ভয়ানক বিশের পর আসছে একুশ, কী ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন নস্ট্রাদামুস

২০২১ সাল নিয়ে কী লিখে গিয়েছিলেন Les Prophéties বইটিতে!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ছোটখাটো চেহারার মজাদার ফরাসি মানুষটি সাঙ্কেতিক ভাষায় ভবিষ্যদ্বাণী করে তাক লাগিয়ে দিতেন মার্সেইয়ের মানুষদের। এলাকায় তাই মানুষটি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। তবে ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় হেনরিকে নিয়ে তাঁর এক ভবিষ্যদ্বাণী রাতারাতি মানুষটিকে বিখ্যাত করে দিয়েছিল। ১৫৫৫ সালে রহস্যময় সাঙ্কেতিক ভাষায় তিনি বলেছিলেন, “একজন অন্ধ মানুষ রাজা হবেন। মাত্র একবার লড়েই জোয়ান সিংহ বুড়ো সিংহকে যুদ্ধক্ষেত্রে হারাবে। সোনার খাঁচার ভেতর তার চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তারপর বুড়ো সিংহ মারা যাবে।”

এর মাত্র চার বছর পর, অসিযুদ্ধ অভ্যাস করার সময়, বিপক্ষের অসির ফলা সোনার হেলমেট ভেদ করে প্রবেশ করেছিল ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় হেনরি চোখে। প্রতিপক্ষ ছিলেন ‘কাউন্ট অফ মন্টোগোমারি’। রাজার থেকে তিনি বয়সে ছিলেন অনেক ছোট। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার দশদিন পর প্রয়াত হয়েছিলেন দ্বিতীয় হেনরি। মিলে গিয়েছিল ফরাসি চিকিৎসক ও জ্যোতিষী নস্ট্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণী।

নস্ট্রাদামুস

১৫৫৫ সালে নস্ট্রাদামুস লিখে ফেলেছিলেন দুনিয়া কাঁপানো Les Prophéties বইটি। সমকালীন ফরাসি ভাষায় Les Prophéties বইটি লেখা হলেও, সাঙ্কেতিক কবিতাগুলির মধ্যে ইতালিয়, গ্রিক, হিব্রু ও ল্যাটিন শব্দও পাওয়া গিয়েছে। চার ও ছ’লাইনের ৬৩৩৮টি অন্তমিলহীন সাঙ্কেতিক কবিতার মাধ্যমে আগামী ৩৭৯৭ বছরের ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। আগামী ৩৭৯৭টি বছরের প্রত্যেক বছরে সারা বিশ্বে কী কী ঘটনা ঘটবে, তারই ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন নস্ট্রাদামুস।

পৃথিবীর শেষ দিনটির বিষয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন তিনি। বলে গিয়েছেন, শেষের সেই দিনে পৃথিবী জুড়ে মহাপ্লাবন হবে। সেই মহাপ্লাবনের পরেই মহাকাশে উঠবে ধূমকেতুর ঝড়। সেই ঝড়েই ধ্বংস হবে পৃথিবী। অবশ্য তিনি কিছুটা সময় দিয়ে গিয়েছেন। বলে গিয়েছেন, পৃথিবীর শেষ দিনটি আসতে এখনও ৫০০০ বছর দেরি আছে।

নস্ট্রাদামুসের দুনিয়া কাঁপানো বই  ‘Les Prophéties’

নস্ট্রাদামুসের সাংকেতিক কবিতাগুলির ব্যাখ্যাকারেরা বলে থাকেন, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর সত্তর শতাংশই এ পর্যন্ত মিলে গিয়েছে। নস্ট্রাদামুস মিলিয়ে দিয়েছেন নেপোলিয়নের উত্থান, হিটলারের উত্থান ও পতন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, জন এফ কেনেডির হত্যা, চাঁদে মানুষের পদার্পণ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, সাদ্দামের উত্থান ও পতন, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হানা ও টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনাও।

এমনকি মিলিয়ে দিয়েছিলেন নিজের মৃত্যু নিয়ে করা ভবিষ্যদ্বাণীও। নস্ট্রাদামুস বলেছিলেন, শোয়ার ঘরের খাট ও টেবিলের মাঝে সন্ধ্যাবেলা তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যাবে। ১৫৬৬ সালের ২ জুলাই, বাষট্টি বছরের নস্ট্রাদামুসকে সত্যিই সন্ধ্যাবেলাতে মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তাঁর শোওয়ার ঘরের খাট ও টেবিলের মাঝের মেঝেতে।

২০২১ সাল নিয়ে সাংকেতিক ভাষায় কী লিখে গিয়েছিলেন নস্ট্রাদামুস! সে সবের অর্থ কী!

“দানিয়ুব ও রাইন নদীর জল খেতে আসবে উট। রোন উপত্যকায় কম্পন উঠবে। লুয়া নদী এবং আল্পসের কাছেও। মোরগ তাকে ধ্বংস করে দেবে।”

“সিয়েনার জমি ও সমুদ্র রক্তে লাল হবে। মার্সেই বন্দরে জাহাজ ও নৌকার ভিড় লেগে যাবে।”

“ঢালু জমিতে হবে অকল্পনীয় বিপর্যয়। পশ্চিমের জমি এবং লমবার্ডিতে।”

“জাহাজে আগুন লাগবে এবং প্রচুর মানুষ বন্দি হবে। মিলানের একজন সবাইকে কাছে টানবে, ডিউক লোহার খাঁচায় বন্দি হয়ে দেখবে।”

“পাহাড়ের ওপর পুর্ণিমার চাঁদ উঠবে। নতুন এক সুগন্ধি গাছ তার একলা মস্তিষ্ক নিয়ে দেখবে। অমরত্বের জন্য শিষ্যরা ডাকবে। চোখ থাকবে দক্ষিণের দিকে। হাত থাকবে বুকে। দেহ থাকবে আগুনের ওপর।”

“ঈশ্বরের শহরে বিরাট বজ্রপাত হবে। প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলার ফলে  দুই ভাই ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যাবে। দুর্গে মহান নেতা প্রাণ হারাবে। যখন বড় শহরটি জ্বলবে তখন তৃতীয় বড় যুদ্ধ শুরু হবে।”

“ওহে শক্তিমান নায়ক, কেন তুমি শয়তানির জন্য গর্ব কর। কেন তুমি সারাদিন ধরে গর্ব কর। ঈশ্বরের চোখে তুমি নিচেই আছো। তুমি ছলনার অভ্যাস কর। তোমার জিভ ধ্বংসের পরিকল্পনা করে। ধারাল ক্ষুরের মতো। তুমি ভালোর চেয়ে মন্দকে ভালোবাস। সত্যের চেয়ে মিথ্যাকে ভালোবাস।”

“শান্তি ও প্রাচুর্যের জন্য প্রশংসিত হওয়া স্থানটি তার রাজত্বে মরুভূমিতে পরিণত হবে। জলে ভাসবে মৃতদেহ। সৌভাগ্যকে সেখানে পুঁতে ফেলার অপেক্ষায় থাকবে।”

“আমি আকাশে আগুন দেখতে পাচ্ছি, যেটা তাদের ঘিরে ফেলবে। সূর্য ও মঙ্গল জুড়ে যাবে সিংহের সঙ্গে। তারপর সমাজে বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি হবে। গারন নদীতে একটি দেওয়াল ভেঙে পড়বে।”

“নতুনভাবে তৈরি হওয়া একজন সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেবে। অর্ধমৃত কিছু যুবক তাদের যাত্রা শুরু করবে। চমকে যাবে মানুষ। সুন্দর জায়গায় তার কুফল দেখা দেবে।”

“অস্থায়ীরাই সমাজে সম্মানিত হবে। পিতা মাতার মৃত্যু ঘটবে। তাঁরা অপরিসীম দুঃখে নিমজ্জিত হবেন। মহামারী হবে রাক্ষস। ভাল আর ভাল থাকবে না।”

“আকাশে ছুটবে বিশাল লেজ যুক্ত আগুনের গোলা। বিপর্যয়ের মালা ছুঁড়ে ফেলবে ইতিহাসে। বৃষ্টি, রক্ত, দুধ, দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ নাম লেখাবে।”

 সংকেতগুলির যে অর্থ ব্যাখ্যাকারেরা দিয়েছেন সেগুলি হল,

আরব দেশগুলির সঙ্গে পশ্চিমি দেশগুলির অশান্তি মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা ‘জৈব অস্ত্র’ তৈরি করে মানবজাতিকে জড়ভরতে পরিণত করবে। পুতিন হবেন সর্বশক্তিমান।

বন্দিদশায় মৃত্যু হবে কোনও এক রাষ্ট্রনেতার। এর ফলে দু’টি বন্ধু দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেঁধে যাবে। নৌযুদ্ধেও জড়িয়ে পড়বে দেশ দু’টি। ফলে শুরু হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

পৃথিবী চালাবে ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ২০২১ সালে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছুঁয়ে ফেলবে। হয়ত পেরিয়েও যেতে পারে।

কোনও এক দেশের সৈন্যদের মস্তিষ্কে সফলভাবে চিপ প্রবেশ করিয়ে তাদেরকে ‘আধা রোবট’ বানিয়ে দেওয়া হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে ‘আধা রোবট’ সেনারা হবে সাধারণ সেনার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

যন্ত্রসভ্যতা দখল করবে পৃথিবী। ভীষণভাবে কমে যাবে শ্রমিকের চাহিদা। কারণ মেশিন পয়সা চাইবে না। বিশ্রাম নেবে না। ছুটি চাইবে না। তাই শ্রমিক না নিয়ে রোবটের দিকে ঝুঁকবে সংস্থাগুলি। বিশ্বে বেকারত্ব ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়বে।

বিশ্ব অর্থনীতির পতন হবে। সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হতে পারে আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজার। (২০০৮ সালের ক্ষেত্রেও একই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন নস্ট্রাদামুস)

২০২১ সাল যুগান্তকারী হয়ে দাঁড়াবে মহাকাশ পর্যটনের ক্ষেত্রে। মহাকাশে বেড়াতে যাবেন সাধারণ মানুষও।

সমুদ্রের জলতল বাড়বে। সমুদ্রতটের কাছে থাকা নিম্নভূমি ডুবে যাবে জলের তলায়।

সূর্যের ভিতরে হতে থাকা বিস্ফোরণগুলি চরমসীমায় উঠবে। বিকল হতে পারে মহাকাশে ঘুরতে থাকা স্যাটেলাইটগুলি।

পৃথিবীকে বিশাল এক ধূমকেতু আঘাত করবে। এর প্রভাবে পৃথিবীতে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি ও অন্যান্য বিপর্যয় ঘটতে পারে।

শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে ক্যালিফর্নিয়া।

সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষদের প্রচুর সংখ্যায় চার্চের আওতায় নিয়ে আসবেন পোপ ফ্রান্সিস।

 কিন্তু আদৌ কি ঘটবে এ সব ঘটনা!

যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষরা বলেন, ব্যাখাকারেরা নিজের ইচ্ছে মতো নস্ট্রাদামুসের শ্লোকের ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা করে থাকেন। অনেক সময় Les Prophéties বইটিতে না থাকা ভবিষ্যদ্বাণী নিজেরা লিখে নস্ট্রাদামুসের নামে চালিয়ে দেন। এর প্রমাণও মিলেছে। গতবছর কিছু ব্যাখ্যাকার বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কথা নাকি বলে গিয়েছিলেন নস্ট্রাদামুস।

ব্যাখ্যাকারেরা Les Prophéties বইটিতে থাকা একটি কবিতার ইংরেজি তর্জমাও সামনে এনেছিলেন। সেই কবিতাটিতে বলা হয়েছিল,যমজ বছর আসবে (২০২০) সেই বছরে রানি (করোনা) জাগবে। যে আসবে পূর্ব দিক (চিন থেকে)। যা রাতের অন্ধকারে প্লেগ (ভাইরাস) ছড়াবে সাত পাহাড়ের দেশে (ইতালি)। গোধূলিতে মানুষের জীবনকে ধূলায় ( মৃত্যু) পরিণত করবে। পৃথিবীকে ধংস করার জন্য।”

বিশ্বজুড়ে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিলেন নস্ট্রাদামুস। এই কবিতাটির সত্যতা জানতে তদন্তে নেমেছিল সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ফরাসি ভাষার বিখ্যাত অধ্যাপক স্টিফেন গারসন নস্ট্রাদামুসের বইটি তন্নতন্ন করে ঘেঁটেও এরকম কোনও কবিতা খুঁজে পাননি।

যুক্তিবাদীরা তাই নস্ট্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণীকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেন না। তাঁরা বলেন মানুষটি চিকিৎসক হয়েও ভ্রান্ত পথের পথিক। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী মানে, “লাগলে তুক, না লাগলে তাক।” তবে যিনি যাই বলুন, এটা মানতেই হবে, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর জন্যই কিন্তু আজও খবরে আছেন ষোড়শ শতাব্দীর দুনিয়া কাঁপানো জ্যোতিষী নস্ট্রাদামুস। মৃত্যুর ৪৫৪ বছর পরেও।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More