আমাদের দিকে তাকিয়েই হস্তমৈথুন করছিল!

0
প্রিয়াঙ্কা দাস

সপ্তাহ দু’-তিন আগে হবে। বেলা বারোটা নাগাদ হেদুয়া থেকে টিউশন সেরে বাড়ি ফিরছি। ৩০বি/১ বাসে চড়েছি রোজকার মতোই। দুপুরের এই সময়টা বাসে বিশেষ ভিড় থাকে না। আমি আর আমার বান্ধবী উঠেই বাঁ দিকের টু-সিটে বসেছি। গল্প করছি, যেমন রোজ করি।

হঠাৎ অস্বস্তিতে ঘাড় ঘোরালাম পিছন দিকে। একটা ফাঁকা সিটে বসে আছেন এক মাঝবয়সি ভদ্র(!)লোক। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন, বিভিন্ন মুখভঙ্গি করছেন। তখনও বুঝিনি বিষয়টা ভাল করে। একটু খেয়াল করতেই গা গুলিয়ে উঠল। নিজের যৌনাঙ্গ প্যান্ট থেকে বার করে হাত দিয়ে ধরে আছেন তিনি। শুধু তাই নয়, হস্তমৈথুনও করছেন! আমাদের দিকে তাকিয়ে, বাসের মধ্যে প্রকাশ্যে!

বিষয়টা বুঝে রাগে ক্ষোভে মাথা জ্বলে গেল। সঙ্গে একটু ভয়ও। বাসে, দিনের আলোয়, সবার সামনে, দু’টো মেয়ের দিকে তাকিয়ে এমনটা করা যায়! সিঁটিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। চিৎকার করতে চেয়েও গলা তুলতে পারিনি। নিজেরাই লজ্জায় আর গা ঘিনঘিনে একটা অনুভূতিতে গুটিয়ে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গের ওই বান্ধবী তো আরও ভয় পেয়ে গিয়েছিল! না, সে দিন আমরা প্রতিবাদ করতে পারিনি কোনও রকম। কাউকে জানাতেও পারিনি। তখন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, এমনটা আবার ঘটবে!

সে দিনের ঘটনা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল প্রায়। বলা ভাল, বার করে দিয়েছিলাম জোর করে। আমাদের সঙ্গে রোজ রাস্তাঘাটে ঘটা নানা রকম ঘটনাই যেমন বার করে দিই। সবটা মনে রাখতে গেলে তো আর ঘর থেকে বেরোতেই পারব না! কিন্তু আজ, শনিবার দুপুরে ফের একই ঘটনা ঘটল!

হেদুয়ায় ওই একই টিউশন সেরে ফিরছিলাম আমি আর আমার বান্ধবী। বাসের সামনে দিকটায় জনা পনেরো যাত্রী ছিলেন, পিছন দিকটা প্রায় ফাঁকাই। বাসে উঠেই চমকে উঠলাম, সে দিনের সেই লোকটা একই ভাবে বসে আছে! আগের দিনের সেই সিটেই! আমরা বাসে উঠে আমাদের মতোই বসি, বাঁ দিকের সিটে। এবং কিছু ক্ষণ পরেই আগের দিনের সেই একই অস্বস্তিকর অধ্যায়। আমাদের দিকে তাকিয়ে হস্তমৈথুন করছেন তিনি! দিনের আলোয়, ভরা বাসে, প্রকাশ্যে!

সঙ্গে সঙ্গে আমি ঠিক করি, আজ প্রতিবাদ করতেই হবে। এই নোংরামি তো রোজ রোজ মেনে নেওয়া যায় না! কিন্তু প্রতিবাদ করতে গেলে হাতে প্রমাণ থাকা দরকার। নইলে কী করে কাউকে বিশ্বাস করাব, যে উনি এতটা অসভ্যতা করছিলেন! এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য! তাই নিঃশব্দে, কোনও প্রতিক্রিয়া ছাড়া, নিজের মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরা খুলে হাতে ধরে রাখলাম। আমার ডান দিকে, কয়েকটা সিট পিছনেই লোকটা বসে রয়েছেন। ফলে ক্যামেরায় সহজেই ধরা পড়ছেন তিনি। ভিডিও চালু করলাম। ধরা পড়ে গেল লোকটার কুকীর্তিও। মিনিট খানেকের ভিডিও রেকর্ড করে, সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। চেঁচিয়ে বললাম, লোকটা আমাদের দেখে ম্যাস্টারবেট করছে প্রকাশ্যে!

গোটা বাস জুড়ে একটাও শব্দ নেই। যাত্রীদের মনোভাব, তাঁরা যেন কিছু শুনতেই পাননি! আমি রাগে-বিস্ময়ে হতবুদ্ধি। চেঁচিয়ে ডাকলাম কনডাকটরকে। গোটা ঘটনাটা চিৎকার করে জানিয়ে বললাম, ধরুন ওঁকে! তত ক্ষণে লোকটা সিট ছেড়ে উঠে বাসের পাদানিতে নেমে দাঁড়িয়েছে। আমি চেঁচাচ্ছি, বলছি ‘ওঁকে ধরুন! চূড়ান্ত অসভ্যতা করেছেন উনি আমাদের সঙ্গে!’ বিশ্বাস করুন, একটি মানুষও নড়ে বসলেন না গোটা বাসে! কোনও রকম প্রতিক্রিয়া তো দূরের কথা! উল্টে কনডাকটর হেসে আমায় বললেন, “কার মনের ভিতরে কী আছে, কী করে বুঝব বলুন?”

কিছু দিন আগেই সামনে এসেছিল মেট্রো-কাণ্ড। প্রতিবাদের অনেক রকম চেহারা সে সময় প্রকাশ পেয়েছিল সমাজের বিভিন্ন স্তরে। আমি দ্বিতীয় দিন এমন চরম অসভ্যতা ফেস করার সময় নিশ্চিত ছিলাম, আমার মুখ খোলা উচিত। চেঁচানো উচিত। গলা তুললে তবেই সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ হবে। কিন্তু কোথায় কী! আজ আমি লোকটার এই চূড়ান্ত অসভ্যতায় যতটা না শকড্ হয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্মিত হয়েছি, আমার সহযাত্রীদের নিস্পৃহতায়।

প্রিয়াঙ্কার ফেসবুক পোস্ট

তবে বিস্ময়ের আরও বাকি ছিল। যে ঘটনায় একটি মানুষকেও একটি শব্দ উচ্চারণ করতে দেখলাম না বাস্তবে, সেই ঘটনাটাই বাড়ি এসে যখন ফেসবুকে জানালাম, ভিডিওটা আপলোড করলাম, তখন কয়েক মিনিটে দাউদাউ করে ছড়িয়ে পড়ল প্রতিবাদ। কয়েক হাজার রিঅ্যাকশন, কয়েক হাজার শেয়ার, কয়েক হাজার কমেন্ট। নিন্দার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউ। সকলেই বলছেন, লোকটাকে ধরে উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল ঘটনাস্থলেই।

অবাক লাগছে। আজকে বাসে উপস্থিত মানুষগুলোর মধ্যে এক জনের মানসিকতাও কি এই কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে মেলেনি? প্রতিবাদের এই ঝড় দেখে এই প্রশ্নটাই মনে আসছে এখন।

কলকাতা পুলিশের ফেসবুক পেজে ঘটনাটি জানিয়েছি। ভিডিও-ও পাঠিয়েছি। এখনও কোনও রিপ্লাই আসেনি। আমি আপাতত স্থানীয় থানায় যাচ্ছি, লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.