ব্যবসা তলানিতে, নামের সঙ্গে ‘ঢাকা’ জুড়ে টিকে আছে শতক পেরনো সাধনা ঔষধালয়

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো : ১০৫ বছরের পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানের চমক এখন ম্লান। বহুদিন আগেই তলানিতে ঠেকেছে ব্যবসা। কমছে প্রাণবায়ু। হাল ধরার মতো কেউ নেই। জরাগ্রস্ত হয়েও তবু কোনওরকমে টিকে রয়েছে সাধনা ঔষধালয় ঢাকা। যদিও ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক অনেকদিন আগেই চুকেবুকে গেছে। তবুও সংস্থার নামের সঙ্গে এখনও জুড়ে রয়েছে ঢাকার নাম। একসময় এখানকার সারিবাদি সালসা, মৃতসঞ্জীবনী সুরা, বিউটি ক্রিম, দশনা সংস্কার, কূটজারিষ্ট, চ্যবনপ্রাশ, মকরধ্বজ, মহাদ্রাক্ষারিষ্ট–এর মতো ওষুধের খ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। যার বেশিরভাগই আর তৈরি হয়না।

কলকাতায় এখনও রয়েছে ‘‌সাধনা’‌র কয়েকটি দোকান। যেগুলি এখন শুধুই বাঙালির মেধা, উদ্যোগী মানসিকতা এবং সফল ব্যবসায়িক প্রচেষ্টার প্রায়–বিস্মৃত ইতিহাস আঁকড়ে কোনওরকমে টিকে রয়েছে।

শহরের অনেক মোড়ে এখনও হঠাৎ চোখে পড়ে সাধনার তৈরি মৃতসঞ্জীবনী সুরার আদ্যিকালের মলিন, ছেঁড়া ব্যানার। দেশজুড়ে এখনও প্রায় ১৩০টি দোকান। এরাজ্যে গোটা তিরিশ। কিন্তু বেশির ভাগ দোকান বছরের অধিকাংশ দিন বন্ধ থাকে।

কলেজস্ট্রিটের সাধনার দোকানের বয়স প্রায় ৯০ বছর। সামনে বইখাতা আর কার্ডের দোকানের ত্রিপলে ঢাকা পড়েছে সাধনার টিনের সাইনবোর্ড। দূর থেকে বোঝাই যায়না। জং ধরা কোলাপসিবল গেট। সেখানে তিরিশ বছর ধরে কাজ করছেন তপন ভট্টাচার্য। বললেন, ‘‌আশির দশক পর্যন্ত ছিল সংস্থার রমরমা। ১৯৯৫ সাল থেকেই ব্যবসা কমতে শুরু করে। এ পার বাংলায় প্রথম কারখানা তৈরি হয় ১৯৪৮–এ দক্ষিণদাঁড়িতে। রেজিস্ট্রি হয় ১৯৫২ সালে। সেই কারখানা এখন ভগ্নপ্রায়। বড়-বড় থামওয়ালা বাড়ি পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপের মতো।’‌ জানালেন, ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০১২ পর্যন্ত সংস্থার ওষুধ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। কারণ সরকারি নির্দেশে কারখানা এবং ওষুধ উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ প্রয়োজন ছিল। তবে কর্মীদের বেতন বন্ধ হয়নি কোনওদিন।

বিউটি ক্রিম কিনতে এসেছিলেন বেহালার যুবক সায়ন্তন। জানালেন, তাঁর মা এই আয়ার্বেদিক ক্রিম ছাড়া ব্যবহার করেন না। সায়ন্তন জানতে চাইলেন দশন সংস্কার মাজন আছে কি না। তপনবাবু এনে দিলেন। একসময় এই গুঁড়ো মাজনের কৌটো হত টিনের। এখন তা প্লাস্টিকের কৌটোয় পাওয়া যায়। তপনবাবু বললেন, ‘‌এই মাজন খুব জনপ্রিয় ছিল। একসময় পেস্ট হিসেবেও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু চলেনি। সবাই এটা গুঁড়ো মাজন হিসেবেই চায়।’‌

দোকানের ধুলোজমা শো–কেশে সাজানো রয়েছে আমলকী রসায়ন, পত্রাঙ্গাসব, অশোকারিস্ট, ভাস্কর লবন চূর্ণের মতো বিভিন্ন ওষুধ। কলেজস্ট্রিট ছাড়াও দোকান রয়েছে গড়িয়াহাট, বালিগঞ্জ, কালীঘাট, খিদিরপুরে। সেগুলোর অবস্থাও খারাপ। কলকাতায় সংস্থার অফিস ঠনঠনিয়ার শিবানী মার্কেটে। বহুপুরোনো সেই অফিসের মেঝেতে কয়েক ইঞ্জি পুরু ধুলো জমে রয়েছে। আসবাবপত্রও ভাঙচোরা। বৃষ্টি ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে। ভিজে যায় কাগজপত্র। কর্মী মাত্র তিনজন। সেখানকার এক কর্মী পঞ্চানন বললেন, ‘‌কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় এক সময় মোট পাঁচটা কারখানা ছিল ‘সাধনা’–র। দক্ষিণদাঁড়ির পর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একে একে লেক টাউন, টালিগঞ্জ, কাশীপুর ও বেলুড়ে কারখানা হয়।। কিন্তু এখন টিমটিম করে চালু শুধু দক্ষিণদাঁড়ির কারখানা। সংস্থাকে নিয়ে আরও কারও মাধাব্যাথা নেই।’‌

শোনা যায়, ঢাকায় সাধনার ওষুধ কারখানায় সুভাষচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, চিকিৎসক নীলরতন সরকারের মতো অনেকে গিয়েছেন। ‘সাধনা’-র জ্বরের ওষুধের অন্যতম ক্রেতা ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ওষুধ খেয়ে ফল পেয়ে যোগেশচন্দ্রের ছেলে নরেশচন্দ্রকে ধন্যবাদ দিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন তিনি। ১৯৫০-৬০’এর দশকে বিদেশেও প্রচুর ওষুধ রফতানি হত। সবই এখন ইতিহাস।

সংস্থার কর্ণধার যোগেশচন্দ্রের ছেলে নরেশচন্দ্রের দুই ছেলে, এক মেয়ে। দুই ছেলেই মারা গেছেন। মেয়ে শীলা বেঁচে আছেন। উনিই এখনকার স্বত্ত্বাধিকারী।

ভারতের আয়ুর্বেদিক ওষুধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আজ আলোচনা। কেন্দ্র সরকার দেশীয় আয়ুর্বেদের উন্নয়নে নজর দিয়েছেন। পতঞ্জলীর মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিদেশের বাজারে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। কিন্তু এ সব কিছুর অনেক আগে, স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, চিন–এ আয়ুর্বেদিক ওষুধের বিপুল বাজার তৈরি করেছিলেন এক বাঙালি। রসায়নের শিক্ষক ও গবেষক যোগেশচন্দ্র দত্ত। অবিভক্ত বাংলার ঢাকা থেকে সেই ওষুধ রফতানি হত বিদেশে। ইতিহাসবিমুখ বাঙালি তাঁ ভুলে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর ‘‌সাধনা’‌ এখনও চলছে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.