কোভিড রোগীর সিটি ভ্যালু কী ? এই সূচক কত থাকলে আপনি কোভিড পজিটিভ বা নেগেটিভ

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে নাজেহাল দেশ। কোভিড পজিটিভ রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। সংক্রমণের হারও বেশি। করোনা আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। এখন কোভিড পরীক্ষার যতগুলো পদ্ধতি আছে তার মধ্যে সেরা রিয়েল টাইম আরটি-পিসিআর টেস্ট পদ্ধতি। কারণ, অন্য পদ্ধতিতে দেখা গেছে করোনার উপসর্গ থাকার পরেও রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। ভুল রিপোর্ট থাকায় হাসপাতালে ভর্তি হতে দেরি হয়েছে, ফলে সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণেই আরটি-পিসিআর টেস্ট পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ভাইরাস চিহ্নিত করার জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে যাকে বলা হচ্ছে ‘সিটি ভ্যালু’।
অনেকেরই প্রশ্ন সিটি-ভ্যালু আসলে কী? কোভিড রোগীদের এমনও বলতে শোনা গেছে, সিটি ভ্যালু ২২ বা ২৪ মানে কী রোগ গুরুতর, প্রাণ সংশয়ের ঝুঁকি আছে?

সিটি ভ্যালু কী?

সিটি ভ্যালু হল ‘সাইকেল থ্রেসহোল্ড ভ্যালু’। আরটি-পিসিআর টেস্টের একটি নির্দিষ্ট সীমা যার মাধ্যমে করোনা আক্রান্তের শরীরের ভাইরাল লোড অর্থাৎ শরীরের ভাইরাসের উপস্থিতির মাত্রা পরিমাপ করা যায়। আরটিপিসিআর করোনার নিশ্চিত পরীক্ষা। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা হলে রিপোর্টে ওই পরিমাপের উল্লেখ থাকে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ এই সিটি ভ্যালুর মাত্রা ৩৫ এ রেখেছে। যদি এর কম হয় এবং মাত্রা ২৪ এর নীচে নেমে যায় তাহলে রোগী কোভিড পজিটিভ, আর যদি ২৪ থেকে ৩৫ এর মধ্যে থাকে তাহলে ঝুঁকি কম, যদি ৩৫ এর বেশি হয় তাহলে সংক্রমণ নেই ধরে নেওয়া হবে।

COVID 19 test report: How to read Ct value and why is it important? - The  Financial Express

আরটি-পিসিআর টেস্ট ও ভাইরাল লোড

আরও সহজ করে বললে আগে আরটি-পিসিআর টেস্ট কী করে করা হয় সেটা বুঝে নেওয়া যাক। রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন তথা আরটি-পিসিআর টেস্টে ভাইরাসের জিন চিহ্নিত করে সংক্রমণ পরীক্ষা করা হয়। তার জন্য অনেকগুলো জটিল প্রক্রিয়া আছে যেগুলি পর পর করা হয়। আমরা জানি করোনাভাইরাস হল আরএনএ (রাইবোনিউক্লক অ্যাসিড)ভাইরাস। আরটি-পিসিআর টেস্ট করার সময় রোগীর নমুনা স্ক্রিনিং করে বা ছেঁকে আরএনএ স্ট্রেন বের করে নেওয়া হয়। এবার সেটিকে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড)-তে বদলে দেওয়া হয়। আরএনএ স্ট্রেন ডিএনএ-রে রূপান্তরের পরে অ্যাম্পলিফিকেশন করা হয়। মানে হল, ভাইরাসের জিন নিয়ে পর পর কয়েকটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া করা হয়। ভাইরাসের একটি স্ট্রেন মাল্টিপ্লাই করে দুটি করা হয়, এবার সে দুটি থেকে চারটি, আটটি…এমনভাবে ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে যাওয়া হয়। একে বলে ‘মাল্টিপল সাইকল’।

Why RT-PCR COVID-19 Test Can Be Cheaper Than The Rs 4,500 ICMR Price Cap

কেন করা হয়? এটাই জানতে যে রোগীর শরীরে ভাইরাল লোড কতটা বেশি আছে। ভাইরাসের স্ট্রেনের মাল্টিপ্লিকেশন যদি বেশি হতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ভাইরাল লোড কম। আর যদি কম হয় তাহলে বুঝতে হবে ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে। কারণ কয়েকবার মাল্টিপ্লাই করার পরেই ভাইরাস জিনোম সঠিকভাবে চিহ্নিত করে ফেলা গেছে। তাকে আবার টানাটানি করে বাড়ানোর দরকার পড়েনি।

আরটি-পিসিআর টেস্টে বিশেষ ধরনের ফ্লোরোসেন্স মার্কার ব্যবহার করা হয়। ভাইরাস ধরা পড়লে এটি সিগন্যাল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। যখন ওই একটি, দুটি, চারটি, আটটি করে মাল্টিপ্লাই করা হয় তখন যে পর্যায়ে গিয়ে সিগন্যাল আসে সেটাই হল সিটি ভ্যালু। সেই মাত্রা দেখেই বোঝা যায় রোগীর শরীরে ভাইরাল লোড কতটা আছে।
সিটি ভ্যালু ভাল কী তা ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন ক্যাথ ল্যাবের ডিরেক্টর ও মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর দীলিপ কুমার। তিনি বলেছেন, করোনা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৫ দিনের মধ্যে শরীরে সংক্রমণ দেখা যায়। কিন্তু ৩-৫ দিনের আগেই যদি পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া হয়, তা হলে শরীরে ভাইরাল লোড কম থাকবে। কারণ এই সময়টা ভাইরাস নাক ও গলাতেই বসে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ফুসফুসে নামে। ডাক্তারবাবু বলছেন, সিটি ভ্যালুর পরিমাপকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ২৪ থেকে ৩৫ এর মধ্যে থাকলে ঝুঁকি কম। এর মানে হল ৩৫ বার মাল্টিপ্লিকেশন করা হয়েছে, তার পরে গিয়ে ভাইরাস জিনোম ধরা গেছে। তার মানে শরীরে ভাইরাল লোড কম, সংক্রমণ কম। তবে ২৪ এর নীচে নেমে গেলে ঝুঁকির কারণ আছে। ২০-র নীচে থাকলে খারাপ, ৬ থেকে ১০-এর মধ্যে সিটি ভ্যালু থাকলে তা সবচেয়ে খারাপ। মোদ্দা কথা, সিটি ভ্যালু যত কম হবে সংক্রমণ তত বেশি, আর বেশি মানে সংক্রমণ কম। এটা মাথায় রাখলেই হবে।

সিটি ভ্যালুর সঙ্গে জটিল রোগের সম্পর্ক আছে কি?

সিটি ভ্যালু কম মানে শরীরে ভাইরাল লোড বেশি। সেই রোগীর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা দরকার। কিন্তু সিটি ভ্যালু কম মানেই খুব জটিল রোগের সম্ভাবনা আছে তেমনটি নিশ্চিত করে বলেননি বিশেষজ্ঞরা। বস্তুত, ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি-র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কম সিটি ভ্যালুর সঙ্গে খুব জটিল রোগের সম্পর্ক নেই। এমনও দেখা গেছে, সিটি ভ্যালু খুব কম, রোগীর শরীরে ভাইরাল লোড বেশি, কিন্তু রোগী উপসর্গহীন।

ডাক্তার দিলীপ কুমারও বলেছেন, সংক্রমণ তখনই গুরুতর হবে যখন সাইটোকাইন স্টর্ম বেশি হবে। যদি দেখা যায়, লাগাতার পাঁচদিন ধরে রোগীর জ্বর আসছে, তাপমাত্রা খুব বেশি, তখন বুঝতে হবে সাইটোকাইন স্টর্ম শুরু হয়ে গেছে। সার্স-কভ-ভাইরাসের সংক্রমণে শরীরে যে অধিক প্রদাহ তৈরি হয় তার কারণ হল সাইটোকাইন নামক প্রোটিনের অধিক ক্ষরণ। এই প্রোটিনের কাজ হল বাইরে থেকে কোনও সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যাথোজেন ঢুকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোষে সেই বিপদ সঙ্কেত পৌঁছে দেওয়া। অজানা সংক্রামক প্রোটিন দেখলেই ঝড়ের গতিতে কোষে কোষে বিপদবার্তা পৌঁছে দেয় এই সাইটোকাইন প্রোটিন। এই প্রোটিন ক্ষরণেরও একটা নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। যদি দেখা যায় সাইটোকাইন ক্ষরণ বেশি হচ্ছে বা কম হচ্ছে তাহলে ভারসাম্য বিগড়ে যায়। গবেষকরা বলছেন, দেখা গেছে করোনার সংক্রমণ হলে এই সাইটোকাইনের ক্ষরণ প্রয়োজনের থেকে বেশি হচ্ছে। এত বেশি প্রোটিন নিঃসৃত হচ্ছে যে বিপদবার্তা পৌঁছে দেওয়ার বদলে সে নিজেই কোষের ক্ষতি করে ফেলছে। তখন শরীরে প্রদাহ তৈরি হচ্ছে। জ্বর, পেশির ব্যথা, রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তখনই বলা যাবে রোগীর অবস্থা গুরুতর।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.