যোগীই হলেন মোদী নম্বর টু, রাজনীতিতে বিজেপি ও সংঘের দীর্ঘমেয়াদের আমানত

0

অমল সরকার

এ বছরের গোড়ায় দিন কয়েকের জন্য লখনউ গিয়েছিলাম। দেশের একাধিক বড় শহরের সাংবাদিকদের লখনউতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল যোগী আদিত্যনাথের সরকার, তাদের বিগত চার বছরের কাজকর্মের খতিয়ান তুলে ধরতে। আগামী বছর মার্চে হিন্দি বলয়ের সবচেয়ে বড় রাজ্যটিতে বিধানসভার নির্বাচন। ইতিমধ্যেই তা নিয়ে জোর তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছে। দিল্লি-লখনউ যাতায়াত বেড়ে গিয়েছে বিজেপি নেতাদের। প্রধানমন্ত্রী দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে হামেশাই উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের শিলান্যাস, উদ্বোধন করছেন। সপ্তাহখানেক আগে নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র বারাণসীতে সশরীরে গিয়েও গুচ্ছ প্রকল্পের শিলান্যাস, উদ্বোধন করে এসেছেন নরেন্দ্র মোদী। বলাই বাহুল্য, মুখ্যমন্ত্রীর ব্যস্ততাও কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছে। রবিবার মির্জাপুরে এক অনুষ্ঠানে যোগীর অতিথি ছিলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখানে যোগীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি। অন্যদিকে, যোগী তাঁর সরকারের কাজকর্মের বিশদ বর্ণনা দেন অনুষ্ঠানে।

যে সফরের কথা বলছিলাম, তাতে একদিন ভিন্ রাজ্যের সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হন যোগী। ৪৫ মিনিটের সেই সাক্ষাৎকার পর্বে একবারের জন্যও নরেন্দ্র মোদীর নাম মুখে আনেননি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, রাজনাথ সিং থেকে শুরু করে মধ্যপ্রদেশের চারবারের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, গুজরাটের প্রবীণ মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানি, কর্নাটকে সদ্য মুখ্যমন্ত্রীর গদি থেকে অপসারিত বিএস ইয়েদুরাপ্পাদের টুইটার হ্যান্ডেল-সহ সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মগুলিতে নজর দিলে দেখা যাবে নিয়ম করে নরেন্দ্র মোদীর ভজনায় ব্যস্ত তাঁরা। দলের বাকি নেতা-মন্ত্রী, এমপি, এমএলএ-রাও বাদ নেই। এমন সময়ে শুধু সেদিনের আলাপ-পর্বেই নয়, সামগ্রিক ভাবেই ব্যতিক্রম বলতে গেলে একজন, যোগী আদিত্যনাথ। ইদানীং খানিক সুর বদলালেও কয়েক মাস আগে পর্যন্ত যোগীর মুখে মোদীর নাম খুব একটা শোনা যেত না। সেই যোগীকেই এখন প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে।

সেই সফরে একটা কথা খুব কানে বেজেছিল। যোগীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অনেকেই কথায় কথায় বলছিলেন, প্রাইম মঙ্ক অফ ইন্ডিয়াই একদিন প্রাইম মিনিস্টার অফ ইন্ডিয়া হবেন। যোগীকে তাঁরা ‘প্রাইম মঙ্ক (পিএম) অফ ইন্ডিয়া’ বলে থাকেন এবং বিশ্বাস করেন, এই সাধুই একদিন লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা তুলবেন।

Yogi Adityanath dethrones Didi, voted best chief minister in Mood of The Nation Poll - Web Exclusive News - Issue Date: Aug 26, 2019

ক্ষমতাবান লোকের চারপাশে চাটুকারের অভাব হয় না। যোগীর চারপাশেও তেমন লোকজনের ভিড় অস্বাভাবিক নয়। তবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে দেখতে চাওয়ার বাসনা নিছকই চাটুকারিতা নয়। বরং এটা এখন স্পষ্ট, যে যোগীকে নিয়ে সংঘ পরিবার দীর্ঘ মেয়াদের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। আগামী কয়েক দশকের জন্য খুবই সুচিন্তিত ভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে গেরুয়া বসনধারী এই সাধুকে।

সেই পরিকল্পনার প্রাথমিক আঁচ পাওয়া গিয়েছিল ২০১৭ সালে, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে সংঘ পরিবার এই সাধুকে লখনউয়ের তখতে বসিয়ে দেওয়ায়। পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, হালের কিছু পদক্ষেপ।

যেমন ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশ ভেঙে তৈরি হওয়া উত্তরাখণ্ডে এ পর্যন্ত ১০ জন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁদের সাত জনই বিজেপির। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন একমাত্র কংগ্রেসের প্রয়াত নারায়ণ দত্ত তেওয়ারি। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের কারও কারও মাত্র কয়েক মাস মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার সৌভাগ্য হয়েছে। অথচ, এমন নয় যে জাতীয় রাজনীতিতে রাজ্যটির বিরাট গুরুত্ব আছে। বিধানসভা ৭০ আসনের। লোকসভার আসন মাত্র চারটি। তাহলে সেখানে ঘন ঘন মুখ্যমন্ত্রী বদল হচ্ছে কেন? বিজেপির বক্তব্য, পারফরমেন্সের মানদণ্ডেই এই পদক্ষেপ। যে কারণে কর্নাটকে প্রবীণ ইয়েদুরাপ্পাকে সরতে হল। এই নীতি তথা কৌশলের কারণে ভোটের আগে ত্রিপুরায় মুখ্যমন্ত্রী বদল অসম্ভব নয়।

বিজেপির এই বক্তব্য মানতে হলে আবার উত্তরপ্রদেশের হিসেব মিলছে না। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি ম্যাগাজিনের সাম্প্রতিক সংখ্যায় বিজ্ঞাপন ক্রোড়পত্রে যোগী আদিত্যনাথকে ‘কর্মযোগী’ বলা হয়েছে। কিন্তু ক’দিন আগে পর্যন্ত বিজেপির অন্দরেই এ নিয়ে ঘোর মতবিরোধ ছিল। বছরের গোড়ায় সেই লখনউ সফরে তার আঁচ আমিও পেয়েছিলাম। সরকারি হিসেবপত্রও বলছে, আগের সমাজবাদী পার্টির সরকার অর্থাৎ অখিলেশ যাদবের মুখ্যমন্ত্রিত্বের পাঁচ বছরের তুলনায় যোগীর সময়ে উত্তরপ্রদেশে গড় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) অনেকটা কমে গিয়েছে। উন্নয়নের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ধারণে জিডিপি হল অন্যতম মানদণ্ড। এছাড়া, ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলার সমস্যা, সামাজিক বিভাজন, ধর্মীয় বিদ্বেষ বৃদ্ধি, নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর নিপীড়ন, পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বারেবারেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে বিজেপি নেতৃত্বকে।

Yogi Adityanath remains firmly at the top as best performing CM: MOTN - MOOD OF THE NATION News

অমিত শাহর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে বাংলায় কথায় কথায় কেন্দ্রীয় টিম পাঠিয়েছে, উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে বোবা-কালার ভূমিকা নিয়েছে। এ শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ নয়। নানা ঘটনায় বিজেপির অভ্যন্তরেও যোগীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ চাপা থাকেনি। শুধুই কি প্রশাসন পরিচালনায় ব্যর্থতা? দেশের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও নির্বাচনেই এই গেরুয়াধারীকে প্রচারে হাজির করে বিজেপি। বাংলাতেও এসেছেন বারেবারে। এবারের বিধানসভা ভোটেও ছিল সরব উপস্থিতি। কিন্তু কোথাও তিনি দলকে জেতাতে পারেননি। তবু যোগীতেই আস্থার বান ডেকেছে বিজেপিতে।

যদিও যোগীকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে, এমন আলোচনাও ইতিউতি শোনা গিয়েছে মাস কয়েক আগেও। সেই খবর নিয়ে কথায় কথায় দিল্লির একটি হিন্দি কাগজের রাজনৈতিক সংবাদদাতা বলেছিলেন, প্রয়োজনে মোদীকে মাঝপথে সরিয়ে অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করার কথা ভাবতে পারে সংঘ পরিবার। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী বদলের সম্ভাবনা বিন্দুমাত্র নেই। আর রবিবার তো স্বয়ং অমিত শাহ খাস লখনউতে দাঁড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যোগীকে ঢালাও সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

তার আগেই অবশ্য দিল্লির সেই সাংবাদিক বন্ধুর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। গত মাসের গোড়ায় যোগীর দিল্লি সফরের পরই দল স্পষ্ট করে দেয়, আদিত্যনাথের নেতৃত্বেই ২০২২-এর বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করবে দল। গো-বলয়ের বৃহত্তম রাজ্যটিতে দল ও সরকারের কাজকর্ম এবং সংঘ পরিবারের ভূমিকা ইত্যাদির চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, গোরখনাথ মঠের গেরুয়া বসনধারী এই মহন্ত বা প্রধান পুরোহিত আসলে রাজনীতিতে বিজেপির দীর্ঘমেয়াদের আমানত।

yogi adityanath in happy mood | Khabar Devbhoomi

কারণ, নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে রামজন্মভূমি বিতর্কের নিষ্পত্তি করে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এক বছর আগে, মোদী অযোধ্যায় গিয়ে রামমন্দিরের শিলান্যাস করে এসেছেন। তার আগের বছর অগস্টে সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিলোপ ঘটিয়ে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার কাজটিও সেরে ফেলেছে তারা। তালাক বিরোধী আইন করে মুসলিম মহিলাদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজটিও করে ফেলা হয়েছে। তার উপর মোদীর বয়সও হচ্ছে। তাই তিনি ক্ষমতায় থাকতে থাকতে বিজেপির নতুন নেতা ও নয়া ইস্যু দরকার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে এগোতেই যোগীর জন্য স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট একপ্রকার দলীয় বাধ্যবাধকতা।

কারণ, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা জানেন, উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল। তাই যোগীর সঙ্গে জুড়ে আছে তাঁদেরও ভাগ্য। এমন অবস্থায় ঝুঁকি নেওয়া তাঁদের পক্ষে কঠিন। কিন্তু বিজেপির অন্দরের খবর, গুজরাট জুটির আপত্তি অগ্রাহ্য করেই যোগীতেই আস্থা রাখার নিদান দিয়েছেন সংঘের শীর্ষ নেতৃত্ব। মোদীকেও তাই দলের মুখ চেয়ে বলতে হচ্ছে ‘জয় যোগী’। ক্রমশ দলের মুখ্যমন্ত্রীদের সামনে তাঁকেই তুলে ধরা হচ্ছে মডেল হিসেবে, যেভাবে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে মোদীকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল বাকিদের।

গো-হত্যা বন্ধ এবং তথাকথিত লাভ জেহাদ আটকাতে নয়া ধর্মান্তকরণ প্রতিরোধ আইনের মতো যোগী সরকারের বিতর্কিত পদক্ষেপগুলি বিজেপি শাসিত বাকি রাজ্যগুলিকেও এক এক করে অনুসরণ করতে হয়েছে। এই জন্য জেপি নাড্ডার নির্দেশে ওই সব রাজ্যের মন্ত্রী-আমলাদের লখনউ ছুটতে হয়েছিল। অথচ বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায় মধ্যপ্রদেশে চারবারের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, গুজরাটের বিজয় রূপানি, হরিয়ানায় মনোহরলাল খট্টরের মতো প্রবীণ মুখ্যমন্ত্রীরা রয়েছেন।

ধর্মান্তকরণ প্রতিরোধ আইন সংক্রান্ত আলোচনায় ভিন্ রাজ্যের সাংবাদিকদের যোগী সেদিন বলেছিলেন, ‘আমি যে কানুন বানিয়েছি, আগামী দিনে গোটা ভারত তা অনুসরণ করবে।’ হালে যোগীকে দিয়েই সংঘ পরিবার এবং বিজেপি একেবারে ঘুম ভাঙিয়ে বিপদের খবর দেওয়ার মতো করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে গেল গেল রব তোলায়। উত্তরপ্রদেশের ল-কমিশনের সুপারিশ জমা পড়ে গিয়েছে। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা অধীর অপেক্ষায় আছেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যোগী কোন দাওয়াই বাতলান। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বোঝাই যাচ্ছে, জন্মনিয়ন্ত্রণেও কোনও হিন্দুত্ববাদী মডেল সময়ের অপেক্ষা।

যোগীর কর্মধারা খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, হিন্দুত্ব, গরিবের মসিহাঁ, কঠোর প্রশাসক এবং পরাক্রমশালী— এই চারটি বিষয়কে হাতিয়ার করে এগোচ্ছেন তিনি। বিজেপি বুঝেছে, মোদীর নিজের রাজ্যেও দ্বিতীয় নরেন্দ্র মোদী তৈরির সু়যোগ নেই। উত্তরপ্রদেশ ছাড়া সে সুযোগ নেই কোনও রাজ্যেই। সেখানে হিন্দুত্বের পোস্টার বয় যোগী আদিত্যনাথ আছেন আর গো-বলয়ের ওই রাজ্যটিতেই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় পাঁচ কোটি মুসলমানের মাস। তাই হিন্দুত্বের ল্যাবরেটরিকে সেখানেই সময়োপযোগী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি।

UP govt will make law to curb 'Love Jihad': Yogi Adityanath

অযোধ্যায় রাম মন্দিরের শিলান্যাস করেছেন নরেন্দ্র মোদী। উদ্বোধনও করবেন তিনি, এমনই পরিকল্পনা। কিন্তু অযোধ্যার দেওয়ালে যোগীর নাম খোদাই হয়ে যাচ্ছে মন্দির শহরটিকে ঘিরে পরিকল্পনায়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উন্নত রেল পরিষেবা, চওড়া এক্সপ্রেসওয়ে, পাঁচতারা হোটেল, সব মিলিয়ে এক লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে যোগী সরকার।

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে বারেবারে প্রশ্নের মুখে পড়ে নজর ঘোরাতে যোগীর গ্যাংস্টার প্রিভেনশন অ্যাক্টে মাফিয়াদের ১১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিয়েছেন। তাঁর দাবি, ‘দুর্নীতি, দাদাগিরি বন্ধ করতে আমার সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে চলছে।’

সেই সঙ্গে, কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যে ভাল রাস্তা প্রয়োজন তা কে না জানে। কিন্তু রাজ্যের পাঁচটি এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ নিয়ে যোগীর ব্যাকুলতাকে অনেকেই মনে করছেন, তা শুধুই উন্নয়নের সহজ অঙ্ক নয়, আছে রাজনীতির পাটিগণিতও। অনেকেই বলছেন, ২০১৭-তে গোরখপুর থেকে লখনউ, এই ২৭২ কিলোমিটার পথ যোগী কার্যত উড়ে চলে এসেছিলেন। কিন্তু লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা তোলার লক্ষ্য পূরণে রাজনীতির রাস্তা তাঁকেই তৈরি করে নিতে হবে। তাই এক্সপ্রেসওয়ে যোগীর রাজনীতির সড়ক।

নির্মীয়মাণ পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়ে, বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে, গোরখপুর লিঙ্ক এক্সপ্রেসওয়ে তো আছেই, অচিরেই কাজ শুরু হবে গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এবং ডিফেন্স করিডরের। এর মধ্যে শেষেরটি ভারত সরকারের প্রকল্প। আবার পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়েরও প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ যুদ্ধ বিমানের রানওয়ে হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে রাফাল বিমান নামবে। যোগী এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন তাঁর ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট’ প্রকল্প। এক্সপ্রেসওয়ের ধারেই তৈরি হচ্ছে সেগুলির ক্লাসটার। তা দেখিয়ে সব হাতে কাজ দেওয়ার স্বপ্ন বিলি করছেন তিনি।

যে রাজ্যটি বরাবর জাতীয় রাজনীতির নির্ধারক এবং যেখান থেকে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, সেই রাজ্যের চেহারায় উন্নয়নের ছাপ প্রত্যাশার অনেক নীচে। এই পরিস্থিতিতে গেরুয়া বসনধারী যোগী নিজেকে আধুনিক উত্তরপ্রদেশের রূপকার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। যেমন, একদা উন্নয়ন, শিল্পায়নের সুবাদে বছর বছর সেরা দশ মুখ্যমন্ত্রীর তালিকায় স্থান করে নিতেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার সেই সার্টিফিকেটেরই সফল বিপণন করেন ২০১৪-র লোকসভা ভোটে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী।

মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে আরও একটা কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন মোদী। পরাক্রমশালী ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে কথায় কথায় তাঁর মুখে চিন ও পাকিস্তানকে সমুচিত জবাব দেওয়ার কথা শোনা যেত। মনে হত তিনিই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অথবা সেনাপ্রধান।

ঘটনা হল, চিন, পাকিস্তানের প্রশ্নে এখন প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পাশাপাশি যোগীর বিবৃতিও দ্রুত সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে যায়। যোগীও নিজেকে পরাক্রমশালী হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টায় ফাঁক রাখছেন না। এক্সপ্রেসওয়েকে যুদ্ধ বিমানের রানওয়ে হিসাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত তেমনই একটি পদক্ষেপ সন্দেহ নেই। আবার নিজের এলাকা গোরখপুরে ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনের মতো অনুষ্ঠানেও চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ বিপিন রাওয়াতকে হাজির করান তিনি। সেনাধ্যক্ষর কাছে যোগীর নিমন্ত্রণ রক্ষা এতটাই গুরুত্ব পেয়েছে যে তিনি নেভি দিবসের অনুষ্ঠান পর্যন্ত এড়িয়ে যান। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যোগী আসলে মোদী নম্বর-টু।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.