করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট কী, কেন এত ছোঁয়াচে? ভ্যাকসিনে কতটা কাজ হবে?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনার নতুন প্রজাতি ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট নিয়ে এখন এত চর্চা হচ্ছে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, এই মারণ ভাইরাসের এই প্রজাতিই এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তার কারণ। ভারতেই প্রথম খোঁজ মিলেছে এই প্রজাতির। আর এখন বিশ্বের প্রায় ৪৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটেনে এই ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টই এখন সুপার-স্প্রেডার হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণের কার্ভ বাড়ছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। করোনার বাকি প্রজাতিগুলির মধ্যে এই ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টকেই উদ্বেগজনক ভাইরাল স্ট্রেনের তকমা দিয়েছে হু। এখন প্রশ্ন হল এই ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট কী? কতটা সংক্রামক? ভ্যাকসিন দিয়ে এই প্রজাতিকে বশে আনা যাবে কি?

কোভিডের ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট কী?

কোভিডের যে কটা সংক্রামক প্রজাতি নিয়ে খুব বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন তার মধ্যে একটি হল ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট বি.১.৬১৭.২। ব্রিটেন স্ট্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রজাতি, ব্রাজিলীয় প্রজাতি ও ভারতের ডবল ভ্যারিয়ান্ট—এই প্রজাতিগুলোই এখন উদ্বেগের কারণ। ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট হল ভারতীয় প্রজাতি তথা ডবল ভ্যারিয়ান্টেরই একটি পরিবর্তিত রূপ। বা বলা ভাল ডবল ভ্যারিয়ান্টের উপ প্রজাতি।

New SARS-CoV2 Mutations: Variant of Concern 202012/01 (Variant B.1.1.7) –  Ingenetix

ভাইরোলজিস্টরা বলছেন, গত বছর মার্চ থেকে করোনার যে প্রজাতি ভারতে ছড়াতে শুরু করেছিল তা এখন অনেক বদলে গিয়েছে। সুপার-স্প্রেডার হয়ে উঠেছে, মানে অনেক দ্রুত মানুষের শরীরে ঢুকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সার্স-কভ-২ হল আরএনএ (রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) ভাইরাস। এর শরীর যে প্রোটিন দিয়ে তৈরি তার মধ্যেই নিরন্তর বদল হচ্ছে। এই প্রোটিন আবার অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে সাজানো। ভাইরাস এই অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলোর কোড ইচ্ছামতো বদলে দিচ্ছে। কখনও একেবারে ডিলিট করে দিচ্ছে। এইভাবে বদলের একটা চেইন তৈরি হয়েছে। আর এই এই রূপ বদলের কারণেই নতুন নতুন প্রজাতির দেখা মিলতে শুরু করেছে। ডবল ভ্যারিয়ান্ট তথা বি.১.৬১৭ প্রজাতিও একই ভাবে বদলে গেছে। পর পর তিনবার জিনের গঠন বিন্যাস বদলে তিনটি নতুন উপ প্রজাতি তৈরি করেছে–বি.৬১৭.১, বি.১.৬১৭.২ ও বি.১.৬১৭.৩। এদের মধ্যে বি.১.৬১৭.২ স্ট্রেনের নাম দেওয়া হয়েছে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট, এটিই সবচেয়ে সংক্রামক বলে দাবি করা হচ্ছে।

Kappa and Delta variants: Explained: Why WHO named Covid-19 variants first  found in India as 'Kappa' and 'Delta' | India News - Times of India

কেন ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট এত সংক্রামক?

করোনার এই প্রজাতির মধ্যে অনেকগুলো মিউটেশন হয়েছে। ডবল ভ্যারিয়ান্ট মানে হল দুবার জিনের বিন্যাস বদলাচ্ছে, দুটি মিউটেশন হচ্ছে যাদের নাম–E484Q এবং  L452R। এই বদল মানে হল অ্যামাইনো অ্যাসিড তার একটা অবস্থানে বদলে গিয়ে অন্য অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড বসিয়ে দিচ্ছে। যেমন– E484Q মিউটেশন মানে হল ‘E’ অ্যামাইনো অ্যাসিড তার ৪৮৪ নম্বর অবস্থানে বদলে গিয়ে ‘Q’ কোড নিয়েছে। এইভাবে বদলটা চলতে থাকছে।

ভাইরোলজিস্টরা বলছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টের স্পাইক প্রোটিনে চার রকম বদল হচ্ছে– T19R, DEL157/158, T478K ও D950N। তাছাড়াও স্পাইক প্রোটিনের ৬১৪ পজিশনে (অ্যাসপারেট থেকে গ্লাইসিন) দুটি বদল হচ্ছে– S-D614S-G614 এই মিউটেশনের নাম D614G যেটি আগে দেখা গিয়েছিল তা এখন আবার ফিরে এসেছে। এই সব মিলিয়েই ভাইরাল স্ট্রেন আরও ছোঁয়াচে হয়ে উঠেছে।


ভ্যাকসিন দিয়ে কতটা প্রতিরোধ করা যাবে?

শুরুতে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের যে স্ট্রেনগুলির জিনোম সিকুয়েন্স বা জিনগত বিন্যাস বের করে ভ্যাকসিনের ফর্মুলা বানিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা, তা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। কুড়ি সালের মার্চ মাসে করোনার যে প্রজাতি ছড়িয়েছিল তা এখন জিনের বিন্যাস বদলে ফেলেছে। এই বদল বা মিউটেশন এত ঘন ঘন হয়েছে যে শুরুতে কোন প্রজাতি ছিল এবং তার জিনের বিন্যাস কেমন ছিল তা এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাজেই একই ভ্যাকসিনের ফর্মুলায় নতুন ভ্যারিয়ান্টকে নিষ্ক্রিয় করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

Delta variant Lancet says reduce gap between vaccine doses give boosters  covid latest news | India News – India TV

সিন্থেটিক আরএনএ দিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন ভাইরাসের বিভাজন অনেকটাই থামাতে পারে। এমআরএনএ হল শরীরের বার্তাবাহক। এর কাজ কোন কোষে প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, কোথায় কী রাসায়নিক বদল হচ্ছে সবকিছুর জিনগত তথ্য বা ‘জেনেটিক কোড’ জোগাড় করে সেটা শরীরের প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। তাই এই বার্তাবহ আরএনএ দিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন শরীরের কোষগুলিকে অ্যান্টি-ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করতে উৎসাহ দেবে। এই ভ্যাকসিন মানুষের দেহকোষে ঢুকে করোনাভাইরাসের মতো প্রোটিন তৈরি করার নির্দেশ দেবে। সেই প্রোটিনের বাইরে খোলসটা হবে ঠিক সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের মতোই। অথচ করোনার মতো অতটা সংক্রামক নয়। দেহকোষ তখন এমন ধরনের প্রোটিন দেখে তার প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। সেদিক থেকে ফাইজার-বায়োএনটেক ও মোডার্নার আরএনএ ভ্যাকসিন কার্যকরী হতে পারে। ভেক্টর ভ্যাকসিন দিয়েও নতুন ভ্যারিয়ান্টকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন কোম্পানিগুলো বলেছে, ‘টাইটার ল্যাবরেটরি টেস্ট’ করে দেখা গেছে করোনার সুপার-স্প্রেডার মিউট্যান্ট প্রজাতিদের ঠেকাতে এই ভ্যাকসিনগুলি কাজে আসতে পারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More