোলা থাকে তাহলে এই ক্রস ভেন্টিলেশন হবে এবং হাওয়ার ধাক্কায় বেশিক্ষণ বাতাসে ভাইরাসের জলকণা টিকে থাকতে পারবে না।

Here's what we know about children, infection rates, and COVID-19 -  Chalkbeat

৩) গাড়ির ভেতরের বাতাস যেহেতু পিছন থেকে সামনে আসছে তাই চালকের রিস্ক ফ্যাক্টর থেকেই যায়। সেদিক থেকে চালককে তার ঠিক পাশের জানলাটা খুলে রাখতেই হবে। মাস্ক তো অতি অবশ্যই পরে থাকতে হবে।

৪) গবেষকরা বলছেন, এই সবকিছুর পরেও ফেস-মাস্ক একান্ত জরুরি। দুই যাত্রীর মাঝে দূরত্ব যতটা বেশি থাকবে ততই ভাল। প্রতিবার গাড়িতে ওঠার আগে স্যানিটাইজ করে নিলে ভাল হয়। কারণ ভাইরাসের জলকণা যে কোনও মসৃণ পদার্থ বা সারফেসে দুই থেকে তিন দিন বেঁচে থাকতে পারে। দরজার হাতল খোলা ও বন্ধ করার পরে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিতে হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More