মমতা ‘প্রধানমন্ত্রী মুখ’ ধরে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি সফরেও আক্রমণে শান দিচ্ছে বিজেপি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ দিল্লি যাচ্ছেন। তিন দিনের সফরে সরকারি কাজের পাশাপাশি আগামী লোকসভা ভোটের কৌশল নিয়ে বিজেপি বিরোধী দলগুলির সঙ্গে বৈঠক করবেন।

সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী রাজধানী থাকাকালীন দিল্লিতে তাঁর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সরব হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিজেপি। রাজ্যে বেকারি এবং ভোট-পরবর্তী হিংসাকেই পাখির চোখ করে আপাতত মমতার বিরুদ্ধে গোটা দেশের নজর আকর্ষণ করতে চাইছে গেরুয়া শিবির। কারণ, তৃণমূল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করা হতে পারে ধরে নিয়ে বিজেপি তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্রে শান দিতে শুরু করেছে। তৃণমূল চাইছে বিজেপি বিরোধী দলগুলির মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই দলনেত্রীকে ওই পদের জন্য তুলে ধরতে। বিজেপি চাইছে সেই বোঝাপড়া গড়ে ওঠার আগেই মমতার বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর করে তা ভেস্তে দিতে। সরকারিভাবে ঘোষণা না করলেও গেরুয়া শিবির সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী দিল্লি থাকাকালীন বিজেপি সাংসদ ও বিধায়কেরা বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হতে পারেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচমকা দলের সংসদীয় প্রধান হওয়ার ঘোষণায় বিজেপি আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ লোকজনেরা বলে থাকেন, তাঁর এ হাতের কথা অন্য হাত আগাম জানতে পারে না। কতিপয় রাজনীতিক এবং আমলা এমন বিরল গুণের অধিকারী। তৃণমূল নেত্রীর সাম্প্রতিক দুটি সিদ্ধান্তে তা আর একবার প্রমাণিত হল। এক, আচমকাই তিনি তৃণমূলের সংসদীয় দলের নেত্রী হলেন। দ্বিতীয়টি হল, জহর সরকারকে তৃণমূলের রাজ্যসভার সদস্য করার সিদ্ধান্ত। রাজ্যের শাসক দলের অনেক নেতাই একান্তে বলেছেন তাঁরা সিদ্ধান্ত দুটি মিডিয়া থেকে প্রথম জেনেছেন।

লোকসভা বা রাজ্যসভার সদস্য না হয়েও সংদদীয় দলনেতা হওয়া যায়। সনিয়া গান্ধী কংগ্রেসে সভাপতি হওয়ার সময় সংসদের কোনও সদনেরই সদস্য ছিলেন না। কিন্তু দল তাঁকে সংসদীয় দলনেত্রী নির্বাচিত করে। আসলে এই পদটির সঙ্গে সংসদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনও সম্পর্ক নেই। আসল বিচার্য হল সিদ্ধান্তের পিছনে থাকা সমীকরণগুলি।

সনিয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেস বুঝিয়ে দিয়েছিল, বিজেপি যতই রাজীব পত্নীকে ‘বিদেশিনী’, ‘বিদেশিনী’ বলে গাল পাড়ুক না কেন তারা দলীয় সভানেত্রীকেই আগামীদিনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করবে।

২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস অবশ্য কাউকেই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেনি। কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল দল জিতলে সনিয়াকেই ওই পদে দেখা যাবে। তিনি যদিও মনমোহন সিংহকে প্রধানমন্ত্রী করেন। সে প্রসঙ্গ ভিন্ন।

তৃণমূল নেত্রীর সংসদীয় পার্টির দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগাম আঁচ করা না গেলেও এই ঘোষণায় তেমন চমক নেই। গত ২১ জুলাই দলের শহিদ দিবসের ভাষণে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘এবার শপথ চলো দিল্লি’। এই ঘোষণার অর্থ বুঝতে কোনও মানে বইয়ের দরকার পড়ে না। আর তৃণমূলের লক্ষ্য যদি হয় কেন্দ্রে সরকার গঠন তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করার আনুষ্ঠানিকতার আর কোনও প্রয়োজন পড়ে না।

এই সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়েছে, বিধানসভা ফল ঘোষণার পর পরই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা এবং মুকুল রায়কে পার্টিতে ফিরিয়ে নেওয়া। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে কলকাতার পাশাপাশি দিল্লিতেও মমতার ছায়াসঙ্গী ছিলেন মুকুল। বোঝাই যাচ্ছে মুকুল রায়কে অভিষেকের কোচের দায়িত্ব পালন করতে হবে। সব দলেরই সর্ব-ভারতীয় নেতা-নেত্রীর সঙ্গে মুকুলের সদ্ভাব আছে।

তৃণমূল নেত্রীর পরিকল্পনা আঁচ করেই দিলীপ ঘোষরা কোমর বেঁধে নেমে পড়তে চাইছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলার বেকাররা চাকরি পাচ্ছে না। ডোমের চাকরিকে ইঞ্জিনিয়াররা দরখাস্ত করছে, আর মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

যদিও একান্তে বহু বিজেপি নেতাই মানছেন, ২০২৪-এর লড়াইটা মমতা বনাম মোদী হলে প্রচার এবং ইস্যু নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। সেই কারণে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় কালক্ষেপ করছে না তারা। উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসের ইস্যুতেই দিল্লির ময়দানে তৃণমূল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। যেভাবে ২০১৪-র আগে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজিয়েছিল বিরোধীরা।

রাজনীতিতে মোদী ও মমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা হলেও পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে দু’জনের খানিক মিল আছে। নরেন্দ্র মোদী বয়সে বড় হলেও রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনায় নবীন। মমতা ১৯৮৪ সালে লোকসভার সদস্য হন। তার আগে ছাত্র ও যুব রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। সেখানে মোদী বিজেপিতে যোগ দেন ১৯৮৭-তে। কিন্তু মোদী যেমন, চা বিক্রিতা ছিলেন, মমতা বন্দোপাধ্যায়ও একটা সময় সরকারি দুধের ডিপোতে বসতেন। কমিশন বাবদ রোজগারের সামান্য অর্থ পরিবারকে দিতেন এবং রাজনীতির হাত-খরচ চালাতেন। মোদীর চা বেচার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়ার পর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুধের স্টুলে বসার বিষয়টি বাংলারও বেশিরভাগ মানুষ জানেন না।

আমেদাবাদ ছেড়ে মোদীর দিল্লির লালকেল্লা অভিমুখে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলেন ২০১২-তে চতুর্থবারের জন্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর। রাজ্যে দলকে ফের জিতিয়ে ঘন ঘন দিল্লি আসা শুরু করেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। সে যাত্রায় দিল্লির অভিজাত ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে মোদী বেকারি মুক্ত এক নতুন ভারত গড়ার স্বপ্ন ফেরি শুরু করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ’কে দুর্বল বলে পদে পদে কটাক্ষ করাও শুরু করেন। পরের বছর জুনেই বিজেপি তাঁকে সর্বভারতীয় প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে। সেটা ২০১৩-র জুনের ঘটনা। সবাই বুঝে যায়, গুজরাটের চারবারের মুখ্যমন্ত্রীই হতে চলেছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী মুখ। ফলে রাতারাতি ১৭ বছরের সম্পর্ক ছেদ করে এনডিএ ছাড়েন নীতীশকুমার।

নীতীশের বক্তব্য ছিল গুজরাট দাঙ্গায় কালিমালিপ্ত মোদীকে এনডিএ-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করা চলবে না। আসল রহস্য ছিল অন্য। নীতীশ নিজেই সেবার এনডিএ-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। যেমন সেই বাসনা প্রকাশ্যে না বললেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পাটনার কুর্সিতে তাঁর পূর্বসূরী লালুপ্রসাদ যাদব। ১৯৯৮ ও ১৯৯৯-এর লোকসভা ভোটে লালুপ্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নির্বাচনী ইস্তাহারে বলা হয়েছিল, ভোটের পর বিহারবাসীর জন্য দিল্লির কটনপ্লেসে চা খাওয়ার ব্যবস্থা হবে।

অতএব মুখ্যমন্ত্রীদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা নতুন কিছু নয়। চরন সিং, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং’রা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মুলায়ম সিং এবং মায়াবতী, উত্তরপ্রদেশের এই দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরও লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা তোলার বাসনা নিয়ে রাজনীতি করেছেন।

বলতে গেলে একপ্রকার ফোকটে প্রধানমন্ত্রী হন এইচডি দেবগৌড়া এবং আইকে গুজরাল। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনুরোধ এসেছিল জ্যোতি বসুর কাছে। ১৯৯৬-এ অটল বিহারী বাজপেয়ীর ১৩ দিনের সরকারের পতনের পর কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল তারা সিপিএমকে সরকার গড়তে বাইরে থেকে সমর্থন জোগাবে যদি তারা জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করে। কিন্তু জ্যোতি বসুর দল সেই প্রস্তাবে সায় দেয়নি। ফলে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না থাকা কর্নাটকের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী দেবগৌড়া এবং পরে তাঁরে সরিয়ে গুজরাল প্রধানমন্ত্রী হন।

২০১৪-র সঙ্গে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে গুণগত মিল এবং অমিল দুই-ই আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দিল্লির রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় হওয়ায় বিজেপি মনে করছে, চোদ্দর তুলনায় চব্বিশের লড়াই অনেক কঠিন হতে পারে। প্রথমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। দশ বছর আগে মোদীর প্রথম কাজ ছিল গুজরাটের বাইরে নিজেকে তুলে ধরা। পাশাপাশি উন্নয়ন, বিশেষ করে মমতার সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিগুলির জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে হাতিয়ার করে তৃণমূল তুলে ধরবে বেঙ্গল মডেল। যেমন মোদীর ছিল গুজরাট মডেল।

বিজেপির আসল চিন্তা গুজরাটে মোদী জমানার মতো বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের গায়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, এমনকী বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড, পুলিশের গুলিচালনার মতো বড় অভিযোগ নেই। তৃণমূলের এক নেতার কথায়, আমাদের জমানায় পুলিশের যে ক’টি বুলেট খরচ হয়েছে তার বেশিরভাগই ব্যয় হয়েছে প্রয়াত বিশিষ্টদের স্মৃতির প্রতি গান স্যালুট দিতে।

মমতা-মোদী সম্ভাব্য লড়াই নিয়ে আরও একটি বিষয় বিজেপিতে চিন্তায় ফেলেছে। বাংলায় বিধানসভার ভোটে দলকে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। ভোটের ফল বলছে বাংলার লড়াইয়ে মমতার কাছে মোদীর হার হয়েছে। সেদিক থেকেও ২০২৪-এর লড়াই তৃণমূল নেত্রীর কাছে তুলনামূলকভাবে মসৃণ।

এই পরিস্থিতিতে ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্রমশ দিল্লিতেও সুর চড়াতে শুরু করেছে গেরুয়া শিবির। আজ সোমবার মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি রওনা হওয়ার কথা। এই সফরে একদিকে যেমন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তৃতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়ে রাজ্যের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলবেন, তেমনই তৃণমূল সুপ্রিমো হিসাবে বিজেপি বিরোধী দলগুলির সঙ্গে কথা বলবেন ২০১৪-এর কৌশল নিয়ে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More