আলিপুরদুয়ারের তাঁতশিল্প থমকে কোভিডে, খটাখট শব্দের সঙ্গে উধাও তাঁতপাড়ার সুখও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: খটাখট শব্দে আর মুখর হয়ে থাকত দেওডাঙা। আলিপুরদুয়ারের জটেশ্বরের দেওডাঙা তাঁতপাড়ার সেই অবিরাম খটাখট শব্দে হঠাৎই ছন্দপতন। নতুন শাড়ির বরাত কই? আগের বোনা শাড়িই পড়ে আছে ঘরে।

একসময় সারি সারি হলদে সবুজ লাল রেশমের ফাঁকে খটাখট শব্দ উঠত। জাল বুনে চলতেন শিল্পীরা। নিরন্তর জাল বোনার শেষে একদিন ভাঁজ খুলে গড়িয়ে পড়ত রঙিন ১২ হাত তাঁতের শাড়ি! হাতে বোনা সেসব কাপড়ের দাম টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করা যায় না। সুতোর ভাঁজে ভাঁজে থেকে যেত শিল্পীর পরশ।

এখন অতিমারীর আবহে তাঁতের শাড়ির কদর কমেছে। অথচ একসময়, তাঁত বুনে বুনে দম ফেলার ফুরসত পেতেন না শিল্পীরা। আর এখন তাঁত চলার শব্দই নেই। ফালাকাটা ব্লকের দেওডাঙা ঘিরে কেবলই স্তব্ধতা।

তাঁতির আত্মমর্যাদাবোধের চরমতম নিদর্শন ঠাঁই পেয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পে। পাড়ায় প্রচলিত ছিল সেই প্রবাদ, মদন যেদিন গামছা বুনবে! তবে কেবলই গল্প কথা নয়, তাঁতি পাড়ার ওপর বারবার নেমে এসেছে দুর্দিন। মদন তাঁতি ভাল সুতোর অভাবে শাড়ি বোনা বন্ধ করেছিলেন। সে ছিল অভিনব প্রতিবাদ। মহাজনদের সুতো নিয়ে গামছা বোনেননি তিনি। বদলে হাত পা সচল রাখতে রাত দুপুরে খালি তাঁতেই আওয়াজ তুলতেন।

দেখুন ভিডিও।

দেওডাঙার তাঁত পাড়াতেও এখন সেরকমই পরিস্থিতি। বরাত নেই। এমনিই তাঁত চালাচ্ছেন শিল্পীরা। ব্যস্ততা নেই। লক্ষ্য নেই। অলস হাতে বুনে চলেছেন শাড়ি। খটাখট আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেছে তাঁতপাড়ার সেই সুখও।

দেওডাঙার তাঁতিপাড়ায় প্রায় ১৫ ঘর তাঁত শিল্পীর বাস। অন্য কোনও জীবিকা নেই তাঁদের। সারাবছর তাঁত বুনেই সংসার চলে। এখানকার তাঁতের সুনামও দিকে-দিকে ছড়িয়ে। তবু কিন্তু করোনার থাবায় বন্ধ রয়েছে তাঁতযন্ত্র। অভাব অনটনের চরমে পৌঁছে পরিবার নিয়ে ফাঁপরে শিল্পীরা।

অতিমারীর দুটো বছর এই করেই গেল। সামনেই পূজো। তবু, নতুন তাঁতবস্ত্রের বরাত আসেনি এখনও। অন্যান্য বছর এসময়ে গ্রাম-শহরের হাটে হাটে পৌঁছে যেত রকমারি রেশম বস্ত্র। কিন্তু এবছর কোনও বায়না আসেনি। মাথায় হাত দেওডাঙার ১৫টি তাঁতি পরিবারের।

শিল্পীদের আক্ষেপ, তাঁদের দুর্দশার দিকে নজর দিচ্ছেন না কেউ। ইতিমধ্যেই সরকারি সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। জটেশ্বর দুই নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সমরেশ পাল জানান, প্রশাসন মানুষের পাশে আছে। তাঁতিরা সাহায্যের আবেদন করলে সাধ্যমত তাঁদের পাশে দাঁড়াবে পঞ্চায়েত।

তবে, বরাত না এলে কতদিনই বা এভাবে চলবে? অনিশ্চয়তার তিমিরে ডুবে খটাখট শব্দ তুলেই সারা হবেন তাঁতিরা। পরিস্থিতির পাকাপাকি সমাধান কবে হবে সেদিকেই তাকিয়ে দেওডাঙা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More