পাকিস্তানে অবহেলায় ছিল, মুক্তি পেল বিশ্বের সবথেকে নিঃসঙ্গ হাতি কাভান

কম্বোডিয়ার পরিবেশ মন্ত্রী নেথ ফেকত্রা বলেছেন, কাভানকে দু’হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানানো হবে। কম্বোডিয়ায় তার চিকিৎসা হবে। তিনজন সঙ্গিনীও বেছে রাখা হয়েছে কাভানের জন্য।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৮৫ সালে শ্রীলঙ্কা থেকে ইসলামাবাদে এসেছিল কাভান। তখন তার বয়স কম। ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানায় ঠাঁই হয়। আকারে বিশাল কাভান ছিল চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণ। কিন্তু মাঝের ৩৫টা বছর ঝড় বয়ে গেছে কাভানের উপর দিয়ে। শরীর ভেঙেছে। সঙ্গিনী হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়েছে। মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। কাভানকে ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানা থেকে উদ্ধার করার জন্য বিশ্বজুড়েই নানা ক্যাম্পেন হয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকার পপ গায়িকা চেরিলিন সারকিসিয়ানের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতদিনের চেষ্টায় অবশেষে মুক্তি পাচ্ছে কাভান। বন্দি জীবন থেকে উদ্ধার করে তাকে কম্বোডিয়ার অভয়ারণ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে আজই।

কম্বোডিয়ার পরিবেশ মন্ত্রী নেথ ফেকত্রা বলেছেন, কাভানকে দু’হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানানো হবে। কম্বোডিয়ায় তার চিকিৎসা হবে। তিনজন সঙ্গিনীও বেছে রাখা হয়েছে কাভানের জন্য। নেথ বলেছেন, এতদিন ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানায় বন্দি ছিল কাভান। তার ঠিকমতো দেখভাল করা হয়নি। চিড়িয়াখানার পরিবেশও উপযুক্ত ছিল না। শারীরিকভাবে অসুস্থ কাভান।

Image

বিশ্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ হাতি মুক্তির পথে

জন্ম শ্রীলঙ্কায়। পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্কের খাতিরে কাভানকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয় ইসলামাবাদে। সে সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়া-উল হক। ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানায় রাখা হয় কাভানকে। ১৯৯০ সালে কাভানের জন্য একটি সঙ্গিনী বেছে নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশ থেকে। তার নাম ছিল সহেলি। ২০১২ সাল অবধি সহেলির সঙ্গে সুখেই সংসার করে কাভান। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সহেলির মৃত্যুর পর থেকে। ২০১২ সালে কোনও জটিল রোগে ভুগে মারা যায় সহেলি। তারপর থেকেই একা হয়ে পড়ে কাভান। তার আচরণেও বদল আসে। মাঝে মাঝেই নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। তাকে সামলে রাখা যেত না। অসুস্থ হয়ে পড়ত প্রায়ই। কাভানকে সামলানোর জন্য পায়ে শিকল পরিয়ে কার্যত বন্দি করে ফেলা হয় তাকে। এই বন্দিদশাই মানসিকভাবে অসুস্থ করে তোলে পাকিস্তানের একমাত্র এশিয়ান এলিফ্যান্টকে।

কাভানের মুক্তির জন্য জোরদার আন্দোলন চালান মার্কিন পপ গায়িকা

২০১৫ সাল। কাভানের নাম তখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বেই। পাকিস্তানে বন্দি এই হাতিকে নিয়ে চর্চা সোশ্যাল মিডিয়াতেও। কাভানকে বিশ্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ হাতি বলতেন প্রাণীবিদরা। তাকে ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানা থেকে উদ্ধারের জন্য চেষ্টা শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রাণীবিদদের সই করা পিটিশন পাঠানো হয় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কাছে। তাতেও চিড়ে ভেজেনি। এরপরে সব বিধিনিষেধের বেড়া ভেঙে ২০১৬ সালে মার্কিন পপ গায়িকা চেরিলিন সারকিসিয়ান পৌঁছে যান ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানায়। কাভান তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। চিড়িয়াখানার অবস্থাও খারাপ। রক্ষণাবেক্ষণের কোনও ব্যবস্থাই নেই। চেরিলিন একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চরম অবহেলায় ছিল কাভান। মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল। তাকে উদ্ধার করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন চেরিলিন। চারবছর টানা ক্যাম্পেন করেছেন তিনি। তাঁর এই ক্যাম্পেনের নাম ছিল #SaveKavaan। ২ লক্ষেরও বেশি পরিবেশপ্রেমী, প্রাণী বিশেষজ্ঞদের সই করা পিটিশন ফের দাখিল করেছিলেন চেরিলিন।

Image

শেষ পর্যন্ত তাঁর চেষ্টা গতি পায়। এই বছর মে মাসেই মামলা ওঠে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে। কোভিড অতিমহামারীর জন্য ইসলামাবাদ চিড়িয়াখানা বন্ধ করে কাভানকে মুক্তি দিতে রাজি হয় পাক সরকার।

সেপ্টেম্বরে প্রাণী চিকিৎসক এবং ফোর প’জ ইন্টারন্যাশনালের সদস্য ডক্টর আমির খালিল ও লেইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর জু অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চের প্রাণী বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফ্র্যাঙ্ক গোয়েরিজ় কাভানের দায়িত্ব নিতে রাজি হন। কম্বোডিয়ার অভয়ারণ্যে তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। গতকালই মুক্তি পেয়েছে কাভান। এবার এক নতুন জীবনের পথে পা বাড়িয়েছে সে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More