বখতিয়ার খলজির সমাধি বাংলার এই গ্রামেই, কেউ খাটে ঘুমোলেই নাকি বিপদ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইতিহাসকে ঘিরে বয়ে চলে জনশ্রুতি। আর তাতেই বিশ্বাস করেন গ্রামবাসীরা। সে বিশ্বাস যেন কুসংস্কারেরই নামান্তর! তবে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর ব্লকের নারায়ণপুর পঞ্চায়েতের পীরপাল গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এসব মোটেই কুসংস্কার নয়, সম্মান।

কী সেই সম্মান! না আজ পর্যন্ত সে গ্রামে কাঠের তৈরি চৌকি বা খাটে কেউই ঘুমোন না। তাঁরা ঘুমোন মাটিরই তৈরি ঢিপির উপরে অথবা সটান মাটিতেই। কাঠের খাটে ঘুমোনো মানা তাঁদের। তা করলে নাকি মৃত্যু হতে পারে!

এলাকার গ্রামবাসী ও ইতিহাসবিদের মুখে শোনা যায়, ১৭০৭ সালে এই পীরপাল গ্রামের মাটিতেই সমাহিত করা হয় বখতিয়ার খলজির দেহ। এর পরে তিনি দেবতা পীর রুপে আবির্ভূত হন বলে বিশ্বাস গ্রামবাসীদের। বীর যোদ্ধা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে যে মাটিতে সমাহিত করা হয়েছে, তার উপরে কাঠের তৈরি খাটে বা চৌকিতে ঘুমোলে গ্রামবাসীদের স্বপ্নে মৃত্যুর আদেশ আসে বলে রয়েছে জনশ্রুতি!

সত্যি-মিথ্যা যাই হোক, এই ভয়ে বিগত কয়েকশো বছর ধরেই পীরপাল গ্রামের মানুষরা কাঠের তৈরি চৌকি বা খাটে ঘুমোন না। বলা হয়, কেউ যদি কাঠের তৈরি চৌকি বা খাটে ঘুমোন, তাহলে নাকি সেই পরিবারের সকলে অসুস্থ হয়ে পড়েন! তবে ইতিহাসবিদের দাবি, বখতিয়ার খলজিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই গ্রামবাসীরা মাটিতে ঘুমোন।

দেখুন ভিডিও।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর, তপন, হরিরামপুর সহ বিভিন্ন এলাকাই নানা ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত। এর মধ্যে গঙ্গারামপুর এলাকার পীরপাল অন্যতম। জেলার ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানান, ১৭০৭ সালে সুলতানি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে বখতিয়ার খলজি পরাজিত রপেন পাল বংশের লক্ষ্মণ সেনকে। তার পরে তিনি সংগ্রামপুর, দেবী কোর্ট-সহ গোটা গৌড় দখল করে নেন। লক্ষ্মণ সেন প্রাণ নিয়ে তৎকালীন বঙ্গে পালিয়ে যান এবং তাঁর সৈন্যরা পরাজিত হয়ে নদিয়া শহর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

এই জয়ের পরে বখতিয়ার খলজি তিব্বত ও কামরূপ অভিযানে যান। সেখানে বিফল হয়ে বখতিয়ার খলজি দেবীকোটে ফিরে আসেন। এই বিফলতা এবং সেই সঙ্গে তাঁর সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতির ফলে লখনৌয়ের মুসলিম রাজ্যের প্রজাদের মধ্যেও বিদ্রোহ ও বিরোধ দেখা দিতে শুরু করে। এর ফলে বাংলার ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলোও দিল্লির সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধের আগে থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে নানা চিন্তা এবং পরাজয়ের গ্লানিতে বখতিয়ার খলজিও অসুস্থ ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এর অল্প কিছুদিন পরেই বাংলার ১২০৬ বঙ্গাব্দে ও ইংরেজির ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃতদেহ পীরপালে সমাহিত করা হয়।

পীরপাল গ্রামের বাসিন্দা নাটারু রায় জানান, চৌকি বা খাটে ঘুমোলে স্বপ্নাদেশে তাঁদের ভয় দেখানো হয়। বাপ-ঠাকুরদার সময় থেকেই তাঁরা গল্প শুনে আসছেন, রাতে চৌকি বা খাটে শুলে স্বপ্নে ঘোড়া ছোটার আওয়াজ পাওয়া যায়। খাট থেকে ফেলে দেয় কেউ। আর এরপর সেই পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পীরপাল গ্রামের এক গৃহবধূ পিঙ্কি দেবশর্মা জানান, তাঁরা মাটিতে ঘুমোন। কেউ কেউ মাটি দিয়েই উঁচু করে ঢিপির মতো খাট বানিয়ে নেন।

বখতিয়ার খলজি তথা পীর বাবাকে ভগবান বলে মেনে প্রতি বছর বৈশাখ মাসে বড় করে মেলা বসে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ দেখতে আসেন সেই মেলা। কিন্তু পীরবাবার যে দরগা ঘিরে এই মেলা, তার আজ করুণ দশা। সরকার থেকে পর্যটন কেন্দ্র করা হবে বলেও আজও কোনও হেলদোল নেই। ধীরে ধীরে ভগ্নদশায় পরিণত হচ্ছে পীরের দরগা।

তবে এই বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে সেই জেলার ইতিহাসবিদ সমিত ঘোষের। তিনি বলেন, তিব্বত ও কামরূপ অভিযানের পর বখতিয়ার খলজি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর সেনাপতি আলিমর্দান খলজির হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। তবে যেহেতু তিনি বীর যোদ্ধা ছিলেন, তাই তাকে সম্মান জানাতেই পীরপালের মানুষ মাটিতে ঘুমোয়।

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এমন ঘটনাকে গোটা দুনিয়া কুসংস্কার বললেও, পীরপাল গ্রামের মানুষ ভয়ে বা শ্রদ্ধায় বংশ পরম্পরায় মেনে চলেছে এই প্রথা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More