শক্তিরূপেণ! যুদ্ধবিমান উড়িয়েছেন, ছুঁতে পারেনি শত্রুসেনার বুলেট, রণক্ষেত্র জয় করেছেন ভারতীয় সেনার যে দুর্গারা

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহসী মহিলা যোদ্ধারা, প্রাণ তুচ্ছ করে দেশসেবাকেই অঙ্গীকার করেছেন যাঁরা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কুর্নিশ সেই বীরাঙ্গনাদের।

চৈতালী চক্রবর্তী

ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি হয়নি জীবন। চেনা পরিবেশের বাইরে কাঁটাপথ বেছে নিয়েছেন তাঁরা। হেঁশেল ঠেলেও হাতে তুলেছেন অস্ত্র। দেশসেবাকেই অঙ্গীকার করে লক্ষ্যের পথ খুঁজে পেয়েছেন। রুক্ষ-বন্ধুর পথে চলাতেই তাঁদের আনন্দ, বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়াই কর্তব্য। নারী-পুরুষের ভেদ তাঁরা মানেন না। নিজেদের পরিচয় দেন দেশরক্ষক হিসেবে। ভারতীয় বাহিনীর এই সাহসী যোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প অনুপ্রাণিত করবে দেশের তরুণ সমাজকে।

 

পুনিতা অরোরা—ভারতীয় সেনার প্রথম মহিলা লেফটেন্যান্ট জেনারেল

২০০৫ সাল। ভারতীয় নৌসেনার প্রথম ভাইস-অ্যাডমিরাল হলেন এক মহিলা। সেনাবাহিনীতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিয়ে তখনও বিস্তর তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। সেই চিন্তার মূলে আঘাত হানলেন এক সাহসিনী। ঠিক মায়ের মতোই চেহারা, হাবভাবে মমতাময়ীর পরশ, কিন্তু অসম্ভব উজ্জ্বল দু’ চোখ। তাতে সাহস আর আত্মবিশ্বাসের ঢেউ খেলছে। তিনি যেমন স্নেহের হাত রাখতে পারেন মাথায়, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারেন বলপ্রদা। পুনিতা অরোরা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম মহিলা লেফটেন্যান্ট জেনারেল লিঙ্গবৈষম্যের ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন।

পঞ্জাবি পরিবারে জন্ম। ১৯৬৩ সালে পুণের আর্মড ফোর্স মেডিক্যাল কলেজে (এএফএমসি) যোগ দেন। কলেজ টপার পুনিতা এএফএমসি-র কম্যান্ডান্ট হিসেবে কেরিয়ার শুরু করেন। পরবর্তীকালে ভারতীয় নৌসেনার সার্জন ভাইস অ্যাডমিরাল হন। ভারতীয় সেনার মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিটের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে কাজ করেছেন পুনিতা। অবসরের আগে ডার্মাটোলজিস্ট হিসেবেও কাজ করেন। তাঁর স্বামীও ছিলেন ব্রিগেডিয়ার। জঙ্গি হিংসায় বিধ্বস্ত এলাকায় নারী-শিশুদের উদ্ধারকাজে বিশেষ ভূমিকা ছিল পুনিতার। জম্মু-কাশ্মীরের অশান্ত এলাকায় পোস্টেট ছিল বহুদিন। সেনা হাসপাতালের গাইনি-এন্ডোস্কোপি বিভাগ এবং ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন ইউনিটের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ৩৬ বছরের কর্মজীবনে ১৫টি সেনা মেডেলে সম্মানিত করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল পুনিতা অরোরাকে। বিশিষ্ট সেনা মেডেল ও পরম বিশিষ্ট সেনা মেডেলও পেয়েছেন তিনি।

 

হরিতা কৌর দেওল—ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম মহিলা পাইলট

১৯৯৪ সাল। হকার সিডলে এইচএস ৭৪৮ টার্বোপ্রপের ককপিটে বসলেন ২২ বছরের এক তরুণী। কোনও কো-পাইলট নেই। ককপিটে যেন উত্তেজনায় টগবগ করছেন ফুলের মতো একটা মেয়ে। বায়ুসেনার হকার সিডলে এয়ারক্রাফ্ট ওড়াবে এক মহিলা? আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন বায়ুসেনার উচ্চপদস্থ কর্তারাও। ১০ হাজার ফুট উপর দিয়ে বিমান উড়িয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন হরিতা কৌর দেওল।

চণ্ডীগড়ের শিখ পরিবারে জন্ম। শর্ট সার্ভিস কমিশনের সাত মহিলা ক্যাডেটকে পিছনে ফেলে বাজিমাত করে দিয়েছিলেন হরিতা। ডান্ডিগালের এয়ার ফোর্স অ্যাকাডেমি থেকে ট্রেনিংয়ের পরে এয়ার লিফ্ট ফোর্সেস ট্রেনিং এসট্যাবলিশমেন্ট থেকে বায়ুসেনার বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন হরিতা। তিনি ছিলেন বায়ুসেনার প্রথম মহিলা পাইলট যিনি বিমান ওড়ানোয় বহু রেকর্ড ভেঙেছিলেন। বিমান চালনায় বায়ুসেনার পাইলটদের প্রশিক্ষণও দিতেন তিনি। ১৯৯৬ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোরের কাছে বিমান দুর্ঘটনায় ২৪ জন বায়ুসেনা আধিকারিকের মৃত্যু হয়। তাঁর মধ্যে একজন ছিলেন হরিতা কৌর দেওল।


ক্যাপ্টেন দিব্যা অজিত কুমার—প্রথম মহিলা ক্যাডেট যিনি ‘সোর্ড অব অনার’ সম্মান পেয়েছিলেন

২০১০ সালের আগে পর্যন্ত ‘সোর্ড অব অনার’ (Sword Of Honour)সম্মানে ছিল পুরুষদের একচেটিয়া অধিকার। এই গতানুগতিক ধারাকে ভেঙে দেন ক্যাপ্টেন দিব্যা অজিত কুমার। সাহস, দক্ষতা, পরিশ্রম এবং মেধার জোরে ভারতীয় বাহিনীর এই সম্মান খুব কম বয়সেই ঝুলিতে পুড়ে ফেলেন ক্যাপ্টেন দিব্যা।

চেন্নাইয়ের তামিল পরিবারে জন্ম। স্টেলা মেরিস কলেজে পড়াশোনার সময়েই এনসিসিতে যোগ দেন। জলপাই রঙা ইউনিফর্ম পরে দেশসেবার অঙ্গীকার নেন তখনই। ২০০৮ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসে এনসিসি সিনিয়ার ডিভিশনে মহিলা ক্যাডেটদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিব্যা। তিনি ছিলেন ‘বেস্ট প্যারেড কম্যান্ডার।’ কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করে অফিসারস ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। তাঁর ব্যাচের ২৪৪ জন ক্যাডেটকে হারিয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সেই ‘সোর্ড অব অনার’ পুরস্কার জিতে নেন। ভারতীয় বাহিনীর এয়ার ডিফেন্স কোরে যোগ দিয়েছিলেন ২০১০ সালে। যুদ্ধবিমান ওড়ানোতে তিনি দক্ষ। বর্তমানে চেন্নাইয়ের অফিসারস ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে সেনা প্রশিক্ষণ দেন দিব্যা। মহিলাদের ভারতীয় বাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন তিনি।


মিতালি মধুমিতা— প্রথম মহিলা সেনা অফিসার বীরত্বের জন্য পেয়েছিলেন গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড

বুলেটের মুখে তিনি অকুতোভয়। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে শত্রুর গুলির মুখেও নিরস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন। ভারতীয় সেনার এই তেজস্বিনীর নাম মিতালি মধুমিতা।

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সাল। কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলা হয়। কাবুলের সেনা কোয়ার্টারে সেই সময় বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন মিতালি মধুমিতা। শোনা যায়, সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় তিনি ছুটে গিয়েছিলেন দূতাবাসে। বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। নিরাপদে বার করে এনেছিলেন অনেককে। এই সাহস ও দক্ষতার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মানীয় সেনা মেডেল দেওয়া হয়েছিল মিতালি মধুমিতাকে।

জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অশান্ত এলাকায় দীর্ঘসময় পোস্টেট ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিতালি মধুমিতা। একাধিক জঙ্গি দমন অভিযানে বিশেষ ভূমিকা আছে তাঁর। বর্তমানে নাগরোটার সৈনিক স্কুলের তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল। জম্মু-কাশ্মীরের তরুণদের মধ্যে দেশসেবার আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করেন তিনি।

 

গুঞ্জন সাক্সেনা এবং শ্রীবিদ্যা রাজন—কার্গিল যুদ্ধের দুই সাহসী বায়ুসেনা পাইলট

১৯৯৯ সাল। কার্গিল যুদ্ধের দামামা বেজেছে। দুর্গম পাহাড়ি খাঁজে শত্রুদের এলোপাথাড়ি গুলির মোকাবিলা করছেন ভারতীয় জওয়ানরা। বায়ুসেনার এয়ারক্রাফ্ট লক্ষ্য করছে মিসাইল ছুঁড়ছে পাকিস্তানি ফাইটার জেট। রণক্ষেত্রে নামলেন দুই সাহসী বায়ুসেনা পাইলট। চিতা হেলিকপ্টার উড়িয়ে নজরদারি শুরু করলেন পাহাড়ি এলাকায়। গোপন আস্তানায় লুকিয়ে থাকা শত্রুদের অবস্থান জানালেন ভারতীয় বাহিনীকে। বুলেট ক্ষত নিয়ে পড়ে থাকা জওয়ানদের উদ্ধার করে নিয়ে এলেন সেনা ছাউনিতে।

গুঞ্জন সাক্সেনা এবং শ্রীবিদ্যা রাজন প্রথম মহিলা বায়ুসেনা পাইলট যাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন। কার্গিল যুদ্ধের এই দুই সাহসী যোদ্ধাকে নিয়ে বলিউড ছবিও মুক্তি পাবে আগামী মার্চে ‘গুঞ্জন সাক্সেনা, দ্য কার্গিল গার্ল।’

বায়ুসেনার ফাইটার স্কোয়াড্রনে মহিলাদের প্রবেশ ২০১৬ সাল থেকে। কিন্তু এই দুই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বহু আগেই ইতিহাস গড়েছিলেন। গুঞ্জন সাক্সেনা জানিয়েছিলেন, আহত সেনাদের উদ্ধারের জন্য পাঠানো হয়েছিল তাঁদের। কিন্তু তাঁরা শুধু সেই দায়িত্ব পালন করেই থেমে থাকেননি। পাকিস্তানি সেনার ফাইটার জেটের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শত্রু ঘাঁটির গোপন খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন সেনার অন্দরে। গুঞ্জনের এয়ারক্রাফ্ট লক্ষ্য করে মিসাইল হামলাও করে পাকিস্তানি জেট। তবে কৌশলে সব আক্রমণই প্রতিহত করেছিলেন গুঞ্জন। সাত বছর চপার পাইলটের দায়িত্বে সাহসী ভূমিকার জন্য গুঞ্জনকে শৌর্য বীর অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিল।

 

দীপিকা মিশ্র—প্রথম মহিলা বায়ুসেনা পাইলট নেতৃত্ব দেন সারাঙ্গ টিমকে

 

এয়ার ফোর্স অ্যাকাডেমি থেকে বেরিয়ে দীপিকা মিশ্রর নজর ছিল বায়ুসেনার সূর্য কিরণ ও সারাঙ্গ টিমের উপর। ফিক্সড-উইং ও রোটারি-উইং-এর এই দুই শাখায় পা রাখার কথা ভাবতেও পারেননি মহিলারা। চেনা ছক ভেঙে অ্যারোবেটিক টিমেই যোগ দেন বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন লিডার দীপিকা মিশ্র। সেই শুরু, বাকিটা ইতিহাস।

সারাঙ্গ টিমের হ্যাল ধ্রুব হেলিকপ্টারে (অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার) ক্ষিপ্র গতি দীপিকার। চিতা ও চেতক চপারেও দক্ষ তিনি। বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন টিমে এক নতুন ধারা আনেন দীপিকা। একজন মহিলা হিসেবে স্কোয়াড্রনে নেতৃত্ব দেওয়া তো বটেই, বায়ুসেনা পাইলটের প্রশিক্ষণের দায়িত্বও তুলে নেন নিজের কাঁধে। ২০১০ সালের পর থেকে ডবল ইঞ্জিন হেভি হেলিকপ্টারের ককপিটেও ছাড়পত্র পান মহিলারা। ককপিটে প্রথম পা রাখেন দীপিকা মিশ্র। ২০১৩ সালের পর সূর্য কিরণ ও সারাঙ্গ স্কোয়াড্রন টিমে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আবেদন করেন। তখন সদ্যই মা হয়েছেন দীপিকা। কিন্তু তাঁর শারীরিক দক্ষতা দেখে সেই ছাড়পত্র দেওয়া হয় তাঁকে।

 

শান্তি টিগ্গা—ভারতীয় সেনার প্রথম মহিলা জওয়ান

 

প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম। সমাজের নিয়মের তোয়াক্কা করেননি শান্তি টিগ্গা। গ্রাম্য সংস্কারের বেড়া ভেঙে দুই সন্তানের মা শান্তি যোগ দিয়েছিলেন ভারতীয় সেনায়। তখন তাঁর বয়স ৩৫ বছর। শান্তি টিগ্গাই প্রথম ভারতীয় মহিলা সেনা জওয়ান।

শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় পুরুষদের পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন শান্তি। শোনা যায় মাত্র ১২ সেকেন্ডেই ৫০ মিটার দৌড়ে রেকর্ড করেন। ২০১১ সালে ৯৬৯ রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্টে যোগ দেন। বন্দুক চালানোয় টিমে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। নির্ভুল নিশানায় গর্জে উঠত তাঁর অস্ত্র। লক্ষ্যচ্যুত হননি কখনও। শান্তি জানতেনই না তিনিই ভারতীয় সেনার প্রথম মহিলা জওয়ান। দেশসেবাকেই ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন।

শান্তির মৃত্যু ছিল মর্মান্তিক। সেই রহস্য আজও ভেদ হয়নি। ২০১৩ সালে সন্ত্রাসবাদীরা তুলে নিয়ে যায় শান্তিকে। একটি রেললাইনের ধারে চোখ বাঁধা, সারা শরীর দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে। দীর্ঘদিন ওইভাবে তাঁকে ফেলে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে আসার পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। চারদিন পরে হাসপাতালের কেবিনে শান্তির ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ জানায়, আত্মঘাতী হয়েছিলেন শান্তি। কিন্তু তাঁর পরিবার দাবি করে আত্মহত্যা নয়, এই মৃত্যুর কারণ অন্য। সেই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More