কলকাতার পর্ন-ব়্যাকেটে জড়িয়ে বহু সাধারণ মেয়ে! উপার্জন দিয়ে শুরু, হুমকিতে আটকে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ রাজ্যের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সংখ্যক তরুণী উপার্জনের পথ খুঁজতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েছেন পর্ন ব়্যাকেটের জালে। খোদ কলকাতা শহরের পরিসংখ্যান থেকেই এই তথ্য জানা গেছে বলে সূত্রের খবর। সম্প্রতি নন্দিতা দত্ত গ্রেফতারি কাণ্ডে শহর তোলপাড় হলেও, নন্দিতারা আজতে বিচ্ছিন্ন চরিত্র নন এ শহরে, মনে করা হচ্ছে এমনটাই।

কেউ কেউ কম সময়ে বেশি রোজগার করার উপায় হিসেবে এই পথ ধরলেও, অনেকেই এইদুনিয়ায় এসে পৌঁছন মিথ্যের জালে জড়িয়ে। ভুল প্রতিশ্রুতিতে ফেঁসে গিয়ে, আর বেরোনোর উপায় থাকে না জাল কেটে। উঠতি মডেল বা অভিনেত্রীদের সঙ্গে এমনটা ঘটে হামেশাই। এক দিকে অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে পরিচয় ফাঁসের হুমকি– এই দুইয়ের মাঝে কখন যে পর্ন-দুনিয়ার মুখ হয়ে ওঠেন তাঁরা, নিজেরাই যেন বুঝে উঠতে পারেন না।

গতকালই দুই মডেলের অভিযোগের ভিত্তিতে নিউটাউন থেকে ধরা পড়েছে নন্দিতা দত্ত। ধৃত নন্দিতা দত্ত দীর্ঘদিন ধরেই পর্নোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি নতুনদের এই পেশায় আনারও কাজ করতেন। প্রথমে সাধারণ শুটিং বা অর্ধনগ্ন শুটিং হত। পরে মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে করা হত পর্নোগ্রাফি। এরসঙ্গে কলকাতার অপরাধ জগতের যোগাযোগ থাকতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।

তার কয়েকদিন আগেই অর্ধনগ্ন ছবি তুলে ভাইরাল করে দেওয়ার অভিযোগে প্রতাপ ঘোষ ও জয়শ্রী মিশ্র নামে ২ জনকে গ্রেফতার করে বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানার পুলিশ। ২০ মার্চ বিধাননগর সেন্ট্রাল পার্কে তরুণীর ছবি তোলেন প্রতাপ। মেক আপের দায়িত্বে ছিল জয়শ্রী।

পরপর এই দুটি কেসের পরে পুলিশ বলছে, এঁদের সকলেরই উদ্দেশ্য এবং কাজের ফাঁদ পাতার ধরন মোটামুটি একই। বিধাননগর কমিশনারেটের এক পুলিশকর্তার কথায়, “সোশ্যাল মিডিয়ায় মূলত বিছানো হয় প্রতারণার জাল। একটু নামকরা ফোটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার, মেকআপ আর্টিস্টদের দিয়ে হয় ফোটোশ্যুটের প্রস্তাব দেওয়া হয় বা ওয়েব সিরিজে অডিশন দেওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়। প্রথমে হয়তো খুব সাধারণ কোনও স্ক্রিপ্টও পড়ানো হয়। তার পরেই ‘বোল্ড কনটেন্ট’-এর নাম করে একটু একটু করে কাজে লাগানো হয় তাঁদের। যদি কোনও ভাবে কেউ রাজি না হন, তাহলে হয় টাকা চাওয়া হয় শ্যুটের জন্য, নাহলে হুমকি দেওয়া হয় নানারকম। এই করতে করতেই পর্ন দুনিয়ায় জড়িয়ে যাচ্ছেন বহু সাধারণ মেয়ে।”

জয়শ্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগও এমনটাই ছিল। সোদপুরের বাসিন্দা, পেশায় মডেল এক তরুণী বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় অভিযোগ জানান, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় জয়শ্রী মিত্র নামের এক মহিলার সঙ্গে। জয়শ্রী নিজেকে মডেল হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

তরুণীর দাবি, জয়শ্রী তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেন টেলিভিশন জগতে সুযোগ পাইয়ে দেবেন। তার জন্যে তাঁকে একটি ফোটোশুট করাতে হবে। সেই ফোটোশুটের জন্যই জয়শ্রী ওই তরুণীকে প্রতাপ ঘোষ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করায়। এর পরেই সল্টলেক অঞ্চলে একটি স্টুডিওতে ওই যুবতীর অর্ধনগ্ন কিছু ছবি ও ভিডিও তোলে  দুই অভিযুক্ত।

তরুণী জানিয়েছেন, তিনি এতে রাজি না হলেও, জয়শ্রী ওই তাঁকে বারবার আশ্বস্ত করেছিলেন যে সেই ছবি বা ভিডিও বাইরে কোথাও প্রকাশ পাবে না। নিছক কাজের জন্যই এই ফোটোশুট। তবে তার কিছু দিনের মধ্যেই ওই মডেল দেখতে পান, বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর অর্ধনগ্ন ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরেই অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।

পুলিশ তদন্তে জানতে পেরেছে, সল্টলেক, নিউটাউন, বাগুইআটি এলাকার বহু গেস্টহাউসে দিনের পর দিন এইসব পর্ন শ্যুটের কাজ চলছে। এই কনটেন্টগুলি দেশের বাইরে বিভিন্ন অ্যাপে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। দেশেও বিভিন্ন অ্যাপ, টাকার বিনিময়ে ইনস্ট্রাগ্রাম লাইভ ও নিষিদ্ধ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখানো হয় ওইসব পর্নোগ্রাফি।

এক সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকের কথায়, “এর আগেও আমরা নিউটাউনের একাধিক গেস্টহাউস থেকে বিভিন্ন চক্রকে ধরেছি, শ্যুটিং করার সময়ে। এবার আবার নতুন করে হানা দেওয়া শুরু হয়েছে গেস্টহাউসগুলিতে।”

কয়েক দিন আগেই বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেট্টির স্বামী তথা অভিজাত শিল্পপতি রাজ কুন্দ্রাকে গ্রেফতার করেছে মুম্বই পুলিশ। পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত ছবি বানানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। জানা গেছে, লন্ডনের এক ফার্মের হয়ে কাজ করতেন রাজ কুন্দ্রা। তাঁর এক আত্মীয় ওই বিদেশী ফার্মের মালিক। তার জন্যেই ভারতীয় পর্ন কনটেন্ট তৈরি করতেন কুন্দ্রা। এখানে পর্ন শ্যুট করে লন্ডনে তা পাঠানো হত। সেখানেই পর্ন-অ্যাপে আপলোড করা হতো সেগুলি।

তবে প্রশাসনের খাতা উল্টে দেখা গেছে, মহারাষ্ট্রের সাইবার সেলের কাছে রাজ কুন্দ্রার বিরুদ্ধে ভূরিভূরি অভিযোগ জমা পড়েছে পর্নোগ্রাফিতে বিভিন্ন মহিলাকে যুক্ত করার জন্য। এমনকি পুনম পাণ্ডে, শার্লিন চোপড়ার মতো অভিনেত্রীর অভিযোগও আগেই পেয়েছে সাইবার সেল!

বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখে জানা যায়, বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পর্ন কনটেন্টগুলি তৈরি করা হত বিভিন্ন উঠতি অভিনেত্রী ও মডেলদের নিয়ে। তারপর তা বিদেশের কোনও এক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা হত। সাতদিন পরে সেগুলি আপনা থেকেই ডিলিট হয়ে যেত বলে জানিয়েছে পুলিশ। সূত্রের খবর, প্রতিটি পর্ন প্রোজেক্টের জন্য নাকি দুই থেকে আড়াই লক্ষ টাকা করে দেওয়া হত মডেল-অভিনেত্রীদের।

কলকাতার বুকেও তেমনটাই হতো কিনা, এই চক্রের শিকড় কত গভীরে ছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More