ঝাঁচকচকে হাসপাতাল হল বটে, কিন্তু স্বাস্থ্যে আমরা পিছিয়েই গেলাম

১৯৯১। প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও। অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। সে বছর ২৪ জুলাই ভারতের সংসদে মনমোহন তাঁর পেশ করা বাজেট প্রস্তাবে দেশকে অর্থনীতির নয়া সড়কে চালিত করার কথা বলেছিলেন। যার মূলে ছিল উদারনীতি, বিলগ্নিকরণ, বিশ্বায়ন। লক্ষ্য ছিল, নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায় কমিয়ে আনা। সাদা চোখেই বোঝা যায়, ’৯১ পরবর্তী ভারত সম্পূর্ণ পৃথক এক দেশ। উদার অর্থনীতির তিন দশকের সফরে কোথায় পৌঁছল সেদিনের ভারত। চোখ রাখুন দ্য ওয়াল-এ…

 

অরিজিতা দত্ত

তিন দশক আগে ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে যখন ভারতবর্ষে নতুন অর্থনীতির ঘোষণা হল তখন সামনের দিনে কেমন পরিবর্তন হবে, অর্থনীতি কোন দিকে যাবে, বৈদেশিক নীতি কোন পথে বইবে এই নিয়ে অনেক অনেক বিতর্কের অবতারণা হয়েছিল। ত্রিশ বছর বাদে যখন অতিমারীর অভিঘাতে বাকি সব জাগতিক ও সামাজিক হিসেব নিকেশ ধুলোয় লুণ্ঠিত, যেখানে বেঁচে থাকাটাই প্রধান প্রতিপাদ্য দেশের অধিকাংশ মানুষের, তখন এ প্রশ্নটা একবার জিজ্ঞেস করেই দেখি ‘সবাই কি ভাল আছি?’ পরিবর্তনের হাওয়ায় দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগলো? ত্রিশ বছরের একমাত্রিক অর্থনৈতিক নীতি, মূলতঃ যা উদারপন্থা আর বিশ্বায়নের ওপর নির্ভর করে দেশের সব আঙ্গিকে কায়েম হল, তার ফলটা কেমন হল? অমৃতময় নাকি নীল বিষে জর্জরিত? ফিরে দেখার এই আখ্যানে আজ আসুন আলোচনা করি স্বাস্থ্যের অবস্থা। অতিমারীর আবহে এই অংশকেই অগ্রাধিকার দেওয়া যাক আজকের লেখায়।

স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে ভারতবর্ষের স্বাস্থ্যনীতি মূলত রচিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ভোরে কমিটি রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে। এই রিপোর্টে উচ্চ কণ্ঠে বলা হয়েছিল স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবা সকলের প্রাথমিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাই ধনী, গরিব নির্বিশেষে সবার জন্যে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করাটা সরকারি দায়ের মধ্যে বর্তায়। তাই প্রথম থেকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ বেশি হবার কথা বলা হল। অনিবার্যভাবে আমাদের পথিকৃৎ হল সুইডেন, রাশিয়া, কিউবার মতো ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণমুলক রাষ্ট্রগুলি। অথচ সর্বস্তরের মতোই এই পথিকৃতদের দেখানো পথে পদানুসরণ করলেও, দিশাহীন গন্তব্যের কারণে আমাদের স্বাস্থ্যনীতি দিকভ্রান্ত পথিকের মতোই হতোদ্যম হয়ে পড়ল। সরকারি চিকিৎসা প্রয়োজনের জন্যে অপ্রতুল হয়ে দেখা দেওয়ার কারণেই বোধহয় যা কিছু সরকারি তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠল। নীতিগত ভাবে অবিশ্বাস্য গতিতে কমানো হল স্বাস্থ্যে সরকারি বিনিয়োগ। ১৯৯১ সালে যেখানে জিডিপির ২.১৮% সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় খরচ হত, ২০০০ সালে সেটা কমে দাঁড়াল ০.৮%। ২০১০-২০১৪ সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে সেটা ১.২৮% পৌঁছলো। উন্নত দেশগুলি তো বটেই, ভারতের থেকে এ ব্যাপারে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো গরিব দেশগুলিও। সারা পৃথিবীতে মাত্র ১০টির মতো দেশে সরকারি স্বাস্থ্য বিনিয়োগ এর চেয়েও কম, যা আমাদের পক্ষে সত্যিই লজ্জাজনক।

একের পরে এক নীতি দলিলে এই পরিমান অন্তত ২% করার কথা বলা হলেও কোনও সরকারই তাতে খুব একটা কর্ণপাত করলেন না। এর সঙ্গে এবার খোঁজ করা যাক যেটুকু যা বরাদ্দ হয় সেই টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ করা হয়? প্রধানত টাকাটা খরচ হয় সরকারি কর্মীদের বেতন জোগাতে আর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যে। অবাক হতে হয় এটা দেখে যে জনস্বাস্থ্য বা যে পরিষেবাগুলি রোগ প্রতিরোধের জন্য দেওয়া দরকার, সেই খাতে স্বাস্থ্যে মোট সরকারি বিনিয়োগের মাত্র ৯% খরচ করা হয়। তার আবার সিংহভাগ আবার খরচ হয় টিকাকরণ আর পরিবার পরিকল্পনার কর্মসূচিতে। অর্থাৎ সাধারণ রোগ প্রতিরোধের জন্যে চারপাশ পরিষ্কার রাখা, মশা তাড়ানো, স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা ইত্যাদির জন্যে সরকারের খরচ অত্যন্ত সীমিত ও অসংগঠিত।

বিদেশী অর্থ সাহায্য ও নীতির পথনির্দেশই সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, দেশের সত্যিকারের প্রয়োজন তাদের নজরে পড়ে না খুব একটা। এদেশে ম্যালেরিয়া, টিবি, কুষ্ঠ ইত্যাদি আলাদা আলাদা রোগের জন্য বরাদ্দ সরকারি বিনিয়োগ প্রচুর হ্রাস পেয়েছে গত তিন দশকে। এই অবস্থায় করোনার মতো ভয়ঙ্কর সংক্রমণ ভারতকে পুরোপুরি কাবু করে ফেলবে এতে অবাক হবার খুব কিছু আছে কী? দিল্লির পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার গবেষণা অনুসারে এদেশে শুধু করোনা পরীক্ষার জন্যে যে বিপুল ব্যক্তিগত টাকা খরচ করতে হয়েছে, সে অঙ্কটা অবিশ্বাস্য।

এই প্রসঙ্গে মনে রাখা জরুরি যে স্বাস্থ্য পরিষেবার বাজার কিন্তু আর কয়েকটা বাজারের মতো সহজ চাহিদা-জোগানের তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে না। যেহেতু এই বাজারে লুকিয়ে থাকে বাহ্যিকতা (externality), তথ্যের অসামমিতি (information asymmetry) এবং অনিশ্চয়তা (uncertainty), তাই এই বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বাজার ব্যর্থতার দিকে হাঁটতে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় বৈষম্যের বৃদ্ধি।

যাই হোক, ১৯৯১ এর পর থেকে সরকারি হাসপাতালে অনেকক্ষণ লাইন দিতে হয় বলে একথা ভাবা শুরু হল না যে আরও সরকারি হাসপাতাল ও ডাক্তার চাই। বরং জনসাধারণের সরকারি জিনিসের প্রতি বিরক্তির সুযোগ নিয়ে ১৯৯১ এর নতুন নীতি বোঝাতে চেষ্টা করল বেসরকারিই ভাল। শরীর খারাপ হলে প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তার দেখাও, প্রাইভেট নার্সিং হোমে ভর্তি হয়ে যাও। সেখানে চিকিৎসা ভাল হয় কিনা পরখ করার উপায় না থাকলেও আতিথেয়তা চমৎকার। গত ত্রিশ বছরে তাই ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের মানুষ চিকিৎসার জন্যে প্রথম পছন্দ রেখেছে বেসরকারি উদ্যোগকে। ৯০ এর দশক থেকে ক্রমাগত ডাক্তার দেখানোর জন্যে এবং মাতৃকালীন চিকিৎসা ও সন্তান প্রসবের জন্যে গ্রাম ও শহর উভয় জায়গার মানুষ আস্থা রাখছেন বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিকে। এক্ষেত্রে খুব মনে রাখা প্রয়োজন যে বেসরকারি ব্যবস্থা মানেই সমজাতীয় মানের চিকিৎসা নয়। ভারতে এই ধরনের চিকিৎসা কেন্দ্রের মধ্যে আছে ছোট ও বড় নার্সিং হোম, অনেক বড় স্পেশালিটি হাসপাতাল, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া হাতুড়ে ডাক্তারদের চিকিৎসাকেন্দ্রে। ফলত এদের চিকিৎসার গুণমান ও অনেক আলাদা, দাম ও নিয়মানুবর্তিতা ও পৃথক। মুনাফার জন্যে অনেক বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রেই ক্রমাগত টেস্ট ইত্যাদি করানো হয় যার অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়। ১৯৯২-৯৩ সালের জাতীয় পরিবার ও স্বাস্থ্য জরিপ (ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে )-১ এর তথ্য অনুযায়ী বেসরকারি কেন্দ্রে প্রসবের সময় সিজার করার সম্ভাবনা ১২.৩% ছিল। যেটা ক্রমাগত বেড়ে হয়েছে ২০১৫-’১৬ সালে চতুর্থ জরিপে দেখা যায় ৪০.৯% হয়েছে। এই তুমুল বৃদ্ধির অনেকটাই পরিকল্পিত এবং অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করে স্বয়ং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

১৯৯১ এর পরে আরও একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা গেল কর্পোরেট হাসপাতালের বাড়বাড়ন্তে। বহুজাতিক ও ভারতীয় কর্পোরেট সংস্থাগুলি এদেশে বিশাল আকারের হাসপাতাল খুলে বসল যেখানে অত্যন্ত উন্নত মানের আধুনিক চিকিৎসা মিলতে শুরু করল। অত্যন্ত দামি মেশিন ও বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ডাক্তার ও অন্যান্য চিকিৎসা কর্মী নিয়ে সেই হাসপাতালগুলো এদেশে বিরাট ব্যবসা শুরু করল। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষ, যারা সরকারি হাসপাতালের ভিড় ও অপরিষ্কার অবস্থা এড়িয়ে চলতে চায়, তারা অনেকেই সেখানে ভিড় করল। এবং সত্যি কথা বলতে এতে তাদের সুবিধাই হল। যেহেতু তারা এই অত্যন্ত দামি চিকিৎসা করানোর আর্থিক ক্ষমতা রাখে, তাই তাদের জন্যে এই যন্ত্র নির্ভর পাশ্চাত্য রীতির চিকিৎসা প্রণালী আদৃত হল অনেকাংশে।

কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি বিষয় মনে রাখা দরকার। প্রথমত, এই বিলাসবহুল চিকিৎসা শুধুমাত্র কতিপয় মানুষের কাছে গৃহীত হলেও, দেশের অধিকাংশ মানুষের সেগুলির সুবিধা নেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থা নেই। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ বড় হাসপাতালগুলিকে রাজ্য সরকারগুলি নানা ধরণের সুবিধা প্রদান করে। অত্যন্ত কম দামে, বা বলা যায় প্রায় বিনামূল্যে তাদের জমি দেওয়া হয়। বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রের ওপর কর মকুব করা হয়। আবার তাদের মুনাফার ওপর প্রদেয় করেও ছাড় দেওয়া হয়। শুধু একটি শর্ত আরোপ করা হয় যাতে মোট শয্যার একটি ছোট অংশ দরিদ্র রোগীদের জন্যে রাখার কথা থাকে। ২০০০ সালে করা একটি সার্ভেতে কিন্তু দেখা গেছে যে দিল্লিতে এই ধরনের সুবিধা নিয়ে যে সমস্ত কর্পোরেট হাসপাতাল চালু হয়েছে, তারা কেউই কোনও শর্ত মানেনি এবং প্রথম কয়েক বছরে কোনও ফ্রি চিকিৎসা দরিদ্রদের দেয়নি। অর্থাৎ, সরকার নানা ভাবে তাদের উৎসাহিত করলেও তারা পরিবর্তে কোনও শর্তসাপেক্ষ কাজগুলি করেনি। এর ফলে ক্ষতি হয়ে দেশের আম জনতার।

কর্পোরেট হাসপাতালে উন্নত মানের চিকিৎসা পাবার ফলে আর একটি নতুন ঘটনা গত তিন দশকে দেখা গেল। বিশ্বায়নের হাত ধরে যখন পরিষেবায় আমদানি রফতানি সহজ হয়ে গেল, প্রচুর দেশ থেকে মানুষ চলে আসতে লাগলেন এই সব নামি হাসপাতালগুলিতে, যেখানে তাদের মেডিকেল ট্যুরিস্ট বা স্বাস্থ্য পর্যটকের তকমা দেওয়া হল। প্রতিবেশী দেশ তো বটেই, পাশ্চাত্য দেশ থেকেও মানুষ পৌঁছে গেলেন মুম্বই, দিল্লি, আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু ও কলকাতার কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে। বিদেশ মন্ত্রক বিশেষ ভিসা মঞ্জুর করতে শুরু করল এই বিশেষ পর্যটনের সুবিধার্থে। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবার অত্যন্ত মূল্যবান রশদ ব্যবহার করতে লাগলেন অন্য দেশের নাগরিকরা। এতে ভারতের বিদেশি মুদ্রা আয় বাড়ল ঠিক, কিন্তু দেশের মানুষ এই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হলেন। এই মেডিকেল ট্যুরিজম আসলে দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে করা পরিষেবার রফতানি যা একান্ত ভাবেই বিশ্বায়নের দ্বারা সম্ভব হল।

সব শেষে আসি সামাজিক বিমা যা আমাদের দেশে আনা হয়েছে গত দুই দশক যাবৎ। প্রথমে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বিমা যোজনা, পরে আয়ুষ্মান ভারত নামে যে দুটি পরিকল্পনা রয়েছে তাদের মূল উদ্দেশ্য হল স্বাস্থ্য পরিষেবা নিতে গিয়ে যে পরিমান টাকা পকেট থেকে খরচ হয় সেটা অনেক অংশে হ্রাস করা এবং তার দ্বারা আর্থিক ক্ষতি ও ঋণগ্রস্ততা বিশেষ করে কমানো। অর্থাৎ ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে বিনামূল্যের সরকারি পরিষেবা জনসাধারণ পায় না বা নেয় না। এই পরিকল্পনাগুলিতে পরিবারের সকলের চিকিৎসার জন্যে কার্ড দেওয়া হয় যা নিয়ে সরকারি/বেসরকারি যে কোনও জায়গায় গিয়ে চিকিৎসা করলে কোনও টাকা লাগে না (পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত )। এই বিমার অর্থ মেটায় বিমা সংস্থা ও সরকার। আর সরকার তাতে জামিনদার থাকে। এখনও পর্যন্ত তথ্য অনুসারে কেরল ও বিহার ছাড়া সমস্ত রাজ্যগুলিতে জনসাধারণ এই বিমা ব্যবহার করে বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে বা হাসপাতালে। অর্থাৎ সরকারি জামিনে বেসরকারি চিকিৎসার এক বিপুল চাহিদা সৃষ্টি করেছে এই ধরনের পরিকল্পনাগুলো। অথচ গবেষণা জানায় যে যারা এই বিমা বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে ব্যবহার করছে , তাদের আর্থিক সুরক্ষা একদমই বাড়েনি কারণ এই চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিতে এমন অনেক খরচ করতে হয় যা এই বিমার আওতায় পড়ে না। তারা চিকিৎসা কেন্দ্র অবধি পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু আর্থিক সুরক্ষা মোটেও পায়নি। বরং, বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষত, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি, যেখানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রচুর, সেখানে এই সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে। অথচ এই অর্থ ও উৎসাহ যদি সরকার স্বয়ং পরিষেবা দেবার জন্যে খরচ করত, তাহলে জনসাধারণ সবাই তার থেকে প্রভূত উপকৃত হতে পারতো।

উপসংহারে বলি যে যে কোনও দেশের সরকার তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তিন ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। পরিষেবা দেওয়া, অর্থ সাহায্য করা আর স্বাস্থ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। ১৯৯১ সালের নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বাজারের মাহাত্মকে প্রাধান্য দেওয়া হল। অন্য সব জিনিসের বাজার আর স্বাস্থ্য পরিষেবার বাজারের চরিত্রগত বিরাট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য পরিষেবাকে একই ভাবে ভাবা হল ও সরকারি অংশগ্রহণ কমিয়ে ফেলা হল। উপর্যুপরি বাজেট অনেক কমিয়ে সরাসরি সরকারি পরিষেবার আওতা থেকে কমিয়ে আনা হল প্রায় সমস্ত রকম চিকিৎসা আর সম্পূর্ণ অবহেলিত হল জনস্বাস্থ্য। উল্টোদিকে অত্যন্ত দামি প্রযুক্তিগত আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা চালু হল কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে, যা সাধারণ উচ্চবিত্তেরও প্রায় অধরা। সরকারের অল্প বিনিয়োগের একটা বড় ভাগ দেওয়া হল পরিষেবার অর্থায়ন করতে, যাতে আবার উপকৃত হল সেই বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আর তৃতীয় দায়িত্ব বা বাজার নিয়ন্ত্রণও ক্রমাগত শিথিল হতে থাকল। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। নানা সুবিধা দেওয়া শুরু হল বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার দিকে ভারত গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে না থাকল খুব একটা বেশি বিকল্প, না থাকল টাকার জোগান। ঠিক এই সময়ে করোনা অতিমারী এসে চোখে আঙ্গুল দিয়ে সিস্টেমের দুর্বলতাগুলো দেখিয়ে গেল। জনস্বাস্থ্যের চূড়ান্ত অবহেলার ফলে একবিংশ শতকের সংক্রমণ রোধে একমাত্র পথ নির্দেশ করতে পারল একশো বছর আগের পরিকল্পনা—কোয়ারান্টিন। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে টিকার জোগান ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যাভ্যাসের অভাব দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিল ‘ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞা যখন।’ গত তিন দশকের দিকভ্রান্ত স্বাস্থ্যনীতির বিষময় ফল এক মারাত্মক রূপে সামনে এল আমাদের। এরপরও যদি সমস্ত টিকা, পরীক্ষা ও আনুসাঙ্গিক করোনা চিকিৎসার খরচ রাষ্ট্র না বহন করে, তাহলে আগামী প্রজন্ম তাদের ক্ষমা করবে না, একথা নিশ্চিত।

(লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More