শ্বাসবায়ুর এত সঙ্কট দেশে, কী এই মেডিক্যাল অক্সিজেন? কীভাবে তৈরি হয়, কেন লাগে করোনা রোগীদের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা আবহে দেশে সবচেয়ে বড় সঙ্কট মেডিক্যাল অক্সিজেনের অভাব। রাজ্যে রাজ্যে চাহিদা বাড়ছে। অক্সিজেনের অভাবে হাসপাতালে কোভিড রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। সরকার বলছে, দেশে মেডিক্যাল অক্সিজেন বা তরল (লিকুইড) অক্সিজেনের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিদেশ থেকেও অক্সিজেন প্ল্যান্ট উড়িয়ে আনা হচ্ছে। পিএসএ প্ল্যান্ট বসিয়ে ‘লিকুইড মেডিক্যাল অক্সিজেন’ তৈরি হচ্ছে। এখন অনেকেরই প্রশ্ন, মেডিক্যাল অক্সিজেন বা তরল অক্সিজেন কী? বাতাস থেকেই তো আমরা শ্বাসবায়ু টেনে নিতে পারি, যেটা গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। তাহলে চিকিৎসার জন্য তরল অক্সিজেনের দরকার কেন পড়ছে?

 

লিকুইড মেডিক্যাল অক্সিজেন (এলএমও) কী?

মেডিক্যাল অক্সিজেন হল পরিশোধিত বিশুদ্ধ অক্সিজেন। বাতাসে তো সবরকম গ্যাস মিলেমিশে থাকে। সেখান থেকে শুধু অক্সিজেন ছেঁকে বের করে নিয়ে তা বিশুদ্ধ করে যখন রোগীকে দেওয়া হয় বা চিকিৎসার কাজে লাগে, তখন তাকে বলে মেডিক্যাল অক্সিজেন। সহজ কথায়, এই অক্সিজেনের মধ্যে অন্য কোনওরকম গ্যাস বা ধুলো-বালি, দূষিত কণা মিশে থাকে না।

Medical Liquid Oxygen Gas for Hospital, Rs 80 /litre D. C. Ranganathan Agency | ID: 8898970612

এই মেডিক্যাল অক্সিজেন তরল অবস্থায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়। কারণ, অক্সিজেনের গলনাঙ্ক (melting points) ও স্ফুটনাঙ্গ (boiling points) কম হওয়ায় সেটি বায়বীয় বা গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। গ্যাসীয় অক্সিজেন স্টোর করে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি তরল অবস্থায় অক্সিজেনেকে ধরে রাখা যায়, তাহলে একদিকে যেমন রোগীকে সহজে দেওয়া যায় তেমনি বড় বড় ট্যাঙ্কারে সংরক্ষণ করেও রাখা যায়। সে কারণেই মেডিক্যাল অক্সিজেন তরল অবস্থায় থাকে।

Second Wind: How Liquid Medical Oxygen Can Save Lives in Covid Crisis

মেডিক্যাল অক্সিজেন তৈরি হয় কীভাবে?

লিকুইড মেডিক্যাল অক্সিজেন তৈরির নানা প্রক্রিয়া আছে। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত পদ্ধতি হল এয়ার সেপারেশন ইউনিট (এএসইউ)। একধরনের প্রোডাকশন প্ল্যান্ট যেখানে গ্যাসীয় মিশ্রণ আলাদা করা হয়। বাতাসের নানা গ্যাসগুলির মধ্যে অক্সিজেন ছেঁকে বের করে নেওয়া হয় এই প্ল্যান্টের সেপারেশন ইউনিটে। এই যে গ্যাসগুলোকে আলাদা করার পদ্ধতি তাকে বলে ‘ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন মেথড’ ।

Hot topic: Understanding medical oxygen | Features | gasworld

সেটা কী? বাতাসে নাইট্রজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি নানা রকম গ্যাস মিলেমিশে থাকে। সেই সঙ্গে ধূলিকণাও থাকে। এই পদ্ধতিতে ধরে রাখা বাতাসকে খুব কম তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়। -১৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলানো শুরু হয়। এই প্রচণ্ড হাড়হিম তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অক্সিজেন গলে তরল হয়ে যায়। নাইট্রোজেন তরল হতে -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার দরকার পড়ে, তাই -১৮১ তে নাইট্রোজেন গ্যাসীয় অবস্থাতেই থাকে। তবে অক্সিজেনের সঙ্গে আরও একটা গ্যাস গলে গিয়ে তরল হয়, তা হল আর্গন।

এবার এই দুই তরলের মিশ্রণকে অন্য একটি ডিস্টিলেশন ভেসেলের মধ্যে দিয়ে কম-চাপে পাঠানো হয়। সেখানেই তরল অক্সিজেন আর্গনের থেকে আলাদা হয়ে যায়।

 

পিএসএ (PSA) প্ল্যান্ট নিয়ে এত খবর শোনা যাচ্ছে, সেটা আসলে কী?

পিএসএ হল—প্রেসার সুইং অ্যাবসরর্পশন টেকনিক (Pressure Swing Adsorption Technique)। এই পদ্ধতিতেও লিকুইড মেডিক্যাল অক্সিজেন তৈরি করা যায়। আগের পদ্ধতিটা ছিল ক্রায়োজেনিক বা খুব কম তাপমাত্রায় গ্যাসকে গলিয়ে তরলে পরিণত করার পদ্ধতি। আর পিএসএ হল উচ্চচাপে গ্যাসীয় মিশ্রণকে পৃথক করার পদ্ধতি হল পিএসএ।

PSA Oxygen Plant, Automation Grade: Automatic, Capacity: 100 Nm3 / Hr, Rs 200000 /unit | ID: 12170305173

পিএসএ প্ল্যান্টে গ্যাসীয় মিশ্রণকে একটা ভেসেলের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয়। এই ভেসেলে গ্যাস শুষে নেওয়ার জন্য থাকে ‘অ্যাবসরবেন্ট বেড’ জিওলাইট। এই জিওলাইট নাইট্রোজেন টেনে নেয়। বাকি অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাস ভেসেলের মধ্যে দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এবার এই অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাস থেকে অক্সিজেন আলাদা করে তাকে তরল অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের উদ্যোগে এখন বেশিরভাগ হাসপাতাল বা কোভিড সেন্টারে পিএসএ প্ল্যান্ট বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এই ‘এএসইউ’ বা ‘পিএসএ’ প্ল্যান্টে বিপুল পরিমাণে অর্থাৎ বাণিজ্যিক ভাবে মেডিক্যাল অক্সিজেন উৎপাদন করা হয়।

তাছাড়াও ছোটখাটো অক্সিজেন জেনারেটর আছে যাকে বলে ‘অক্সিজেন কনসেনট্রেটর’। বাড়িতে অন্দরবাসে থাকা করোনা রোগীদের জন্য এই পোর্টেবল অক্সিজেন জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে এখন।

5 COVID-19 patients die due to lack of oxygen at hospital in MP

করোনা রোগীদের কেন এত মেডিক্যাল অক্সিজেন দরকার পড়ছে?

মানুষের ফুসফুস প্রতি মিনিটে ৫-৬ মিলিলিটার অক্সিজেন টেনে নিতে পারে। সারা শরীরে অন্তত ২৫০ মিলিলিটার অক্সিজেন শোষিত হয় প্রতি মিনিটে। কিন্তু করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে এই অক্সিজেনের চাহিদা প্রায় চার গুণ বেশি হচ্ছে। কারণ হল, আমরা যখন শ্বাসের সঙ্গে বাতাস টানছি তখন শ্বাসনালী দিয়ে গিয়ে ফুসফুসের জমা হচ্ছে, সেখানে অ্যালভিওলাস ও রক্তচাপের পার্থক্যের জন্য অক্সিজেন আলাদা হয়ে ধমনীর রক্ত দিয়ে গিয়ে কোষে কোষে পৌঁছচ্ছে আবার কার্বন ডাই অক্সাইড বের হয়ে যাচ্ছে ফুসফুস থেকে। সেটাও একটা জটিল পদ্ধতি। কোভিড সংক্রমণ হলে ভাইরাসের স্ট্রেন এই পদ্ধতিটাকেই আটকে দেয় নানাভাবে। ফুসফুসে এতটাই ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ শুরু হয় যে অক্সিজেন ফুসফুসে ঢোকা ও কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়া যাওয়ার পদ্ধতিটা বন্ধ হয়ে যায়। তখন কোষে কোষে অক্সিজেন পৌঁছতে পারে না। রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কৃত্রিমভাবে বাইরে থেকে অক্সিজেন দিতে হয় রোগীকে।

সাধারণত শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ১০০ থাকে। খুব কমলেও সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে তা ৯৭-এর নীচে নামার কথা নয়। কিন্তু কোভিড রোগীদের অক্সিজেনের মাত্রা ৯৪ বা তারও নীচে নেমে যেতে দেখা যাচ্ছে। ফলে অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছে শরীরে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হচ্ছে, প্রভাব পড়ছে মস্তিষ্কেও। রোগীরে এই সমস্যা থেকে উদ্ধার করার জন্যই মেডিক্যাল অক্সিজেন দেওয়ার দরকার পড়ছে।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More