ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে জঙ্গলে, ছত্তীসগড়ের অরণ্যে বাঘ রক্ষায় পথ দেখাচ্ছেন তরুণ সূরজ

1

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফেব্রুয়ারির সকাল, সবে ভোরের আলো ফুটেছে তখন। জঙ্গলে অভিজ্ঞ-মাত্রেই জানেন এই ভোরবেলার দিকটায় জন্তু জানোয়ারদের গতিবিধি বাড়ে। ছত্তীসগড়ের রায়পুর টাইগার রিজার্ভের জঙ্গল লাগোয়া বন দফতরের একটা ছোট্ট ঘরে সেই শীতের ভোরেও বসে আছেন পাঁচজন মানুষ। স্ক্রিনের উপর ঝুঁকে পড়ে জঙ্গলের ভিতর লুকোনো ক্যামেরায় ধরা পড়া বাঘের চলাফেরা মনিটর করছেন তাঁরা।

দুঃসংবাদটা এল তখনই। গ্রামেরই একজন একটা খবরের কাগজ হাতে প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকলেন। কাগজের যে পাতাটা খোলা, সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটা খবর। পূর্ণবয়স্ক একটা মরা বাঘের চামড়া উদ্ধার করেছে বনদফতর। আন্দাজ করা হচ্ছে কয়েকমাস আগে চোরাশিকারি বা পোচারদের হাতে মারা পড়েছে বাঘটা। স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ ওই পাঁচজনের কাছে নিমেষেই স্পষ্ট হয়ে গেল বিষয়টা। গত কয়েক মাস ধরে ভূষণ নামে যে পুরুষ বাঘটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, এটা তারই চামড়া!

গত দু’বছর তাঁরা একটানা নজর রেখেছেন ভূষণের উপর। তারপর কীভাবে যেন হঠাৎ যেন উধাও হয়ে গেল সে! বছর দশেক বয়স ভূষণের। তার আচমকা বেপাত্তা হয়ে যাওয়ায় সবাই ধরেই নিয়েছিল জঙ্গলের এই করিডোর ছেড়ে অন্য কোনও করিডোরে চলে গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বাঘেরা যেমনটা করে থাকে হামেশাই৷ তা নিয়ে মাথাও ঘামায়নি কেউ। কিন্তু সে যে চোরাশিকারির হাতে পড়তে পারে, এই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাটা কেন যে তাঁদের মাথার আসেনি, কে জানে!

ভূষণ আর বেঁচে নেই। তাকে বুনো শুয়োরের টোপ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে গুলি করে খুন করেছে চোরাশিকারিরা। দাঁতে দাঁত চেপে রাখলেও এই সত্যিটা মেনে নিতে সেদিন কান্নায় ভিজে এসেছিল দলের প্রত্যেকের চোখ।

কী আশ্চর্য না! জঙ্গলের বুকে বন্যপ্রাণীদের নিজেদের এলাকাতেই তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে মানুষের লোভ আর হিংসা দিয়ে তৈরি মৃত্যুফাঁদ। ২০১৮ সালের এই ঘটনাটা সেদিন সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল বছর ত্রিশের এক তরুণকে। তাঁর নাম এম. সূরজ। অনস্বীকার্য এক সত্যির সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন তিনি, দীর্ঘস্থায়ী এক লড়াইয়ের শপথ।

শিক্ষিত শহুরে জীবনের গণ্ডি ছিঁড়ে কবে যেন জঙ্গলকেই ভালোবেসে ফেলেছিলেন সূরজ। ২০১১ সালে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আর পাঁচজনের মতো মোটা মাইনের শহুরে চাকরি, গাড়ি-বাড়ি, ১০টা-৫টার জীবন– সে পথেই এগোচ্ছিল সূরজের ভবিষ্যতও৷ একটা কলেজে লেকচারারের চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিলেন। গন্ডগোল বাঁধল তার পরেই।

কলেজে চাকরি করতে করতেই সাপ নিয়ে লোকের মনের ভয় আর কুসংস্কার কাটানোর কাজে কীভাবে যেন জড়িয়ে পড়েন সূরজ। তারপর ধীরে ধীরে পাখি, বানর, স্পটেড ডিয়ার বা চিতল হরিণ, হায়না– জঙ্গল আর জন্তুদের সঙ্গে এক গভীর সখ্যে জড়িয়ে পড়লেন এই কমবয়েসী মেধাবী ইঞ্জিনিয়র।

প্রথম প্রথম বন্যপ্রাণীদের নিয়ে কিছু বেসরকারি পরিবেশবাদী সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করেন সূরজ। তারপর ছত্তীসগড়ের বন দফতরের রেসকিউ টাস্কের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে শুরু করলেন কাজ। এই সময় ২০১৬ সাল নাগাদ তাঁর আলাপ হল ছত্তীসগড়ের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার অলোক তিওয়ারির সঙ্গে। সূরজের কার্যকলাপ দেখে মুগ্ধ হন বনদফতরের এই অফিসার। একদিন সূরজকে নিজের অফিসে ডেকে পাঠান তিনি। জিজ্ঞাসা করেন, “সাপ, পাখির মতো ছোট ছোট জজন্তুজানোয়ারদের নিয়েই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাও, না আরও বড় লক্ষ্য আছে?”

সূরজের জঙ্গলের প্রতি ভালবাসা আর নিষ্ঠা দেখে এরপর তিনিই তাঁকে ঠেলে দেন ‘বাঘ সংরক্ষণ’-এর মতো গুরুদায়িত্বে। ডিএফও-র চেষ্টায় বাঘের গতিবিধির উপর নজরদারি করার জন্য ছত্তিসগড় বনদফতরের তরফে একটি অফিসিয়াল টিম গঠন করা হয়েছিল, সেই টিমেরই অন্যতম কর্মী হিসাবে যোগ দিলেন সূরজ। তাঁর প্রথম ডিউটিই পড়েছিল কানহা ন্যাশনাল পার্ক সংলগ্ন ছত্তিসগড়ের ‘ভোরামদেও ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি’তে।

২০১৮ পর্যন্ত ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির হয়ে কাজ করছিলেন সূরজ। কিন্তু চোরাশিকারিদের হাতে ভূষণের মৃত্যুর ঘটনাটাই সব ওলট-পালট করে দিল। সূরজ বুঝতে পারছিলেন, শুধু নজরদারি দিয়ে চোরাশিকার বন্ধ করা যাবে না। দরকার আরও অ্যাকটিভ প্ল্যানের। প্রথমে বাঘ চলাচলের কোর-এরিয়া বা সংবেদনশীল অঞ্চলগুলো মার্ক করতে হবে। দেখতে হবে তার কোন ফাঁকফোঁকর দিয়ে জঙ্গলে অনুপ্রবেশ চালাচ্ছে পোচার! ফাঁদ তৈরির কৌশল আর দুর্বলতাগুলো একবার ধরে ফেলা গেলে এই মৃত্যুযজ্ঞ থামানো যে সম্ভব, তা বুঝেছিলেন সূরজ। কিন্তু সবার আগে দরকার বন্যজীবন সংরক্ষণ সম্পর্কে এলাকাবাসীর মধ্যে আরও সচেতনতা গড়ে তোলা।

সূরজের দেখানো পথেই পরবর্তী অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করলেন বন দফতর। এনজিও-র সদস্য আর গ্রামবাসীদের নিয়ে ২০১৯এ গঠিত হল নতুন ‘পাইলট প্রকল্প’। জঙ্গলের তিনটে রেঞ্জ লাগোয়া ১৪টা গ্রাম জুড়ে শুরু হল ‘বাঘ বাঁচাও’ আন্দোলন।
ব্যাপারটা শুনতে সোজা লাগলেও সহজ ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, চোরাগোপ্তা নকশাল আন্দোলন, তার উপর ক্রমবর্ধমান চোরাশিকারিদের দাপট– আইনের ফাঁক গলে পশুশিকারের মৃগয়াভূমি করে তুলেছিল ছত্তীসগড়কে।

গত ৫ বছর আগেও যে রাজ্যে বাঘের সংখ্যা ছিল ৫০-এর কাছাকাছি, বছর দুই আগের বাঘশুমারিতে সেই সংখ্যাটা কমতে কমতে ১৯-এ ঠেকেছে। অবস্থা আরও খারাপ যাতে না হয়, তাই প্রাথমিকভাবে শুরু হল গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলা। সহজ সরল গ্রামবাসীদের টাকার ফাঁদে ফেলে ব্যবহার করছে চোরাশিকারিরা, সেটা আন্দাজ করেই শুরু হল ‘ওয়াক দা টক’ প্রকল্প, দরজায় দরজায় ঘুরে জনসচেতনতা বাড়ানো। ১৪টি গ্রামেই আগ্রহী স্থানীয় যুবকদের নিয়ে তৈরি হল জনা দশেকের ইনফর্মার নেটওয়ার্ক।

জঙ্গলের আশেপাশের গ্রামগুলোর নিরক্ষর আদিবাসী মানুষগুলো বেঁচে থাকে জঙ্গলের উপর নির্ভর করেই। তাদের শিকার করতে বারণ করলে, বা জঙ্গলে ঢুকতে দেওয়া না হলে তারা আইন ভাঙবেই। উপায় একটাই, তাদের জীবনের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। ভালবেসে বোঝানো। ভালবাসার ভাষা কে না বোঝে!

শুধুমাত্র চোরাশিকার বন্ধ করতেই নয়, উপজাতি অধ্যুষিত এই এলাকায় জনসচেতনতা বাড়াতেও গত দু’বছর ধরে চোখে পড়ার মতো কাজ করেছেন সূরজ, সে কথা একবাক্যে মেনে নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনও। কিন্তু এত কিছুর পরও সন্তুষ্টির জায়গা নেই। বিপদসীমার কাছে বসবাস করা বাঘেদের নিয়ে এখনও অনেক কাজ বাকি তাঁর। জঙ্গল আর বন্যপ্রাণকে ভালবেসে প্রতিদিন নতুন নতুন বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তেই ভালোবাসেন বছর ত্রিশের এই তরুণ, যাঁকে সামনে রেখে নতুন দিশার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে আজকের ছত্তিসগড়।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.