উত্তর-পূর্বের উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক পরিকল্পনা নেওয়া হোক

0

ভুল (Mistake) সকলেরই হয়। সেনাবাহিনীরও হয়। সেই ভুলের মাশুল যদি নিরীহ মানুষকে দিতে হয়, তাহলে তো হইচই হবেই।

নাগাল্যান্ডে গত শনিবার রাতে ও রবিবার অসম রাইফেলসের গুলিতে ১৪ জন নিরীহ মানুষ মারা গিয়েছেন। এক জওয়ানেরও মৃত্যু হয়েছে। তারপর স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন শুরু হয়েছে দেশ জুড়ে। নাগাল্যান্ড রীতিমতো অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। সেখানে এখন হর্নবিল উৎসবের মরসুম। শনিবারের ঘটনার পরে অনেকে ওই উৎসব পালন করবেন না বলে স্থির করেছেন।

সেনাবাহিনী অতগুলি মৃত্যুর জন্য ক্ষমা চেয়েছে। সংসদে দাঁড়িয়ে অমিত শাহও দুঃখপ্রকাশ করেছেন। উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নাগাল্যান্ড তথা উত্তর-পূর্বের ক্ষোভ অত সহজে মিটবে বলে মনে হয় না। গত কয়েক দশক ধরে ওই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রয়েছে। সেখানে শুধু যে কয়েকটি গোষ্ঠী বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রচার করে এমন নয়। সাধারণভাবে সেখানকার মানুষের মধ্যেই ওই প্রবণতা রয়েছে। তার ওপরে অসম রাইফেলসের গুলিতে এতজন মানুষের মৃত্যু সেই প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ঘটনাটা কী ঘটেছিল একবার খতিয়ে দেখা যাক।

সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ভারতে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর তাদের অতর্কিত আক্রমণে মণিপুরে সেনাবাহিনীর এক কর্নেল, তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং অপর চার সৈনিক নিহত হন। এত বড় জঙ্গি হানা হলে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তারক্ষীদের ওপরে চাপ বাড়ে।

সম্প্রতি সেনাবাহিনীর থারটিনথ কোর ও অসম রাইফেলসের কাছে ‘নির্ভরযোগ্য সূত্র’ থেকে খবর আসে, শনিবার রাতে একদল জঙ্গি ট্রাকে চড়ে ওটিং-টুরু রোড দিয়ে আসবে। ওই জায়গাটি মায়ানমার সীমান্তে মন জেলায় অবস্থিত। সীমান্তে প্রহরা তেমন আঁটোসাটো নয়। দেশবিরোধী শক্তিগুলি প্রায়ই এদেশে হামলা চালিয়ে সীমান্তের ওপারে পালিয়ে যায়। আবার সুযোগ বুঝে ভারতে ঢোকে।

শনিবার রাতে জঙ্গিদের জন্য সেনাবাহিনী ও অসম রাইফেলসের জওয়ানরা ওত পেতে ছিলেন। এমন সময় ওই রাস্তা দিয়ে এসে পড়ে নিরীহ যাত্রীবোঝাই একটি ট্রাক।

হয়তো গোয়েন্দারা ভুল খবর দিয়েছিল। জঙ্গিরা ওইদিন সীমান্ত পেরিয়ে আসেইনি। অথবা তাদের আসার আগেই ওই রাস্তায় এসে পড়েছিল অপর একটি ট্রাক।

মন জেলায় একটি কয়লাখনি আছে। আশপাশের গ্রামের অনেক বাসিন্দা সেখানে কাজ করেন। সারা সপ্তাহ কাজ করার পরে তাঁরা শনিবার রাতে বাড়ি ফেরেন। গত শনিবারও তাঁরা ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তাঁদেরই সৈনিকরা জঙ্গি ভেবেছিল।

সেনাবাহিনী কৈফিয়ৎ দিচ্ছে, ট্রাকটিকে থামতে বলা সত্ত্বেও চালক থামাননি। তাই গুলি চালানো হয়েছিল। এটা কিন্তু খুব জোরালো যুক্তি নয়। কাউকে থামতে বলার পরে সে যদি না থামে, তাহলেই কি গুলি চালানো যায়? মানুষের জীবন কি এতই সস্তা?

মানবাধিকার কর্মীরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, উত্তর-পূর্বে সেনাবাহিনীকে যে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া আছে, তা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। তাতে মানুষের জীবনের অধিকার, যা সংবিধানে স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার, তা লঙ্ঘন করা হয়। ওই আইনবলে সেনাবাহিনী স্রেফ সন্দেহের বশে কাউকে গুলি করে মারতে পারে। অনেকদিন ধরেই সেনাবাহিনীর ওই বিশেষ অধিকার প্রত্যাহার করার দাবি উঠেছে। নাগাল্যান্ডের ঘটনার পরে সেই দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন নিয়ে নিশ্চয় কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবা উচিত। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদের মূল কারণ হল অনুন্নয়ন। সেখানকার এক বড় সংখ্যক মানুষ মনে করেন, কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের রাজ্যগুলি থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে। কিন্তু এলাকার উন্নয়নে বেশি খরচ করে না।

এই ধারণা দূর করতে হলে সামগ্রিকভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবেই সেখানকার মানুষ ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম বোধ করবেন। বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য যদি কেবল সশস্ত্র শক্তির ওপরেই নির্ভর করা হয়, তাহলে নাগাল্যান্ডের মতো ঘটনা আগামী দিনেও এড়ানো যাবে না।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.