সিঙ্গল মাদারের আসল চ্যালেঞ্জ সন্তানকে নিয়ে সমাজের মোকাবিলা

মা হয়েছেন সংসদ অভিনেত্রী নুসরত জাহান। কিন্তু এখনও তাঁর ছেলের পিতৃ পরিচয় রয়েছে আড়ালেই। নুসরত সিঙ্গল মাদার হবেন কিনা সেটা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ নাড়িয়ে দিয়েছে সমাজকে। উঠে এসেছে আরও অনেক নাম যাঁরা একলা মা হয়ে সন্তানকে বড় করে তুলছেন, এ শহরের বুকেই। তেমনই একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার অনিন্দিতা সর্বাধিকারী। দ্য ওয়ালের জন্য কলম ধরলেন তিনি।

অনিন্দিতা সর্বাধিকারী

(প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার)

ছোটবেলা থেকেই বিয়ে নামক ইনস্টিটিউশনে বিশ্বাসী নই। প্রেম, বিয়ে এসব নিয়ে অন্য রকম ধারণা ছিল আমার। মানবসভ্যতার সেই গোড়ার দিক থেকে বিবর্তনের ইতিহাস দেখলে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিয়ে মানেই সম্পত্তির অধিকার-অনধিকারের একটা বিষয় চলে আসত। তাই বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চাই নি, কিন্তু আমি ভালবাসার সম্পর্কে বিশ্বাসী। মা হতে চেয়েছি অবশ্যই, তবে নিজের গর্ভে নিজের পরিচয়ে সন্তান ধারণ করতে চেয়েছি (SingleMother)।

আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী নই, পুনর্জন্ম মানি না, প্রেম-বিয়ে থেকে অনেক দূরে—একটা সময় আশপাশের লোকজন বলত “এ আবার কেমন রে বাবা!” তবে নিজের পরিবারের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছি। আমি মাতৃত্বে বিশ্বাসী। মা হতে চেয়েছিলাম। নিজের শরীরে একটি প্রাণ তিলে তিলে গড়ে তোলার বাসনা ছিল। সেখান থেকেই ‘একা মা‘ হওয়ার সিদ্ধান্ত।

‘আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছবি’… ছেলে অগ্নিস্নাতর সঙ্গে অনিন্দিতা

অনেকেই আমাকে বলেছিল কেন দত্তক নিচ্ছি না। কেন বায়োলজিক্যাল মাদার হতে চাইছি? এই প্রশ্নটা শুধু আমাকে নয়, মনে হয় আরও অনেক মহিলাকেই শুনতে হয়েছে নানা সময়ে। একজন নারী মাতৃত্ব চাইছেন বা চাইছেন না, এটা সম্পূর্ণই তাঁর সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। একজন নারীর কাছে মা হওয়া তো পরম প্রাপ্তি, ম্যাজিকের মতো। মেয়েদের শরীরে এত সুন্দর ধারণ ক্ষমতা রয়েছে, যেখানে তিনি আরও একটি প্রাণ গড়ে তুলতে পারেন। আমি মাতৃত্বের সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই যেতে চেয়েছি।

ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, পরীক্ষা করিয়েছি। তার পরেও বৈজ্ঞানিক ওই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে আরও বছর দুয়েক সময় লেগেছে। শরীর ও মনকে তৈরি করেছি। আমার শারীরিক কোনও সমস্যা ছিল না, একটাই সমস্যা যে আমার জীবনে কোনও পুরুষ নেই। তাই মা হওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মধ্যে দিয়েই যেতে হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটাও কম ঝক্কির নয়। আর এক মহিলার পক্ষে সবটা সামলানো, মনকে শক্ত রাখা, সবটাই কঠিন লড়াইয়ের। একা যাচ্ছি ডাক্তারের ক্লিনিকে, হরমোন ইঞ্জেকশন নিচ্ছি, একা ফিরছি। নিজের খেয়াল রাখছি। চার মাস ধরে এই লড়াইটা ছিল খুবই কঠিন। প্রথমবার প্রেগন্যান্সিতে মিসক্যারেজও হয়েছে। মানসিক দিক থেকে ভেঙেও পড়েছিলাম। শরীরেও অসহ্য যন্ত্রণা। একটা সময়ের পরে শরীরে আর শক্তি ছিল না। শুধু মনের জোরটাই ছিল সম্বল, আরও একটা প্রাণ পৃথিবীতে আনতেই হবে।

২০১৩ সালের ৩ মে মা হওয়ার জার্নিটা শুরু হয়। আমি অনুভব করি আমার গর্ভে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে। অগ্নিস্নাতকে পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আরও একটা কথা বলতেই হয়, সমাজের সব ক্ষেত্রে একলা মায়েদের যে ভ্রূকুটি সইতে হয় তা নয়। সমাজে একটা অংশে গোঁড়ামি থাকলেও, অন্য অংশে মুক্ত চিন্তাধারা এখনও বেঁচে আছে। মনে পড়ে, তখন আমি গর্ভবতী। মিডিয়া সূত্রে এ শহর জেনে গেছে আমি সিঙ্গল মাদার হচ্ছি। যেহেতু ফিল্ম ও মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাই চেনাজানার পরিসটারও বড়। সেখানে আমাকে কোনও ব্যাঙ্গাত্মক কথা শুনতে হয়নি কখনও।

দুর্গাপুজোর সময়কার একটা ঘটনা বলছি। প্যান্ডেলে গিয়েছি একদিন। প্রচুর চেনা-অচেনা মুখের ভিড়। সঙ্গে মা ছিলেন। সেখানে সকলে আমাকে কী যে আদর-যত্ন করলেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির গৃহবধূরাও দেখলাম কত উদারমনস্ক। স্বামী, সন্তান, সন্ধের সিরিয়ালে যাঁদের রুটিন বাঁধা, তাঁরাও এগিয়ে এসে আমার যত্ন করলেন, সমর্থন করলেন আমার মাতৃত্বকে। সমাজ..সমাজ.. করে লাফালাফি করেন যাঁরা, তাঁদের বলতে চাই, এখনও মুক্ত ও সজীব ভাবনা এই সমাজেরই কোথাও বেঁচে আছে। চারদিকে শুধুই আঁধার আর ভ্রান্ত বিশ্বাসের বেড়াজাল নেই, এ সমাজ ভালবাসতেও জানে। আপন করে নিতে জানে।

তবে হ্যাঁ, লড়াইটা আমাকেও করতে হয়েছে। সেটা অগ্নিস্নাতকে স্কুলে ভর্তি করার সময়ে। সিঙ্গল মাদার শুনে সব স্কুলেরই দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আমার জন্য। সাড়ে সাত মাস আমি রাতে ঘুমোতে পারিনি। দুশ্চিন্তায়, ক্ষোভে, অপমানে কতটা যন্ত্রণার লড়াই লড়েছি, তা বলে বোঝাতে পারব না! ওই সব স্কুলের সঙ্গেই কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল ট্যাগ জোড়া ছিল, কিন্তু তাদের মানসিকতা একটা গ্রামের স্কুলের চেয়েও কম। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, আমার মাতৃত্বকে কাটাছেঁড়া করেছেন মহিলারাই। স্কুলের মহিলা প্রিন্সিপালদের কাছেই সবচেয়ে বেশি হেনস্থা হতে হয়েছে আমাকে। ছেলের জন্মের বিবরণ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রতিটি পদক্ষেপের বর্ণনা, আমার একা মা হওয়ার কারণ, সবই বিস্তারিত বিবরণ ও প্রমাণ সহ সকলের সামনে আইনি নথিতে পেশ করার ফতোয়া জারি হয়েছিল।

দাদু-দিদিমার সঙ্গে অগ্নিস্নাত

বিপর্যস্ত আমি শেষে রাজ্যের শিশু সুরক্ষা কমিশনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছিলাম। তারা আমার পাশে ছিল, কিন্তু কোনও সাহায্য করতে পারেনি। কারণটা সেই এক, যুক্তি-তর্ক আর পুরনো কিছু নিয়মনীতি, যা আঁকড়ে রেখেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। যদিও এখন পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলেছে। রাজ্যের শিশু অধিকার রক্ষা কমিশনের তথ্য বলছে, একা মা হওয়ার কারণে শিশুদের স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয়নি, এমন অভিযোগের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আর সে সব স্কুল কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের নয়, খাস শহরের। যাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছে বা বিচ্ছেদের মামলা চলছে, শুধু তাঁদের ক্ষেত্রেই নয়। যাঁরা বিয়ে না করেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে (আইভিএফ) মা হয়েছেন, তাঁদেরও একই অভিজ্ঞতা! একটি স্কুলের কর্তৃপক্ষ তো আমাকে বলেই দিয়েছিলেন, বাচ্চার ৬ বছর বয়স হলে সে শিশু অধিকার রক্ষা কমিশনের আওতায় আসে। আমার ছেলের বয়স তো সেখানে চার। তাই এই নিয়ম আমার সন্তানের ক্ষেত্রে লাগু হবে না।

‘ছেলেই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড’

পরে ছেলে যে স্কুলে ভর্তি হয় তার অধ্যক্ষ এক জন পুরুষ। তিনি আমার সব কথা শুনেই ভর্তি করতে চেয়েছিলেন। এখন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে ছাত্রছাত্রীদের মা-বাবা, সকলেই ভীষণ ভালবাসেন আমার ছেলেকে। আসলে শুধু পড়াশোনা তো নয়, স্কুলের পরিবেশটাও শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমি সেই সাপোর্টটা পেয়েছি।

একলা মায়েদের সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হল, মানসিক দৃঢ়তা ও সাহস। নিজের লড়াই দিয়ে বুঝেছি, সন্তানের জন্য একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে মাকেই। যতদিন না সন্তান তার নিজের ভিত মজবুত করতে পারছে, ততদিন অবধি মায়ের সাপোর্টটাই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সামাজিক ধাক্কা আসবে, নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সেসব সামলেই সন্তানকে বড় করতে হবে নিজের মতো করে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা সুখপাঠ

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More