মালদার খুনে মেয়ের স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত আকাঙ্ক্ষার বাবা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উদয়ন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আমাদের সঙ্গে কয়েকদিন কাটায়। ওর কথায় তখনও মনে হয়নি, আমাদের মেয়েকে সে খুন করে নিজের বাড়িতে পুঁতে রেখেছে। নিজের বাবা-মা’কেও একইভাবে খুন করে দেহ পুঁতে রেখেছে শোনার পর ওর চেহারা, কথাবার্তার সঙ্গে এসব ঘটনাকে মেলাতেই পারছিলাম না। শনিবার পাটনার বাড়ি থেকে টেলিফোনে বলছিলেন শিবেন্দ্রকুমার শর্মা। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মী বাঁকুড়া থেকে পাকাপাকিভাবে পাটনা ফিরে গিয়েছেন।

বাঁকুড়া থেকেই আইনজীবী অরুণ চট্টোপাধ্যায় বলছিলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উদয়ন তিনটি নয়, আরও অনেকগুলি খুন করেছে। মালদহে সন্তানের হাতে পরিবারের চারজনের খুনের ঘটনাটি শোনার পর শনিবার বিকালে দুজনেই আক্ষেপ করছিলেন, এমন খুনিদের আগাম চিনতে পারার কোনও উপায় কি বের করা যায় না!

এপর্যন্ত একাধিক খুনের মামলা লড়েছেন প্রবীণ আইনজীবী নবকুমার ঘোষ। কলকাতার বিডন স্ট্রিটে ভাইয়ের হাতে দাদা খুনের ঘটনাটি বলছিলেন তিনি। দাদাকে খুন করে ঘরের দেওয়াল খুঁড়ে দেহ রেখে প্লাস্টার করে দিয়েছিল ভাই ও তার স্ত্রী। অবিবাহিত দাদা স্টেট ব্যাঙ্কে চাকতি করতেন৷ মাসখানেক তিনি অনুপস্থিত থাকায় বাড়িতে লোক পাঠায় ব্যাঙ্ক। পাড়ায় জানাজানি হয়৷ ভাইয়ের কথায় অসঙ্গতি পেয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তে জানা যায়, অবিবাহিত দাদাকে খুন করে গোটা বাড়ির দখল নিতে ভাই এবং ভাইয়ের বউ তাদের দুই আত্মীয়কে নিয়ে খুনের চক্রান্ত করে। এক রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর দাদাকে কম্বলচাপা দিয়ে খুন করে ভাই ও ভাই বউ।

ওই ঘটনায় সরকারের নির্দেশে অভিযুক্তদের হয়ে মামলা লড়তে হয়েছিল নবকুমারবাবুকে। শনিবার তিনি বলছিলেন, নিম্ন আদালত তিনজনকেই ফাঁসির সাজা দেয়৷ তাঁর বক্তব্য, বেশিরভাগ খুনের পেছনেই থাকে সম্পত্তি বিবাদ, পারিবারিক রেষারেষি এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ক ঘিরে সংঘাত। তাঁকে সবচেয়ে অবাক করেছে সাধারণ নিরীহ মানুষের হাতে নৃশংস খুনের ঘটনা, যা অনেক পেশাদার খুনিকেও হার মানায়। আর অবাক করেছে এই সব খুনিদের ভাবলেশহীন প্রতিক্রিয়া।

২০১৭-র অক্টোবরে মধ্যপ্রদেশের ভোপালের সাকেতনগরের একটি দোতলা বাড়ি থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছিল আকাঙ্ক্ষা শর্মার কঙ্কাল। বছর আঠাশের আকাঙ্ক্ষা সোশ্যাল মিডিয়ায় উদয়ন দাসের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আমেরিকায় চাকরি করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রথমে দিল্লি, পরে ভোপাল গিয়েছিল। সেটা ২০১৬-র ঘটনা। শিবেন্দ্রকুমার বলছিলেন, ‘কিছুদিন মেয়ের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ ছিল। তারপর সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’

থানাপুলিশ করার আগে এক বন্ধুর পরামর্শে শর্মা পরিবার গিয়েছিল সরকারি আইনজীবী অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। তিনি পুলিশকে আকাঙ্ক্ষার ফোন নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করতে বলেছিলেন৷ বাঁকুড়া পুলিশ জানতে পারে, ভোপালের সাকেতনগর এলাকায় তখনও সক্রিয় ফোনটি। বোঝা যায়, আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে অন্য কেউ সেটি ব্যবহার করছে। বাঁকুড়া পুলিশ শিবেন্দ্রকুমারের কাছ থেকে অপহরণের অভিযোগ রুজু করে ভোপাল যায়। ছবি দেখে আকাঙ্ক্ষাকে চিনতে পারেন সাধারণ মানুষ। আটক করা হয় উদয়নকে। জেরার মুখে সে স্বীকার করে, আকাঙ্ক্ষাকে সে খুন করেছে। তার বাড়ির দোতলার মেঝেতে একটি ট্র‍্যাঙ্কের মধ্যে দেহটি রেখে তার উপর কংক্রিটের বেদি বানিয়ে রেখেছিল। জেরার মুখে বছর তিরিশের যুবক উদয়ন স্বীকার করে নিজের বাবা-মাকেও সে খুন করে দেহ পুঁতে রেখেছে ছত্তিশগড়ের বাড়িতে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে ডেথ সার্টিফিকেট আদায় করে মায়ের নামে বাবার পেনসনও ভোগ করছিল সে।

আকাঙ্ক্ষা খুনের বিচার হয়েছিল বাঁকুড়ার আদালতে। উদয়নের যাবজ্জীবন সাজা হয়। অরুণবাবু বলছিলেন, ‘উদয়নের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছিলাম, খুন করে টাকাপয়সা লোপাট করে বেঁচে থাকাই ছিল তার উদ্দেশ্য। অমন তুখোড় বুদ্ধির ঠাণ্ডা মাথার খুনি খুব কম দেখেছি। আমি নিশ্চিত ও আরও অনেককে খুন করেছে।’ ভোপাল পুলিশের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট অরুণবাবু ও আকাঙ্ক্ষার বাবাও।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More