‘পদ্মশ্রী’ সিনেমা হল বিক্রির পথে, মিলিয়ে যাবে উত্তম-সুচিত্রার ‘চাওয়া পাওয়া’র ইতিহাস

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা-সহ মফস্বলে নিভছে একের পর এক সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলের প্রদীপ। একদিকে মহামারীতে যেমন দর্শকহীন সিনেমা হল বিপর্যস্ত, তেমনই মহামারীর মতোই কলকাতা শহরের বুক থেকে উঠে যাচ্ছে একের পর সিনেমা হল। এবার হল বিক্রির পথে নাম লেখাল গড়িয়ার ‘পদ্মশ্রী’।

কয়েক মাস আগেই বন্ধ হয়ে গেছিল মিত্রা সিনেমা হল। কিছুদিন আগেই আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেল মিনি জয়া সিনেমা হল। এরপর বিক্রির পথে গড়িয়া-টালিগঞ্জ চত্বরের সবথেকে আদি হল ‘পদ্মশ্রী’।

হল-মালিকরা সিনেমাহল বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হল বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজছেন ‘পদ্মশ্রী’ হলের মালিকরা। পদ্মশ্রী হলের মালিকানায় তিন জন পার্টনার। তাঁর মধ্যে অন্যতম শ্যামল কুমার দে। তাঁর বাবা প্রমথ কুমার দে হলের প্রধান ছিলেন। তবে বর্তমানে এই তিন পার্টনারের প্রায় ১৪ জন বংশধর। লোকসান হওয়ায় সকলের সম্মতিতেই এই হল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।

শ্যামল দে এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, “চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে বন্ধ পদ্মশ্রী সিনেমা হল। এমনিতেই মাল্টিপ্লেক্সের যুগে সিঙ্গল স্ক্রিন চালানোটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। করোনা আবহে আরও অসম্ভব হয়ে পড়ল। তবে যিনি এই হলটি কেনার সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনিই ঠিক করবেন এটি সিনেমা হল থাকবে, নাকি থাকবে না।”

১৯৫৯ সালে প্রযোজক-ডিস্ট্রিবিউটর নারয়াণ সাধুখাঁ এই হলটি তৈরি করেন দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া এলাকায়। হলটির উদ্বোধন হয় ১৯৬০ সালে। প্রায় ৭২০টি আসন সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয় এই হলটি। প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল উত্তম-সুচিত্রা জুটির ‘চাওয়া পাওয়া’। সেই সময় গড়িয়া, যাদবপুর , টালিগঞ্জ এলাকার প্রথম সিনেমা হল ছিল ‘পদ্মশ্রী’। তারপর একে একে বান্টি, মধুবন, মহুয়া, মালঞ্চের মতো হলগুলি চালু হয় এই চত্বরে। বর্তমানে প্রতিটি হলই বন্ধ এবং বেশিরভাগই নিশ্চিহ্ন।

‘পদ্মশ্রী’ উদ্বোধন হয় ১৯৬০ সালে। ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠীর ‘চাওয়া-পাওয়া’ ছবি দিয়ে জয়যাত্রা শুরু হয় ‘পদ্মশ্রী’ সিনেমা হলের। উত্তম-সুচিত্রার বড় হোর্ডিং পড়েছিল হলের সামনে। বাড়ির কাছে ছবি দেখার স্বপ্নপূরণ হয়েছিল টালিগঞ্জ গড়িয়া চত্বরের মানুষদের। ষাট-সত্তর-আশির দশকে রমরম করে চলেছে এই হল। জয় জয়ন্তী, সন্ন্যাসী রাজা, সোনার কেল্লা, ক্ষ্যাপা ঠাকুর, আলো আমার আলো, ছোট বউ– একের পর এক ছবির হাউসফুল বোর্ড ঝুলেছে এই হলে।

আবার পুরনো সব বাংলা ছবিও রিলিজ হত পদ্মশ্রীতে। সেসব ছবিও হাউসফুল চলত, যা আজকাল কেউ ভেবেও দেখে না। ইউটিউব, ওটিটি থাকলেও বড় পর্দায় ছবি দেখার মজাই আলাদা।

করোনা আবহের আগেই এইসব স্থানীয় হলগুলো ধুঁকছিল ভাল ছবি আর দর্শকের অভাবে। শেষ অবধি টালিগঞ্জ-গড়িয়ার প্রায় সবকটি হলই উঠে গেল চিরতরে।
পদ্মশ্রী সিনেমা হল হবে না শপিং মল, নাকি মাল্টিস্টোরিড হবে, তা যিনি কিনবেন তাঁর ইচ্ছানুসারেই হবে। গড়িয়ার ‘দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ’-এর ছাত্রছাত্রীরাও কলেজ ফেরত ভিড় জমাতেন ‘পদ্মশ্রী’ সিনেমা হলে। আজ কলেজের প্রাক্তনীদেরও মন খারাপ, হল বিক্রির খবর শুনে।

সিঙ্গেল স্ক্রিন উঠে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রখ্যাত অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায় দ্য ওয়ালকে জানালেন, “সিনেমার ভাল-মন্দ ঠিক করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলে তাঁরাই বেশি যেতেন। কোন ছবি ভাল, কোন ছবি মন্দ সেটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দর্শক ঠিক করেন। কিন্তু ভাল বাংলা ছবির অভাব এবং আকাশছোঁয়া টিকিটের দামের কারণে সব হলে তাঁরা যেতে পারেন না। আবার সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোতে ভাল ছবি আসে না। হলের উন্নতিও হয়নি। মধ্যবিত্ত দর্শক বহুদিন ছবি দেখতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। এত টিকিটের দাম দিয়ে তাঁরা মাল্টিপ্লেক্সেও যান না। তাই প্রতিটি হল এভাবে উঠে যাচ্ছে।”

Madhabi Mukherjee and Ilish logo-6 | Pikturenama

প্রখ্যাত অভিনেতা চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, “বিক্রি করে আর কী হবে, সেই তো মাল্টিস্টোরিড হাইরাইজ বিল্ডিং হবে। সেদিন মিনি জয়াও তো পুড়ে গেল। জানা খবর আজকাল এগুলো। যেদিন থেকে সমালোচক মহল কমার্শিয়াল ছবিকে গালাগালি করে শেষ করে দিয়েছে, সেদিন থেকে সিঙ্গেল স্ক্রিন ধুঁকছে। সাতশো আটশো সিটের সিনেমা হলে সেরকম কমার্শিয়াল ছবি চাই। বাঙালি মধ্যবিত্তরা যেমন পারিবারিক গল্প ভালবাসতেন, সেসব ছবি তো আজকাল হয় না। আমার ‘মর্যাদা’, ‘কেঁচো খুঁড়তে কেউটে’, ‘সংসার সংগ্রাম’ ছবিগুলো তিন দফার শো-এ যেভাবে হাউসফুল চলেছে সমস্ত হলে, তা এখন কেউ ভাবতে পারবে না। সেরকম ছবি বানানো হোক। তাতে যদি হল বাঁচানো যায়। কী আর বাঁচাবে, করোনা এসে তো কফিনে শেষ পেরেক টা মেরে দিয়েছে।”

BigInterview Chiranjeet Chakraborty: Blaming others won't change your career graph, rather make you look like a jealous loser | Bengali Movie News - Times of India

পদ্মশ্রীর কর্মীরা জানালেন, “দর্শকের সেই ম্যাটিনি শো, ইভনিং শো এসব দেখার জন্য সিঙ্গেল স্ক্রিনে সিনেমা দেখতে আসার অভ্যাসটাই চলে গেছে। তাঁরা বাড়ি বসে সিরিয়াল দেখেন। আবার মাল্টিপ্লেক্সে কতিপয় বাঙালি যান ছবি দেখতে নয়, নিজেদের স্টেটাস দেখাতে।”

তাহলে মূল কারণ কি এটাই, দেখনদারির যুগে ছোট ছোট সুখে খুশি থাকার চাবিটা বাঙালি হারিয়ে ফেলেছে? মহামারী-ধ্বস্ত, ব্যস্তসন্ত্রস্ত এক শহরের বুকে প্রশ্ন জাগিয়ে মিলিয়ে যেতে বসেছে পদ্মশ্রী।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More