প্রকাশ্যে প্রোৎসাহ, গভীরে মায়া– ‘বিদ্রোহী’র একশো বছর

0

পার্থজিৎ চন্দ

একশো বছরের ওপার থেকে জেগে উঠছে একটি কবিতা; মনে রাখা জরুরি, কোনও পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ নয়, কোনও পুরস্কার-প্রাপ্তির শতবর্ষ নয়… একটি কবিতা লিখিত হওয়া ও প্রকাশিত হওয়ার একশো বছর। অবশ্য ‘জেগে উঠছে’ শব্দ দু’টি প্রতারক, কারণ এ কবিতাটির থেকে বেশি ‘জীবন্ত’ কবিতা বাংলা ভাষায় আর একটিও আছে কি না সন্দেহ। গত একশো বছরে তথাকথিত ‘সেরিব্রাল’ গবেষক, ‘বিশেষ’ রুচির পাঠক এ কবিতার কবিকে নিয়ে বিস্তর ঢোঁক গিলেছেন। গোপনে নস্যাৎ করে দিয়ে প্রকাশ্যে aberration ইত্যাদি বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। একাডেমিক পরিসরের বাইরে তাঁর এবং এই কবিতাটির অভিঘাত এতটাই তীব্র যে ধীরে ধীরে স্বীকার করে নিতে হয়েছে। পৃথিবীর মাটি থেকে দু’-একজন ঈর্ষার তির ছুড়তে চেয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে। কারণ পৃথিবীর থেকে ছোড়া বিষ-তির ধূমকেতুর কাছ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায় না। 

‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখিত হওয়ার শতবর্ষ কয়েকদিন আগে অতিক্রম করেছি আমরা। আর কয়েক ঘণ্টা পর তার প্রকাশের শতবর্ষ অতিক্রম করে যাব। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় কী রয়েছে এই কবিতাটির ভেতর, কী থাকে একটি শতবর্ষ-অতিক্রম করে যাওয়া প্রবলভাবে আদৃত কবিতার ভেতর, যা তাকে আয়ু দেয়? এই জাদুর সন্ধান পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? নাকি সন্ধান যে পাওয়া যাবে না, কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনার পরিসর নির্মাণ করে ভাবব উত্তর মিলে গেছে অথচ ‘উত্তর’ কোনওদিন পাওয়া যাবে না, এটিই সত্যি?

‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি যে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের একদম শেষ দিকে ‘কাকাবাবু’ মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের ৩/৪ সি তালতলা লেন, কলকাতা-১৪ ঠিকানায় বসবাস কালে এক রাত্রে লিখিত হয়েছিল সে তথ্য সবারই জানা। বেশ কিছু বিতর্কের অবসান না-হলেও বা অবসান করতে কোনও কোনও পক্ষ উৎসাহী না-হলেও এটি অধিকাংশ মানুষ জানেন যে এই কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রী অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য-সম্পাদিত ‘বিজলী’ পত্রিকায় ৬ জানুয়ারি, ১৯২২ সালে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অভূতপূর্ব আলোড়ন ও পাঠকের চাহিদায় ‘বিজলী’র পরপর দুটি সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়। এ পর্যন্ত তথ্যে নতুন কিছু সংযোজন নেই; এবার বরং ‘বিদ্রোহী’র অন্দরমহলে প্রবেশ করে দেখা যাক কী কী বিষয় তাকে কবজকুণ্ডল প্রদান করেছে। 

নজরুলের কবিতা নিয়ে জীবনানন্দ দাশের গদ্য আছে, সেখানে তিনি শান্ত অথচ স্পষ্টভাবে নজরুলের কবিতা সম্পর্কে তাঁর ‘অনুচ্চ’ ধারণার কথা লিখে গেছেন। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির সঙ্গে জীবনানন্দের একটি অভ্রান্ত পর্যবেক্ষণের আশ্চর্য মিল আবিষ্কার করে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। কবিতাটি লিখিত হবার একশো বছর পর আজ মনে হয়, জীবনানন্দের ‘দেখা’ ও নজরুলের ‘প্রয়োগ’ কালের বিশেষ দাবিকে পূর্ণতা দিয়েছে। নজরুলের মতো এক স্বরের অপেক্ষায় ছিল সে সময়ের বাংলা কবিতা, যাঁর হাতে লিখিত হবে এ কবিতা।
জীবনানন্দ তাঁর ‘কবিতার আত্মা
ও শরীর’ প্রবন্ধে লিখছেন, ‘মাত্রাবৃত্ত মুক্তকের উদাহরণ বাংলা কবিতায় বেশি নেই; – এই যুগের অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতা দমন করবার জন্যে সর্বব্যাপী নিপীড়নের যে পরিচয় পাওয়া যায় রাষ্ট্রে ও সমাজে– সেইটে কাব্যের ছন্দালোকে নিঃসংশয়-রূপে প্রতিফলিত হলে মাত্রাবৃত্ত মুক্তকের জন্ম হয় কি না ভেবে দেখা যেতে পারে।’
একজন ক্রান্তদর্শী কবির উচ্চারণ যে কত অমোঘ হতে পারে তা বোধহয় প্রমাণ হয়ে যায় ‘বিদ্রোহী’র মধ্যে দিয়েই। আশ্চর্যজনকভাবে ‘বিদ্রোহী’ লিখিত হয়েছে মাত্রাবৃত্ত মুক্তকে।

‘বিদ্রোহী’র একটি দিক যদি এভাবে সংযুক্ত হয়ে থাকে জীবনানন্দের সঙ্গে তবে আরেকটি দিক, অনেক সমালোচকের মতে, অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত হয়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’র ‘আমি ঢালিব করুণাধারা,/ আমি ভাঙিব পাষাণকারা,/ আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া/ আকূল পাগল-পারা’ অংশটি বারবার পড়ে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র অন্দরমহলে প্রবেশ করলে অনুভব করা যাবে হয়তো কোথাও একটি তারার আলো এসে পড়েছিল নজরুলের কবিতাটির গায়ে।

কিন্তু এটিও স্পষ্টভাবে বলা দরকার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে এমন কিছু উপাদান ও বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে যা পূর্বাপর বাংলা কবিতায় অনুপস্থিত। লক্ষণীয় কবিতাটি শুরুই হচ্ছে স্পষ্ট ঘোষণা ও আহ্বানের মধ্যে দিয়ে। প্রথম চারটি পঙক্তি’র পর পঞ্চম লাইনে উল্লম্ফন ঘটে জাগতিক সীমা ছাড়িয়ে সেটি মহাজাগতিক স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে, ‘বল ‘মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’ / চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/ খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!’। 

এবং এই জায়গাটিতে এসেই সুনিশ্ছিত হয়ে গেল বাংলা কবিতায় এক তরুণ কবি সম্পূর্ণ নতুন ধরণের ‘আধুনিকতা’র জন্ম দিতে চলেছেন। দর্শনগত দিক থেকে এই আধুনিকতার মূল্য অপরিসীম। ‘বিদ্রোহী’র প্রথম দশটি পঙক্তি’র মধ্যেই নজরুল সৃষ্টির কেন্দ্র থেকে ‘ঈশ্বর’ নামক ধারণাটিকে অপসারণ করে ‘মানুষ’কে স্থাপিত করেছিলেন। পাশ্চাত্যের নানা মিথ-এ ‘ডেভিল’কে ঈশ্বরের প্রতিস্পর্ধী অবস্থান প্রদান করে আধুনিকতার যে ধারা তৈরি হয়েছিল নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ তার থেকে আবার বহুলাংশে পৃথক। কারণ কবিতাটিতে বারংবার মিথের যে বিনির্মাণ হয়েছে তার ভেতর দিয়ে যাবার সময় দেখা যাবে নজরুলের পৃথিবী ‘ইউনিপোলার’ নয়; তাঁর পৃথিবীর মধ্যে ঘনিয়ে রয়েছে ‘অদ্ভুত’ juxtaposition, পরস্পরবিরোধী নানা উপাদানের এক বিরল ও সার্থক সংশ্লেষ।এই কবিতাটির সব থেকে বড় লক্ষণ ও কবজকুণ্ডল সম্ভবত আপাত-নৈতিকতার ঘেরাটোপ থেকে বাংলা কবিতাকে মুক্তি দেওয়া। নজরুল যে শিল্পের প্রশ্নে ‘নৈতিকতা’ নামক ধারণার কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন না, তা আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল। শিল্প যে আসলে পবিত্র ‘অ্যনার্কিজম’কে সার্থকভাবে ধারণ করে থাকে, একটা সময়ের পর সেই অ্যনার্কিজম’ও যে তার প্রভা বিচ্ছুরণ করতে পারে, শিল্পের সঙ্গে তথাকথিত ‘নৈতিকতা’র যে কোনও সম্পর্ক নেই তা বোধহয় মাইকেল-এর পর এতটা বৃহৎ পরিসরে সুস্পষ্টভাবে আর কেউ দেখাননি। ‘বিদ্রোহী’ পড়তে গিয়ে ও আলোচনা করতে গিয়ে তার ভেতর ব্যক্তির স্বাধীনসত্তার আগ্নেয়গিরি’র মতো বিস্ফোরণের দিকে যতটা নজর দেওয়া হয় ততটা নজর আজও দেওয়া হয় না সার্থকভাবে বুনে দেওয়া এই ‘অ্যনার্কিজম’-এর দিকে। অবলীলায় আমাদের নজর এড়িয়ে যায় একজন কবির উচ্চারণ, ‘আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, / মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস, / আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর।’ কী অসম্ভব ‘নৈরাজ্যময়’ উচ্চারণ, যখন তিনি বলেন, ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,/ করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা।’ প্রাণের ও যাপনের রুদ্ধতা অতিক্রম করবার জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘আরব বেদুইন’ হয়ে ওঠবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, কিন্তু একজন অনুভূতিশীল মানুষের পক্ষে ‘চেঙ্গিস’ হয়ে ওঠার চিন্তাটি ভাবনার উদ্রেক করে। কারণ এর পরের পঙক্তি’তেই আবার নজরুল লিখছেন, ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’। ‘চেঙ্গিস’ ও ‘কুর্নিশ’-এ ধ্বনিগত সাদৃশ্য আছে, কিন্তু শুধুমাত্র সে সাদৃশ্য বজার রাখার জন্য কবি এ প্রয়োগ করেছেন এমন ভাবনা ভাবতে ইচ্ছা করে না। উদাহরণের তালিকা দীর্ঘ করাই যায়, আপাতত সে তালিকা না বাড়িয়ে আর মাত্র একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। নজরুল লিখছেন, ‘আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,/ আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!’ ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ একাধারে বহুকিছুর সমাহার; কিন্তু আত্মঘোষণার মধ্যে দিয়ে ‘অন্যায়’ রূপটিকেও বুনে দেওয়া অকল্পনীয়।

‘বিদ্রোহী’ যত এগিয়েছে তত দেখা গেছে নজরুল আসলে এই ‘নৈরাজ্যময়’ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রেমের ও দ্রোহের আলোকিত বিশ্ব। সমস্ত কবিতাটি জুড়ে তিনি যে শ্বাসরোধী ‘টেনশন’ বুনে চলেছিলেন তার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল একটিই – সমস্ত বিরোধ অতিক্রম করে মানুষের চির-বিজয়পতাকা উড়িয়ে দেওয়া। 

‘বিদ্রোহী’-তে যেমন রয়েছে শ্বাসরোধী টেনশন ঠিক তেমনই রয়েছে পাঠকের জন্য অনন্ত স্পেস। কবিতাটির ভেতর সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায় একজন বিদ্রোহীর পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে একজন তীব্র প্রেমিক। বিধবার বুকে ক্রন্দন শ্বাস থেকে কুমারীর প্রথম পরশ পর্যন্ত তার বিস্তার।বিদ্রোহ, প্রেম, অবলীলায় ব্যবহার করা ‘হর্দম হ্যায় হর্দম, ভরপুর-মদ’ ইত্যাদির বাইরে বেরিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় ‘বিদ্রোহী’ কি একজন কবির আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে উদ্ভুত? না কি এটিও প্রকাশগতভাবে পৃথক, কিন্তু চরিত্রগতভাবে এক ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’? পরমুহূর্তে গভীরতর পাঠে গিয়ে উপলব্ধি করা যায়, ‘বিদ্রোহী’ আত্মপরিচয়ের সংকটের থেকেও বেশি আত্ম-আবিষ্কারের আনন্দ। সত্তার হাজারো টুকরো থেকে উৎসারিত হওয়া আলোর অভিসারী প্রক্রিয়া। 

এই অভিসারী প্রক্রিয়াটিই আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে একশো বছর। কবিতাটির মধ্যে আগ্নেয়গিরি’র অগ্নুৎপাত লক্ষ করে আমরা স্তম্ভিত হয়েছি কিন্তু ভেবে দেখিনি যে কী ভীষণ বিপদজনক উচ্চতায় একটি সরু দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন এর স্রষ্টা। তিনি পলিটিক্যালি কারেক্টনেসের ধারকাছ দিয়ে হাঁটেননি, আবার লজিক্যালিটিকে পুরোপুরি বিসর্জন দেননি। তত্ত্বের নির্ধারিত সীমা ভেঙে দিয়েছেন, পাশাপাশি আবহমান শুভবোধের কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর অন্তিম আত্মঘোষণা, ‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর – / আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!’– এক-হাজার বারের মধ্যে ন’শো নিরানব্বই বার ব্যর্থতামাখা উচ্চারণ হতে বাধ্য। কিন্তু নজরুলের হাতে সেটিই আশ্চর্য সফল।
এ যেন অনেকটা বিশাল অরণ্য থেকে
 অন্ধকারে তুলে আনা কয়েকটি বুনোফুল, যা শিল্পের অন্তর্লীন শর্তে তৈরি করবে একটি আশ্চর্য মালা।

সব শেষে আরেকটি ভাবনার হাত’ও এড়ানো যায় না; এই তীব্র উচ্চারণ, বিশেষ করে বারবার ‘আমি’র উল্লেখ কি আরও কোনও গভীরতর বিপন্নতা ও অভিমান থেকে উৎসারিত, যাকে শুধু আত্মপরিচয় ইত্যাদির নিরিখে বিচার করা যাবে না? কোন সে অভিমানের রাত্রি-হ্রদ যার বাঁধ ভেঙে ঘটে এমন প্লাবন!
‘বিদ্রোহী’ পড়বার পর
শুধু যে রক্তে দোল লাগে তাই নয়, এক ‘যুক্তিহীন’ মায়া, অভিমান, এমনকি বিষণ্ণতা’ও ছেয়ে ফেলে আমাদের।

প্রকাশ্যে প্রোৎসাহ অথচ গভীরে মায়া – শতবর্ষ অতিক্রম করে যাবার পক্ষে এ দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আজ।  

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.