ছেলেবেলার স্মৃতিরা হারিয়ে যায় কেন, মাথার স্মৃতি-বাক্স নেড়েঘেঁটে রহস্যের জট খুলল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছেলেবেলার দিনগুলো সবসময়েই রঙিন স্মৃতিতে মোড়া। স্কুলের দিন, বাড়ির উঠোনে একঝাঁক বন্ধুর সঙ্গে হুড়োহুড়ি, বাড়ির পাশের কৃষ্ণচূড়ার গাছে পড়ন্ত রোদের আলোয় ঠাকুমার মুখে রূপকথার গল্প—এসব ভোলা যায় না সহজে। বাড়ির ছাদের সেই চিলেকোঠার ঘরে কত মুনিমুক্ত জমা হয়ে আছে তা কালের পাতায় হারিয়ে যায় অনেক সময়েই। শত চেষ্টা করেও ছিঁড়ে যাওয়া সে সুতো গাঁথতে পারে না আমাদের মস্তিষ্ক। হারিয়ে যায় কত টুকরো টুকরো স্মৃতি। সত্যিই কি হারিয়ে যায়? নাকি জমা হয়ে থাকে মাথার কোনও অজানা কুঠুরিতে? কীভাবে তৈরি হয় স্মৃতি, হারিয়েই বা যায় কোথায়, এই সব প্রশ্নের কিছু উত্তর পাওয়া গেছে বিগত কয়েক দশকে। যার থেকে আমরা স্মৃতি-রহস্যের জট খুলতে পেরেছি কিছুটা হলেও।

‘পুরানো সেই দিনের কথা’… না সত্যিই মনে নেই। হামা দেওয়ার দিনগুলোর কথা মনে আছে আপনার? বয়স যখন তিন কি পাঁচ, বাড়ির কোন কাকু বা জেঠু কটা লজেন্স দিয়েছিল, আপনি কী কী কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, মাথা খুঁড়লেও মনে পড়বে না। যদি না কেউ মনে করিয়ে দেয়। আসলে ছোটবেলা আমাদের মনের গাঁথুনিটা তৈরি হয় নানা রঙের স্মৃতি দিয়ে। আমরা এই ‘আমি’ কে চিনতে শুরু করি। পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে যা অনুভব করি, তাই শিখি। কানে শোনা, কথা বলা, স্পর্শ ইত্যাদি অনুভূতি, উপলব্ধিগুলো আমাদের মন আর মাথায় গেঁথে যায়। তার কিছু যা আমাদের মনকে প্রভাবিত করে যায় তাই থেকে যায় স্মৃতিতে, আর বাকিটা হারিয়ে যেতে বসে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই স্মৃতি হল টেপ রেকর্ডারের মতো, বারে বারে চালিয়ে আমরা তা মনে রাখার চেষ্টা করি। ভাল স্মৃতি হলে তাকে বারে বারে মস্তিষ্ক থেকে রোমন্থন করে নিয়ে আসি, আর খারাপ স্মৃতি না চাইতেও অবচেতনে থেকে যায়। ভবিষ্যতে কোনও ভয়ঙ্কর ট্রমা হয়ে ফিরে আসে। সে অন্য গবেষণা, পরে বলা যাবে।

Childhood Amnesia: Why Some Memories Fade and Others Don't | The Takeaway | WNYC Studios

আজকের লেখা হল কেন শৈশবের স্মৃতি ভুলে যাই আমরা। এর কারণ হল আমাদের মস্তিষ্ক বা ব্রেন আর তার ভেতরে থাকা কোটি কোটি স্নায়ুর জট। স্মৃতিরা এই জালেই বাঁধা পড়ে। কিছু ফিরে আসে অলিগলি দিয়ে, বাকিরা হয়ত জমে থাকে এমনই কোনও ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা স্নায়ুর জালের অন্তরালে, যার হদিশ এখনও পাননি বিজ্ঞানীরা। এই যে ছোটবেলার স্মৃতিরা হারিয়ে যায়, তারও একটা বিজ্ঞানসম্মত নাম আছে। মনোবিজ্ঞান বলে ‘চাইল্ডহুড অ্যামনেসিয়া’ বা   ‘ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেসিয়া’

Infantile Amnesia: Why Can't I Remember My Childhood?

এই শব্দের প্রথম প্রচলন করেন সাইকোলজিস্ট ক্যারোলিন মাইলস। ১৮৯৫ সালে তাঁর প্রতিবেদন ‘এ স্টাডি অব ইনডিভিজুয়াল সাইকোলজি’-তে ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেসিয়া নিয়ে বেশ হইচই হয়। বিজ্ঞানী বলেছিলেন, সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের স্মৃতি হারিয়ে যায় আমাদের মস্তিষ্ক থেকে। আবার এর ব্যতিক্রমও হয়। অনেকেই স্কুল জীবন বা তার পরের স্মৃতিও মনে করতে পারেন না। সেটা মস্তিষ্কের গঠনগত কোনও ত্রুটি বা স্নায়ুর সিগন্যালের সমস্যার জন্য হতে পারে। স্মৃতিভ্রংশ হলে তো মস্তিষ্কের স্মৃতির বাক্সটাই উল্টে যায়। ১৯১০ সালে সিগমান্ড ফ্রিউড নামে একজন মনোবিজ্ঞানী ‘সাইকোঅ্যানালিটিক থিওরি’ দিয়ে এই শৈশবের স্মৃতিভ্রংশের ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের স্মৃতিনাশ সবার একরকমের হয় না, ব্যক্তিবিশেষে এবং লিঙ্গভেদেও নাকি আলাদা। একে বলা যেতে পারে ‘হিসটেরিক্যাল অ্যামনেসিয়া’ । ছয় থেকে আট বছর বয়স বা তার পরের স্মৃতিও সেভাবে মনে থাকে না। ‘থ্রি এসেস অন দ্য থিওরি অব সেক্সুয়ালিটি’ নামে বইতে তিনি তাঁর এই গবেষণার ব্যাখ্যা করেছিলেন।

যাই হোক, স্মৃতি কোথায় হারিয়ে যায় সেটাই হল সবচেয়ে বড় কথা। এই নিয়ে গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়েই। অনেক রকম তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। কেউ বলছেন, আমাদের কথা বলা এবং সেই কথা কানে শোনা, একটা বড় ভূমিকা নেয়। একদম ছোটবেলায় যখন শিশুরা কথা বলতে শেখে না, সেই সময়ের স্মৃতি মাথায় গেঁথে বসে না। তাছাড়া মস্তিষ্কের গঠনও তখন পরিণত হয় না। আবার দেখা যায়, আমাদের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কিছু বিষয় স্মৃতি সঞ্চয় করে রাখতে সাহায্য করে। এমন কিছু ঘটনা যা মনকে নাড়া দিয়ে যায় তাই মাথায় থেকে যায়। আবার কিছু অভ্যাস যেমন সাইকেল চালানো, সাঁতার শেখা, লিখতে শেখা—এগুলো ভোলা যায় না।

How Brain Cells Communicate With Each Other

বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মৃতি একরকমের নয়। কিছু স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী লং-টার্ম মেমোরি—তারও ধরন আছে। কিছু আমরা সজ্ঞানে মনে রাখি যেমন এক্সপ্লিসিট মেমোরি আবার কিছু স্মৃতি কারণ ছাড়াই মনে থাকে ইমপ্লিসিট মেমোরি।  কিছু স্মৃতিকে আমরা বলি এপিসোডিক মেমোরি যা কোনও বিশেষ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, আবার প্রতিদিনের ঘটনা বা জেনারেল নলেজ হল সেমান্টিক মেমোরি। তাছাড়া প্রাইমিক মেমোরি আছে যার দ্বারা আমরা কোনও বস্তুকে চিনতে পারি, মনে রাখতে পারি বা বহু পুরনো কোনও কথা মনে করতে পারি।

What You Need to Know About the Nervous System

স্মৃতির-বাক্স

এই যে স্মৃতি বা মনে রাখার ক্ষমতা, এটা কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কেরই একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে হয়। সহজ করে বললে, মাথার ভেতরে স্মৃতির বাক্স থাকে। এই বাক্সেই জমা হতে থাকে স্মৃতিরা। বিজ্ঞানীরা এই স্মৃতির বাক্সকে বলেন হিমোক্যাম্পাস। পঞ্চাশের দশকে জনপ্রিয় চিকিৎসক উইলিয়াম স্কুভিলি তাঁর এক রোগীর সার্জারি করতে গিয়ে মাথার ভেতরের এই বিশেষ এলাকা হিমোক্যাম্পাসকে চিহ্নিত করেন। এই হিমোক্যাম্পাসই হল স্মৃতির-বাক্স। এর মধ্যেই স্মৃতি জমা থাকে, স্মৃতির রোমন্থন হয়। এই স্মৃতিরা আবার সরণি বেয়ে তথা স্নায়ুর জান বেয়ে নামাওঠা করে।

New Hippocampus Map Shows Structures and Functions in Great Detail

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির অধ্যাপক ডক্টর পল রেবার বলেছিলেন, মানুষের মস্তিষ্কে রয়েছে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন নিউরন। প্রতিটি নিউরন একে অপরের সঙ্গে হাজারের বেশি সংযোগ গড়ে তুলছে,  যার গাণিতিক সংখ্যা হবে এক ট্রিলিয়নের বেশি। আমরা যখন কিছু দেখি বা কোনও ঘটনা ঘটে, তখন স্নায়ু একটা বৈদ্যুতিক বা রাসায়নিক সংযোগ তৈরি করে। একে বলে সিগন্যাল। এই সিগন্যাল আবার কোডের মতো জমা হয় হিমোক্যাম্পাসে। কম্পিউটারে যেমন আলাদা আলাদা কোড থাকে, এক একটি ঘটনার কোডও তেমনি পৃথকভাবে স্মৃতি-বক্সে জমা হতে থাকে। যে কোডকে আমরা বারে বারে মনে করতে চাইব সে হবে জোরালো, তার সিগন্যালের জোরও বেশি। হিপোক্যাম্পাস বুঝবে এই বিশেষ ঘটনাকে আমরা জমা করে রাখতে চাইছি। তখন সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মাথায় থেকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি প্রতিটি নিউরন একটি করে স্মৃতি ধরে রাখে তাহলে মানুষ লক্ষ লক্ষ স্মৃতি জমা করে রাখতে পারবে। কিন্তু তা সম্ভব হয় না ব্যতিক্রম ছাড়া। আর শৈশবে তো হয়ই না। কারণ তখন হিমোক্যাম্পাসের গঠন সম্পূর্ণ হয় না। এত জালের জটও থাকে না। তাই কচি বয়সের স্মৃতিরা হারিয়ে যায় অচিরেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More