সময়ে মণ্ডপে পৌঁছবে তো মা? টানা বৃষ্টিতে চিন্তায় ঘুম উড়েছে কুমোরটুলির

আকাশ ঘোষ

 

কুমোরটুলির গলিতে চলছে নানা রঙের খেলা। কোথাও সাদা, কোথাও সবুজ, কোথাও কালো, কোথাও আবার কমলা। পুজোর আগে এমনই রঙ খেলা করে কুমোরটুলিতে। কিন্তু এটা প্রতিমার গায়ে চাপানো রঙ নয়, ত্রিপল-প্লাস্টিকের নানা রঙে ঢাকা পড়েছে কুমোরটুলি।

যে পাড়ায় এখন সূর্যের দাপট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই পাড়াতেই সূর্যের আলো ঢোকার উপায় নেই। কারণ বৃষ্টির চোখরাঙানি। সোমবারের পর মঙ্গলবার সূর্যদেব সহায় হয়েছিলেন কলকাতার কুমোর পাড়ার শিল্পীদের ওপর। কিন্তু তাতেও প্লাস্টিকের আবরণ সরিয়ে খোলা আকাশে মূর্তি রোদে শুকোতে দিতে ভয় পাচ্ছেন শিল্পীরা। কখন বৃষ্টি শুরু হবে ভরসা নেই।

বৃষ্টির জমা জলে ছড়াতে পারে ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়া, এখন থেকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে নবান্ন

কোথাও এখনও চলছে খড় বাঁধা, কোথাও কাঠামোর ওপর মাটির মূর্তি তৈরির কাজ। ঘড়ির কাঁটা দুপুর গড়ালেও খেতে যাওয়ার সময় হচ্ছে না, যে করেই হোক হাতের কাজ শেষ করতে হবে। কুমোরটুলির সারি সারি শিল্পের খনিতে একই গল্প। বৃষ্টি বাঁচিয়ে কাজ করতে গিয়ে সময়ও নষ্ট হচ্ছে প্রচুর। হাতে যে আর মেরে কেটে মাত্র ২০ দিন।

আকাশ কালো করে হঠাৎই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির তোড়ে দিশেহারা অবস্থা কুমোরটুলির শিল্পীদের। বুঝে ওঠার আগেই মায়ের মাটির মূর্তির ওপর বৃষ্টির জল পড়ছে। প্লাস্টিক চাপা দেওয়ার আগেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। গলে গেছে মূর্তির কিছু কিছু অংশ। মঙ্গলবার রোদ ওঠায় সেই গলে যাওয়া জায়গায় আবার করে পড়ছে মাটির প্রলেপ। কোথাও আবার মায়ের মাথায় ছাতা দিয়েছেন শিল্পীরা। কত প্লাস্টিক পাওয়া সম্ভব? অন্তত মাথা তো বাঁচুক। হাতে সময় কম, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কাজ। একই কাজে দু’বার করে সময় দিতে হচ্ছে যে।

এখন কুমোর পাড়ার সবচেয়ে বড় অসুবিধা কাঁচা মাটি শুকনো করা। এদিকে যত দেরি হবে, প্রতিমা তৈরি করে মণ্ডপে পাঠাতে তত দেরি হবে। কাঁচা মাটিতে রঙ থাকবে না। “অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে আমাদের কাজের পরিস্থিতি থাকে না। শুধু তো মাটি নয়, আনুসাঙ্গিক অনেক জিনিসের প্রয়োজন। যত সময় এগিয়ে আসছে চাপ বাড়ছে তত”, অসহায় কণ্ঠে জানালেন অবিনাশ পাল। বাবার হাতে হাতে কাজ করেন তিনি। চিন্তা একটাই, ঠাকুর সময়ে পৌঁছাতে পারবে তো মণ্ডপে?

টানা বৃষ্টিতে চাল ফুঁড়ে জল নেমেছে, ঠাকুরের মূর্তি ধুয়ে গেছে কোথাও কোথাও। মাথার ওপর দুটো প্লাস্টিক ঢেকে কোনও রকমে বড় বিপদের হাত থেকে বাঁচানো গেছে। সামান্য যেসব মাটি ধুয়ে গেছে মঙ্গলবার রোদ উঠতেই সেইসব জায়গায় প্রলেপ লাগানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন শিল্পীরা।

বিপদ কি একটা? বৃষ্টিতে আটকে পড়ছে কাঁচা মালের জোগান। বাঁশ, খড়, মাটির জোগান বন্ধ ছিল। তাতেও কাজ থমকে গেছে অনেকটাই। শিল্পী রামপ্রসাদ পালের কথায়, “বৃষ্টির জন্য খড় পাচ্ছি না, বাঁশ পাচ্ছি না, মাটি পাচ্ছি না। যারা জোগান দেয়, তারা বৃষ্টির জন্য আসতে পারছে না। ভ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্যা বাড়ছে।”

আর এক শিল্পী স্বপন পালের কথায়, “কাজে ব্যাঘাত ঘটছে, তাতে যে সময়ে ডেলিভারি দেওয়ার কথা সেই সময়ে দিতে পারব না। দু’এক দিন দেরি হবে।” আবার যদি বৃষ্টি হয়? আঁতকে উঠে স্বপনবাবু বলেন, “মাথায় বাজ পড়বে। একেই কাজ শেষ করতে পারছি না। রাতেও কাজ করছি। আবার যদি বৃষ্টি পড়ে তখন কী করব জানি না।”

প্রতিটি গোলায় হয় স্ট্যান্ড ফ্যান চালিয়ে নয়তো সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় প্রতিমা শুকনো করার কাজ চলছে। তাতেও কী নিস্তার আছে! বাইরে থেকে শুকিয়ে উঠলেও ভেতরে কাঁচা থাকার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে শিল্পীদের মধ্যে। বাতাসে যে আর্দ্রতা। সেখানে মাটি টানছে কম।

কুমোরটুলির প্রতিটি ঘরে এখন একটাই প্রার্থনা, ‘বৃষ্টি নয়, রোদ চাই’। মাটির কাজে রোদের প্ৰয়োজন। মাকে যে মণ্ডপে পাঠাতে হবে। বৃষ্টির বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে কুমোরটুলির শিল্পীদের। ঘুম উড়েছে একেবারে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More