সুন্দরবনে ছেলের সামনেই বাবাকে টেনে নিয়ে গেল বাঘ! খাঁড়িতে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে মর্মান্তিক কাণ্ড

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছেলের সামনে দিয়ে বাবাকে তুলে নিয়ে গেল ক্ষুধার্ত বাঘ। বাঘের মুখ থেকে তাঁকে উদ্ধার করা গেলেও শেষ রক্ষা হল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মৃত্যু হয় আনন্দ ধর (৫৭) নামে ওই মৎস্যজীবীর।

রবিবার সকালে সুন্দরবনের ঝিলা ২ নম্বর জঙ্গল লাগোয়া কাঁকসা খালে কাঁকড়া ধরতে গিয়েই বাঘের কবলে পড়েন আনন্দ। অসতর্ক মুহূর্তে ক্ষুধার্ত বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে টেনে নিয়ে যায়।

গত ২৬ মে ইয়াসের তান্ডবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জঙ্গল সহ সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা। জলোচ্ছ্বাসের জেরে খড়কুটোর মত ভেসে যায় ঘরবাড়ি, চাষের ক্ষেত। সেই বিধ্বস্ততার জের এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। সরকারি এবং বেসরকারি সাহায্যের উপর নির্ভর করেই দুর্গত পরিবারগুলো কোনও মতে টিকে রয়েছে।

চরম আর্থিক সংকটে পড়ে বাধ্য হয়েই সুন্দবরনের গভীর জঙ্গলের খাঁড়িতে মাছ, কাঁকড়া ধরতে যাচ্ছেন অনেকে। অতিরিক্ত উপার্জনের আশায় প্রাণের ঝুঁকির কথাও ভাবছেন না তাঁরা। আর তার জেরেই একের পর এক প্রাণ চলে যাচ্ছে বাঘের হানায়।

জানা যায়, এদিন সকালে সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের কালিদাসপুর গ্রামের মৎস্যজীবী আনন্দ ধরও সুন্দরবনের নদী খাঁড়ির উদ্দেশ্যে নৌকা ভাসিয়ে ছিলেন।

সঙ্গে ছিলেন ছেলে অমিত এবং প্রতিবেশী শচীন মন্ডল। দাঁড় টানা নৌকা বেয়ে তাঁরা পৌঁছে যান সুন্দরবনের ঝিলা ২ নম্বর জঙ্গলের কাঁকসা খালে। তারপর নৌকা থেকে নেমে পারে বসে আপন মনে কাঁকড়া ধরছিলেন তিন জনে।

জানা যায়, কাঁকড়া ধরার নেশায় আনন্দ দলছুট হয়ে বেশকিছুটা সামনে এগিয়ে গেছিলেন। সেইসময় জঙ্গল বেরিয়ে একটা ক্ষুধার্ত বাঘ যে আনন্দ’র উপর কঠোরভাবে নজর রাখছিল সেটা তিনি ঠাহর করতে পারেননি। এরপরই বিপদ ঘনায়।

আনন্দকে নাগালের মধ্যে পেয়েই সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঘ। আনন্দ’র ঘাড়ে থাবা বসিয়ে টানতে টানতে গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রাণভয়ে আর্তনাদ করে ওঠেন আনন্দ। আর সেই চিৎকার শুনেই মাথা তুলে তাকান সঙ্গী দুই মৎস্যজীবী। ছুটে এসে আনন্দকে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেন তাঁরা।

কাঁকড়া ধরার শিক নিয়েই শুরু হয় বাঘে-মানুষে মরনপণ লড়াই। দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ মিনিট রুদ্ধঃশ্বাস লড়াইয়ের পর ক্ষুধার্ত বাঘ বেগতিক বুঝে রণে ভঙ্গ দেয়। শিকার ছেড়ে পালিয়ে যায় সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে।

এরপর গুরুতর জখম অবস্থায় আনন্দকে কোনওরকমে নৌকায় তোলা হয়। চিকিৎসার জন্য নৌকা বেয়ে তড়িঘড়ি গ্রামের উদ্দেশ্য পাড়ি দেন অমিত এবং শচীন।

কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নেতিয়ে পড়ছিলেন আনন্দ। গ্রামে পৌঁছানোর আগে নৌকাতেই তিনি মারা যান। শেষে বাবার মৃতদেহ আগলে কান্নায় ভেসে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছন অমিত। খবর চাউর হতেই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

উল্লেখ্য, গত ১জুন গোসাবার লাহিড়ীপুর পঞ্চায়েতের চরঘেরীর বাসিন্দা মৎস্যজীবী ভগবতী মন্ডলও ঝিলা ৪ নম্বর জঙ্গলে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারায়। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও একই দুর্ঘটনা।

সুন্দরবন এলাকায় মাছ ধরতে কিংবা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ দিয়েছেন এমন পুরুষের সংখ্যা কম নয়। ব্যাঘ্র-বিধবাদের নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে চলেছেন বাসন্তী ব্লকের শিবগঞ্জ চম্পা মহিলা সোসাইটির কর্ণধার তথা বিশিষ্ট সমাজসেবী অমল নায়েক।

তিনি জানিয়েছেন “সুন্দরবন জঙ্গলে বাঘের আক্রমণে প্রতিনিয়ত মৃত্যু মিছিল বেড়েই চলেছে। স্বামী হারিয়ে বিধবা হচ্ছে অসংখ্য মায়েরা। তাছাড়া বর্তমানে জলোচ্ছ্বাসে সমগ্র সুন্দরবন জলমগ্ন। মানুষ যেমন সবকিছু হারিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে, তেমন জঙ্গলের বাঘও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত। অনাহারে দিন কাটছে। উভয়ই বাঁচতে চাইছে।সুন্দরবনে দরিদ্র মৎস্যজীবীদের জন্য সরকার অবিলম্বে বিকল্প আয়ের সংস্থান না করলে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মৃত্যু মিছিল কমবে না।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More