পথের ধুলোয় বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা শেখেনি, সেই ছেলেই আজ ৯০০০ গৃহহীন মানুষের আশ্রয়

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: ২০১২ সালের কথা, রাষ্ট্রপতি ভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছে এক যুবক। মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় মঞ্চের উপর আলো আর মিডিয়ার ভিড়ে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে সে। পুরস্কার হাতে তুলে দিয়ে যেই প্রণববাবু যুবকের কাঁধে হাত রেখেছেন, সঙ্গে সঙ্গেই যেন ভেঙে গেল ধৈর্যের বাঁধ, চোখ দিয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়লো জল। দ্বিধা, লজ্জা, তার পাশাপাশি একটা অদ্ভুত ভালোলাগা, অসহায় মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে পারার আনন্দ- সব মিলিয়ে গলা দিয়ে কথা ফুটছে না তাঁর।

পুরস্কার বিতরণের পর কোচির এরনাকুলামে পাঁচতারা যে হোটেলে তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল সেই বিলাসবহুল ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে সেদিন কী ভেবেছিলেন সেই যুবক? কেরালার এই যুবক, নাম মুরুকান এস, যেকোনও অট্টালিকার সামনে দাঁড়ালে একটাই স্বপ্ন তাড়া করে বেড়াতো তাঁকে। একটা বাড়ির স্বপ্ন, ভাবতেন এমন একটা বাড়ি কোনওদিন বানাতে পারবেন কি, সব পেয়েছি’র দেশের মতো যে বাড়িতে এসে তাঁর আজন্মলালিত সব ইচ্ছে সত্যি হয়ে যাবে!

একান্ত নিজের একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কিন্তু আর পাঁচজনের স্বপ্নের থেকে অনেকখানি আলাদা ছিল মরুকানের স্বপ্ন। সেই কোন ছেলেবেলা ছেলে একটা বাড়ির স্বপ্ন তাঁর, কিন্তু নিজের জন্য নয়, তাঁর স্বপ্নের সেই বাড়ি হবে ঘরহারাদের জন্য, অনাথ হয়ে রাস্তায় ফুটপাথে পড়ে থাকে কোনও শিশুর জন্য, অসহায়ভাবে পড়ে থাকা গৃহহীন বুড়ো বাবা মায়ের জন্য। খুব সীমিত সাধ্য নিয়েও এমন একটা আশ্চর্য স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন মরুকান, চেয়েছিলেন সবার মাথার ওপরে একটা ছাদ থাকবে, চারদেওয়ালের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হবেনা গৃহহারা, অনাথ, আতুরেরাও। একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয় পাবে সবাই। বুকের মধ্যে এই একটা স্বপ্নকেই লালন করেছেন মরুকান। নিজের জীবনে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েও ৯০০০ অসহায় মানুষকে গড়ে দিয়েছেন ভালোবাসার আশ্রয়, একটুকরো ছাদের নীচে পরিবারের উষ্ণতা।

কেরালায় এক দিন আনি দিন খাই দরিদ্র পরিবারে মরুকানের জন্ম। তাঁর মা খুব কম বেতনে কাজ করতেন একটা চা কারখানায়। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটনির পর সামান্য যেটুকু আয় হত তার প্রায় পুরোটাই মদ্যপ বাবা উড়িয়ে দিতেন মদ আর জুয়ার পিছনে। যে সময়টা একটা বাচ্চার বেড়ে ওঠার সময়, সেই সময় একবেলা কোনওভাবে খেয়ে দিন কেটেছে তাঁর। পেটভরা পুষ্টিকর খাবার তো দূরস্থান, দুমুঠো ভাতও জোটেনি, দিনের পর দিন অভুক্ত থকে গেছেন ছোট্ট মরুকান। খিদেতেষ্টায় ছোট্ট শরীরটা যেন কুঁকড়ে থাকতো। ঘর বলতে একফালি টিনের চালা। সেখানেও অর্ধেক সময় ঠাই জুটতো না। দিনের প্রায় বেশিরভাগ সময়টুকুই কেটে যেত পথে পথে।

একপ্রকার বলতে গেলে ছোটো থেকেই ঘরহারা মরুকান। রাস্তার ধারে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে কখনো বা ঠাই মিলেছে অনাথ আশ্রমে। জীবন যদি শিকড়হীন হয়, তাহলে তা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তা নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছিলেন মরুকান। এমনই একটা দিন, ভাত জোটে নি, খেতে না পেয়ে রাস্তায় শুয়ে কাঁদছিল মুরুকান, সেই সময় মাভুরিস নামে এক সমাজকর্মীর চোখে পড়ে সে। সেই ভদ্রলোকই তাঁকে উদ্ধার করে তুলে নিয়ে যান ডন বস্কো স্নেহভবনে। দীর্ঘ ৯ বছর মরুকান ছিল ওই ভদ্রলোকের আশ্রয়ে। মাভুরিসের প্রভাবে তাঁর ছন্নছাড়া জীবনে এক আশ্চর্য পরিবর্তন আসে। নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে।

মরুকানের জীবনের অনেকটা জুড়েই ছড়িয়ে আছে সমাজসেবী মাভুরিসের প্রভাব। স্নেহভবন থেকে চলে আসার পরই আস্তে আস্তে কাজ খুঁজতে শুরু করেন মুরুকান। মাত্র ষোলো বছর বয়সেই তিনি যুক্ত হোন কোচির চাইল্ড লাইনের সাথে। সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে কাজ করতে শুরু করেন সেখানে। দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটে যেত চাইল্ড লাইনেই। যেটুকু টাকা তিনি পেতেন, খরচ না করে বাঁচিয়ে রাখতেন সবটাই।

চাইল্ড লাইনের কাজের পাশাপাশি টুকটাক আরও নানারকম কাজের সাথে যুক্ত হন তিনি। প্রথাগত পড়াশোনা যেভাবে না থাকায় অফিস জাতীয় কোনও কাজ কোনোদিনই করতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু কাজের ছোট-বড় বিভাজন মানতেন না তিনি। টাকা রোজগারের জন্য একসময় কী করেননি তিনি! মোট বয়েছেন, জোগাড়ের কাজ করেছেন- আর যেখান থেকে যা আয় করেছেন সমস্তটাই জমিয়ে রেখেছেন। শত প্রয়োজনেও নিজের জন্য একটা টাকা খরচ করতে হাত সরতো না তাঁর। তিনি জানতেন যেভাবেই হোক, তাঁকে একটা জমি কিনতে হবে। আশ্রয়হীন জীবনের যে কষ্ট তিনি ভোগ করেছেন, আর কোনও শিশু যেন তা না পায়!

আয় বাড়ানোর জন্য তিনি তাঁর জমানো টাকা থেকে কিছু টাকা আর বাকিটা লোন নিয়ে একটা অটো কিনলেন। শুরু করলেন অটো চালানোর কাজ। আর সেখানেই ঘটে যায় অঘটন। একদিন বাজারে অটো নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মুরুকান, হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে ফুটপাতের উপর থেকে একটা ছোট ছেলেকে জোর করে অটোতে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে কিছু লোক। আসলে ছেলেটাকে দিয়ে ভিক্ষা করানোর জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছিল কিছু দুষ্কৃতি। ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য মুরুকান অটো নিয়ে তিনি ধাওয়া করেন ওই লোকগুলোর পিছনে। শেষমেশ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে বাচ্চাটাকে রেখে পালিয়ে যায় গুন্ডারা। কিন্তু মুরুগান জানতেন না, ওই লোকগুলো ছিল এক কুখ্যাত গ্যাংয়ের সদস্য। পরদিন তাঁরা ফিরে আসে প্রতিশোধ নিতে, মুরুকানের অটো খুঁজে বের করে ভেঙেচুরে শেষ করে দেয় গুন্ডাবাহিনী। এত বড় ক্ষতির পরেও আশ্চর্যভাবে মুরুকান ছিলেন শান্ত, কোনওরকম হিংস্রতার পথ অবলম্বন করেননি তিনি।

যৌবনে ভালোবাসার মানুষের সাথে বিবাহসুত্রে আবদ্ধ হন মুরুকান। বিয়ের সময় তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন ভালোবাসা ছাড়া বোধহয় আর কিছুই দেবার ক্ষমতা নেই তাঁর। কারণ আর পাঁচজন স্বামীর থেকে অনেক আলাদা তাঁর জীবনের লক্ষ্য। এসব কথা শুনলে অন্য স্ত্রীদের প্রতিক্রিয়া কী হত বলা শক্ত, কিন্তু মুরুকানের স্ত্রী একটুও হতাশ হননি তাতে। বরং দ্বিগুন উৎসাহে স্বামীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কর্মযজ্ঞে। নিজে যতটুকু পেরেছেন রোজগার করে তুলে দিয়েছেন স্বামীর হাতে, পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছেন প্রতি পদক্ষেপে।

ভালোবাসার জন যখন পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন বোধহয় অসাধ্য সাধন করতে পারে মানুষ। অন্তত মুরুকান পেরেছিলেন। তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে এভাবেই একদিন তিনি কোচিতে বানিয়ে ফেললেন একটা নন প্রফিট অর্গানাইজেশন, থেরুভোরাম। সম্পূর্ণ নাম, ‘থেরুভোরা প্রবর্তক অ্যাসোসিয়েশন’। ২০০৭ সালে এই অর্গানাইজেশন রেজিস্টারড হওয়ার পর থেকেই বদলে গেছে অন্তত ৯ হাজার মানুষের জীবন।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে ঘরহীন শিশু ও বয়স্কদের তুলে এনে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে এই সংস্থা। বহুদিন ধরে লালিত মুরুকানের স্বপ্ন আকার পেয়েছে। এই কাজের সর্বেসর্বা মুরুকান হলেও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আরও কিছু সহৃদয় মানুষ। তাঁদের সকলের চেষ্টায় মাথার উপর ছাদ পেয়েছে বেশ কিছু অনাথ শিশু আর বৃদ্ধ। সবাই মিলে একটা বড়সড় পরিবার হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন মুরুকান দেখেছিল, তার একটা অংশ পূরণ হইয়েছে বটে, কিন্তু থেমে থাকার মানুষ নন মুরুকান। উলটে আরও অনেক বেশি মানুষের মাথার উপর ছাদ গড়ে দেবার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নতুন উদ্যমে।

২০১২ সালে পাওয়া রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের টাকা দিয়েই বানিয়ে ফেললেন একটা ট্রাস্ট, থেরুভোরার নামেই। গভর্নিং কাউন্সিলের ১১ জন সদস্যকে নিয়ে তৈরি হল টিম। শুরু হল নতুন নতুন কাজের পরিকল্পনা। শুধু আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়াই নয়, থেরুভোরা এখন পুরোদমে কাজ করছে রাজ্যজুড়ে। পুলিশ, হাসপাতাল এদের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে চলছে একটা টিম। নিরাশ্রয় কোনো ব্যক্তিকে অসুস্থ দেখলেই তাদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, গরীব অসহায়দের বাড়িতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, এমনকি বাচ্চাদের অবৈধভাবে পাচার বা কম বয়সে তাদের দিয়ে কাজ করালে পুলিশে রিপোর্ট করা থেকে শিশুদের পুনর্বাসন দেওয়া, সব নিয়ে অন্ধকার থেকে তাদের আলোয় ফেরানোর চেষ্টা করে চলেছেন সবসময়।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More