জটার দেউল! সেখানে তন্ত্রের সঙ্গে মিশে গেছেন শিব, পরতে পরতে হাতছানি দেয় ইতিহাস

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নীল আকাশের বুকে উন্নত শির মিনার। যার পোড়ামাটির শরীর ঘিরে অনর্গল ইতিহাসের ফিসফাস। মিনারের ফলকে লেখা জটার দেউল। জটাধারী মানে শিব, তাই, স্থানীয়রা এটিকে শিবমন্দির মনে করেই পূজা-অর্চনা করে আসছেন। তবে সেই মিনার নাকি সহজিয়া সাধকদেরও পূজাস্থল। ৩২ মিটার উঁচু সেই প্রাচীন মিনার পাল যুগেই তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়।

পোড়ামাটির সেই সৌধ নিয়ে হাজারো গল্প লোকমুখে চলে আসছে। শোনা যায়, দেউলের আশেপাশের মাটি খুঁড়ে শুঙ্গ, কুষাণ এমনকি পর্তুগিজ যুগের মুদ্রা এবং দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। পাল যুগে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়ের সময় থেকে নাথযোগীদের আবির্ভাব, সেই বিস্তীর্ণ সময়ের সাক্ষ্য দিয়ে চলে জটার দেউল।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর ব্লকের মনি নদীর তীরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন সেই সৌধ। আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ১৭৫ অব্দে রাজা জয়চন্দ্র জটার দেউল তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে পর্তুগীজ-মগ জলদস্যুরা সেটিকে ওয়াচটাওয়ার হিসাবে ব্যবহার করত।

 

১৮৬৮ সালে জটা দেউল সংলগ্ন জমিতে ব্রাহ্মণ্য ও জৈন দেবদেবীর সঙ্গে বেশ কয়েকটি পাথরের বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ব্রোঞ্জের তৈরি মহাকাল, বটুক ভৈরব, জম্ভল, ষড়ক্ষরী লোকেশ্বর, পোড়া মাটির তারা মূর্তি সহ তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। নাথযোগী সম্প্রদায়ের মানুষই সেই মূর্তিগুলো পুজো করতেন বলে জানা যায়। তাই জটা দেউলের ইতিহাসেও জুড়ে গিয়েছে বাংলার বৌদ্ধযুগের ওঠাপড়া।

নাথযোগীরা চর্যাপদের যুগের সহজিয়া সাধক। আদিতে তাঁরা কেবলমাত্র লিঙ্গপূজা করতেন। পরে যখন জটার দেউল নির্মাণ হয় ততদিনে তান্ত্রিক অনুষঙ্গ অনুপ্রবেশ করেছিল এবং তার প্রভাবে লিঙ্গ- আলিঙ্গন মূর্তির প্রচলন ঘটে। যার ফল স্বরূপ জটার দেউলেও লিঙ্গ যোনির প্রতীকী রূপদান ঘটেছিল বলে জানা যায়।

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, জটার দেউল ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে যে ধর্মের অনুশীলন চলতো তা নাথধর্ম বিকশিত হওয়ার আগেকার বৌদ্ধশাখা, বজ্রযান। লিঙ্গ-যোনি অনুষঙ্গ আসলে তন্ত্রসাধনার মূল কথা। যা প্রজনন শক্তির প্রতীক। জটার দেউলের শৈল্পিক সুষমার মধ্যে দিয়ে বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা সেই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন হয়তো।

উর্বরতার প্রতীক হয়ে সেই সৌধ পরবর্তীকালে জটাধারী শিবের সঙ্গে মিশে যায়। যার ফলে দেউল মন্দির এখন প্রায় শিবমন্দিরে পরিণত হয়েছে।

২০১১ সালের শেষ দিকে জটার দেউলের সামনের অবতল ঢিবিটিতে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তরফে খনন কার্য শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে একটি ইটের কাঠামো আত্মপ্রকাশ করে। আগে মনে করা হত দেউল সংলগ্ন কোনও নাটমন্দির বা জগমোহন ছিল না। কিন্তু কাঠামোটি আবিষ্কারের পর সেই ধারনা ভুল প্রমানিত হয়।

মন্দিরস্থাপত্যে ভারতের মানচিত্রে জটার দেউল বাংলার এক উল্লেখযোগ্য স্থান। সেযুগে ভৌগলিক বৈচিত্রের কারণে এলাকায় পাথর তেমন সুলভ না হওয়ায় পোড়ানো ইটই মন্দির সজ্জার অন্যতম উপকরণ হয়ে উঠেছিল। শুধুমাত্র বাংলাতে নয় গোটা ভারতেই ইটের তৈরি প্রাচীন দেউল খুবই কম আছে। প্রতিবছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে জটা দেউলের সামনে মেলা বসে। হয় ঘোড় দৌড়ও। এছাড়াও প্রতি সোমবার ও শুক্রবার পুজো হয়। প্রচুর মানুষ আসেন।

সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে ঘেরা সেই জটার দেউলের কথা ক’জনই বা জানেন, তবে অনন্তকাল ধরে সুন্দরবনের মনি নদীর পারে স্বমহিমায় বিরাজ করছে বাংলার সেই গর্বিত মিনার।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.