সব কিছুতেই জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিলে চলবে?

সরকার আড়ি (Snooping) পেতেছে না পাতেনি? এই নিয়ে সেই জুলাই থেকে চলছে তর্ক। সংসদের পুরো বাদল অধিবেশনই ভণ্ডুল হয়ে গেল তর্কের জেরে। তারপরেও জবাব মিলল না, সরকার আড়ি পেতেছে না পাতেনি?

সরকার বলছে, ব্যাপারটা অতি গোপনীয়। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। সবাই জেনে ফেললে দেশের ক্ষতি। সুপ্রিম কোর্ট অত সহজে সরকারি কৌঁসুলির কথা মানছে না। সোমবার প্রধান বিচারপতি এন ভি রামানার নেতৃত্বে এক বেঞ্চ সাফ বলেছে, সরকার হলফনামা দিয়ে জানাক, কারও ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল কিনা।

হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য বেশি সময় নিলে চলবে না। বিচারপতিদের স্পষ্ট কথা, যা জানানোর, জানাতে হবে তিনদিনের মধ্যে। নাহলে সুপ্রিম কোর্টই গঠন করবে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। তারা তদন্ত করে দেখবে, সত্যিই পেগাসাস সফটওয়ার ব্যবহার করে বিচারক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, সমাজকর্মী এবং অপর কারও ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল কিনা। পুরো তদন্ত মনিটর করবে কোর্ট।

পেগাসাস কেলেংকারির কথা জানাজানি হয় ১৮ জুলাই। প্যারিসের সংবাদমাধ্যম ফরবিডেন মিডিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তদন্ত চালিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ওয়াশিংটন পোস্ট, দি গার্ডিয়ান, লা মন্ডে ও দি ওয়ারের মতো কয়েকটি সংস্থা। তারা জানতে পারে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে পেগাসাস স্পাইওয়ার ব্যবহার করে বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩০০ জন ভারতীয়।

পেগাসাস স্পাইওয়ার বানায় ইজরায়েলের এনএসও নামে এক সংস্থা। তারা কেবল কোনও দেশের সরকারকেই ওই স্পাইওয়ার বিক্রি করে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, ভারতে তাহলে কি মোদী সরকারই পেগাসাসের মাধ্যমে আড়ি পাতছিল? নাকি বিদেশি কোনও সরকার পেগাসাসের মাধ্যমে এদেশের বিশিষ্ট জনেদের ওপরে নজর রাখছে?

বিরোধীরা একবাক্যে বলছেন, আড়ি পেতেছেন মোদীই। এই নিয়ে মামলাও হয়েছে। আদালত সরকারকে জানাতে বলছে, সত্যিই কি আড়ি পাতা হয়েছিল? কিন্তু সোমবার সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা দু’ঘণ্টা ধরে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন, ব্যাপারটা খুব স্পর্শকাতর। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। তা প্রকাশ্যে জানানো উচিত নয়।

নরেন্দ্র মোদী প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী ভাষণেই দেশের নিরাপত্তার কথা বলেন। বিরোধীরা কোনও কিছু নিয়ে সরকারকে চেপে ধরলেও ওই কথা বলেন। অভিযোগ, তিনি দেশের নিরাপত্তার কথা বলে বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর আগে রাফায়েল বিমান কেনা নিয়ে যখন তদন্তের দাবি উঠেছিল, তখনও বিজেপি নেতারা জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলেছিলেন।

সবকিছুই যদি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয় তাহলে মহা ঝকমারি। সরকার যদি কিছুই প্রকাশ্যে না জানায়, তাহলে নাগরিকরা কীভাবে সরকারের কাজকর্ম বিচার করবে? তাছাড়া মানুষের প্রাইভেসি বলে তো একটা ব্যাপার আছে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে কি মৌলিক অধিকারে হাত দেওয়া যায়?

প্রত্যেকের জীবনেই কিছু না কিছু গোপন কথা থাকে। কোনও কথা গোপন করা মানেই তা অপরাধ নয়। যে রাষ্ট্র নাগরিককে কিছু গোপন রাখতে দেয় না, সে পুলিশি রাষ্ট্র। একনায়কতন্ত্রে বা সামরিক শাসনে এমনটা চলতে পারে কিন্তু গণতন্ত্রে চলে না। এখানে মানুষকে তার ব্যক্তিগত পরিসরটুকু দিতেই হবে।

কোনও সরকার যখন রাজধর্ম পালনে ব্যর্থ হয়, তখন সে সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে, এই বুঝি বিরোধীরা তাকে চেপে ধরল। তখন সে ফোনে আড়ি পাতে। শুধু রাজনীতিক নয়, যাঁরা চিন্তাশীল মানুষ অথবা সমাজকর্মী, সরকারকে প্রশ্ন করার হিম্মত রাখেন, তাঁদেরও গোপন কথাগুলি জানতে চেষ্টা করে। আমরা কি ধরে নেব, মোদী সরকারও ফিয়ার সাইকোসিসে অর্থাৎ আতঙ্ক রোগে আক্রান্ত? তাই কি সে অনেকের ফোনে আড়ি পাতছিল?

বিচারইপতিরা বলেছেন, সরকার যদি এব্যাপারে তদন্ত না করায়, আদালতই করাবে। মনে হচ্ছে, এতদিনে একটা তদন্ত হবে। এখন একটা কথাই বলার, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। অতীতে অনেক সময় দেখা গিয়েছে, তদন্তের নাম করে একটা বিষয়কে ধামাচাপা দেওয়া হয়। পেগাসাসের বেলায় যেন তেমন না হয়।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More