‘প্রত্যেক দিন হার্ট অ্যাটাক হওয়ার চেয়ে একবার হওয়া ভালো’

1

অমল সরকার

তিনিও সুভাষ। তবে সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তাঁর নামের আগে ‘নেতাজি’ বা ওই জাতীয় কোনও সম্মান-শিরোপা না থাকলেও ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় (Dr. Subhash Mukharjee) হলেন এক পথ প্রদর্শকের নাম। নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটনে তিন-তিনটি কমিশন হয়েছে। ত্রুটি শুধরে রাষ্ট্র এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবির দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে তাঁর অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে মেনে নিয়েছে। এ বছর তাঁর জন্মের ১২৫তম বর্ষ উদযাপনে রাষ্ট্রীয় ও রাজ্যস্তরের আয়োজনের নেতৃত্বে আছেন যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী।

ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়

কিন্তু ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়? ওই নামে বাঙালি এক কবিকেই চেনে বেশি। স্বনামধন্য সেই কবির শেষ জীবনের দুর্দশার কথাও কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু চিকিৎসক সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে আজ ক’জন মনে রেখেছেন? কেউ বলতেই পারেন কোথায় স্বাধীনতার এক বীর যোদ্ধা, যিনি, রক্তঋণ শোধ করার অঙ্গীকার করে দেশকে ব্রিটিশের কবল মুক্ত করতে নিজের সেনা বাহিনী গড়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, আর কোথায় একজন চিকিৎসক। কিন্তু আমরা যদি নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদানকে মাথায় রাখি তাহলে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, খেলোয়াড়, কারও অবদানকেই ছোট করে দেখা চলে না। বিশেষ করে যদি সেই উদ্যম, উদ্যোগ, অবদানের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে দেশের জন্য কিছু করা।

দিন কয়েক হল এসব ভাবত ভাবতে বছর পঁচিশ আগের একটি অ্যাসাইনমেন্টের কথা বারে বারে মনে পড়ছে। রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসের কারণে সেই অ্যাসাইনমেন্টের সূত্র ধরেই মনে আসছিল সেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথাও। সাংবাদিকতার গোড়ায় চিকিৎসক পরিচয়ের পাশাপাশি ছাত্র-দরদি শিক্ষক হিসাবেও তাঁর কথা শুনতাম।

সেই অ্যাসাইনমেন্টে ভোর ভোর উঠে সকাল ৬’টার মধ্যে লর্ড সিনহা রোডের একটি বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হত। সঙ্গী চিত্র সাংবাদিক শিখর কর্মকার। পর পর তিন দিন। সকাল ৬’টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে ওৎ পেতে থাকাই ছিল অ্যাসাইনমেন্ট। দাঁড়িয়ে থাকা মানে দাঁড়িয়ে থাকাই। লর্ড সিনহা রোডের একপ্রান্তে রাজ্য গোয়েন্দা পুলিশের সদর দফতর। আর এক প্রান্তে বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গের আইজি’র অফিস। রাস্তার বাকি অংশ তখন সুনসান। কোথাও দু-দণ্ড বসার জায়গা নেই। আবার জায়গা ছেড়ে যাওয়াও চলে না। কখন কানুপ্রিয়া বা ওঁর বাবা-মা বাড়ির বাইরে বের হন কে বলতে পারে!

তপন সিনহার ‘এক ডক্টর কি মওত’ সিনেমার দৃশ্য

কী দুর্ভাগ্য, ওই তিনদিনই মেয়েটি স্কুলে গেল না। ওঁর বাবা-মা’ও এই দিনগুলিই বাড়ির বাইরে বেরলেন না। রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথের দোকানি যদিও বলেছিলেন, এটা-ওটা কিনতে আগরওয়াল দম্পতি তাঁর দোকানে আসেন এবং তাঁদের একমাত্র মেয়ের নাম দুর্গা।

এতদিন পর, গত শনিবার সন্ধ্যায় এক ঘরোনা সমাবেশে দেখা হল কানুপ্রিয়ার বাবা প্রভাত আগরওয়ালের সঙ্গে। আগামী মাসে এখন মুম্বইবাসী কানুপ্রিয়াও আসবেন তাঁর নিজের শহরে।

কে এই কানুপ্রিয়া? কে প্রভাত আগরওয়াল? আড়াই দশক আগের সেই অ্যাসাইনমেন্টটি দেওয়ার সময় অফিসের সিনিয়র সাংবাদিক দাদা কানে কানে বলেছিলেন, সফল হলে তা হবে ইন্টারন্যাশনাল এক্সক্লুসিভ। কানুপ্রিয়া হল ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবি। কিন্তু মিডিয়ার কেউ তাঁর বাড়ি চেনে না, ছবি পায়নি। অনেক কষ্টে কানুপ্রিয়ার বাড়ির ঠিকানা মিলেছিল। ছবি তোলা, দু-দণ্ড কথা বলার সেরা সুযোগ সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়টি। তার আগে পৌঁছে যেতে হবে।

আগেই বলেছি, কানুপ্রিয়াকে তখন প্রতিবেশীরা চিনত দুর্গা নামে। আসল নামটি ছিল শুধু বার্থ সার্টিফিকেটে। তাদের মেয়ে টেস্টটিউব বেবি জেনে পাছে লোকে কিছু বলে এই ভেবে আগরওয়াল পরিবার খবরটি পাঁচকান করতে চায়নি। শনিবার প্রভাত আগরওয়াল বলছিলেন, ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাদের কথা দিয়েছিলেন, তিনি কাউকে একথা জানাবেন না। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে সে কথা পালন করে গিয়েছেন। আমাদের বাড়িতে আসতেন একা। অর্থাৎ শ্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে পাঁচজনের সামনে তুলে ধরার আনন্দটুকু পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন।

শুধু কি তাই, শিক্ষক সুভাষ মুখোপাধ্যায় সংসারের মায়ায় না জড়িয়ে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মেতে থাকতে নিজে সন্তান নেননি। স্বামীর ইচ্ছায় সায় দিয়েছিলেন স্ত্রী নমিতা। আবার তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল, সন্তানহীন দম্পতির মুখে হাসি ফোটানো। যে প্রযুক্তির নাম ইন-ভিট্রো-ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ। অর্থাৎ শরীরের বাইরে নলের মধ্যে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন ঘটিয়ে প্রাণ সৃষ্টি।

কানুপ্রিয়ার পিতা প্রভাত আগারওয়াল, ডাঃ গৌতম খাস্তগীর ও ডাঃ অপর্ণা খাস্তগীর

কানুপ্রিয়া অর্থাৎ দুর্গা সেই প্রযুক্তিরই সৃষ্টি। যে বিরল, অভাবনীয়, অসামান্য সাফল্যকে গোটা পৃথিবীকে তখন চিৎকার করে বলার কথা ছিল সরকার এবং চিকিৎসকমহলের। কারণ, কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে কানুপ্রিয়ার জন্মের মাস আড়াই আগে লন্ডনে ভূমিষ্ট হয়েছিল বিশ্বের প্রথম টেস্টটিউব বেবির। অর্থাৎ কানুপ্রিয়া হলেন পৃথিবীর দ্বিতীয় এবং ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবি। যদিও চিকিৎসা-বিজ্ঞানের বাকি সব কিছুতে লন্ডনের কাছে কলকাতা তখন শিশু। কিন্তু ভাবনাচিন্তায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় এগিয়ে ছিলেন সময়ের বেশ কয়েকটি মাইল ফলক। এমনও হয়ে থাকতে পারে, সেই কারণেই সরকারি চিকিৎসা জগতের কর্তাদের কাছে তাঁর কাজ বোধগম্য হয়নি। তখনই লন্ডন আর কলকাতার প্রযুক্তি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গর্বের সঙ্গে বলতে হয়, কানুপ্রিয়ার বিজ্ঞান-পিতা ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় সৃষ্ট প্রযুক্তিই কালতীর্ণ বলে গৃহীত হয়েছে গোটা পৃথিবীতে।

এমন কৃতিত্ব নিয়ে রাজ্য, দেশ, সরকার, নাগরিক সমাজ গর্ব করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে হয়েছিল উল্টোটা। তাঁর বিরল কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে খাটো করতে পদে পদে সন্দেহ, সংশয় তৈরির পাশাপাশি সরকারের পর্যালোচনা কমিটি এই চিকিৎসা বিজ্ঞানীর দাবি পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছিল। তারই পরিনতিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। তা নিয়ে রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস অভিমন্যু এবং তপন সিনহার সিনেমা এক ডক্টর কি মওত।

আরও পড়ুনঃ পুজোর আয়োজক থেকে পুরোহিতের আসনে, শহরের মণ্ডপে দেবীর বন্দনায় কারা সেই চার দুর্গা?

কিন্তু তারপর? রেডিওর আবিষ্কারক হিসাবে গোটা দুনিয়া যাঁর নাম জানে সেই গুগলিয়েলমো মার্কনির নাতি বছর কয়েক আগে এ দেশে এসে জগদীশচন্দ্র বসুর অবদানের কথাও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে গিয়েছেন। আর এক বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রতিও সুবিচার হয়নি, অজানা নয় সে কথাও। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রও যে উচ্চতার বিজ্ঞান সাধক ছিলেন জাতি তাঁরে সেই মর্যাদা দিয়েছে?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলি কিন্তু ডা: মুখোপাধ্যায়ের প্রযুক্তিকে শুধু গ্রহণই করেনি, তাঁকেই ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবির বিজ্ঞান-পিতা বলে মেনে নিয়েছে। এমনকি সরকারিভাবে ভারতে নলজাতক শিশুর শ্রষ্ঠার শিরোপা (১৯৮৬) যাঁর মাথায় উঠেছে সেই ডা: তিরুচিলাপল্লি চেলভারাজ আনন্দকুমারও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা সংক্রান্ত নথিপত্র দেখে মেনে নেন, তিনি নন, কানুপিয়ার বিজ্ঞান-পিতারই এই কৃতিত্ব প্রাপ্য।

কিন্তু আজও, রাজ্য কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে, নানা মহলের শত চেষ্টা সত্ত্বেও চিকিৎসা জগতের এই সাধক বাঙালি বিজ্ঞানীর কাজকে প্রাপ্য স্বীকৃতি দেওয়ার কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিশিষ্ট স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা: গৌতম খাস্তগীরের মতো হাতে গোনা কিছু মানুষ গত দু-আড়াই দশক যাবৎ লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে প্রয়াত চিকিৎসককে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। কিন্তু কাজটা শুধু কিছু ব্যক্তি বিশেষের হতে পারে না। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাজ, কৃতিত্ব নিয়ে যাবতীয় সংশয়, সন্দেহের অবসান হয়েছে। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর আগে তাৎকালীন রাজ্য সরকার যে সাফল্যকে খাটো করে রাজ্যের স্বার্থকেই জলাঞ্জলি দিয়েছিল, বর্তমান সরকারের উচিত সেই ভুল শুধরে নেওয়া।

তাঁর জন্য সবচেয়ে আগে প্রয়োজন রাজ্যের চিকিৎসা-বিজ্ঞানের প্রধান প্রতিষ্ঠান থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাজকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান। এরপর তাঁর নামে হাসপাতাল, রাস্তা ইত্যাদি হোক। এছাড়া রাজ্যের তরফে মরণোত্তর সম্মান তো আছেই।

একইভাবে এগিয়ে আসুক কেন্দ্রীয় সরকারও। একত্রে যদি নাই-ই সম্ভব হয়, রাজ্যের ৪২ জন সাংসদ দলীয় এবং ব্যক্তিগতভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠি লিখতে পারেন। আর, ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার দাবি জানিয়ে রাজ্য বিধানসভাও কি পারে না একটি সর্বদলীয় প্রস্তাব গ্রহণ করতে? বিধানসভার প্রধান দুই দল তৃণমূল ও বিজেপি, এই তো মাস চারেক আগে ভোটের প্রচারে বাংলা ও বাঙালির স্বার্থ রক্ষার কথা বলেই সবচেয়ে বেশি গলা ফাটালো।

শেষ করব, ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সুইসাইড নোটের একটি লাইন দিয়ে। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রত্যেক দিন হার্ট অ্যাটাক হওয়ার চেয়ে একবার হওয়া ভালো’। তাঁর কথা থেকেই বলি, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি ভুল, অন্যায় অবিচার করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু সেই ভুল না শোধরানো অনেক বেশি ভুলের সমান।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.