ক্যান্সার, কুসংস্কার ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

অরুণিমা চৌধুরী

 

সামনেই বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। সেই উপলক্ষ্যে কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলব।
ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার নিরিখে আমার দেখা সমাজ ও ক্যান্সার সচেতনতার কথাগুলো দুয়েকটা ঘটনার মাধ্যমে বলি!

কেউ বা কারা, আমার রোগ পরবর্তী সময়ে,তাঁদের বাড়িতে আলাদা বোতলে জল খেতে দিয়েছিলেন। বোতলটি সরিয়ে রেখে, পরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

শুভ অনুষ্ঠানের মঙ্গলাচরণে আমাকে ডাকা হয় না।অনেকেই মনে করেন, আমি অলক্ষুণে।

অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, “ক্যান্সারের জীবাণুটা কি পুরোপুরি চলে গেছে!”

-“আঠেরো বছর ধরে টিউমার ছিল! তখন থেকেই তোমার ক্যান্সার ? ধরতে পারোনি!”

আমার কোলে কোনও শিশুকে দেওয়া হয়না।

পাড়ার কিছু মানুষকে দেখেছি, কোনও কাজে বেরোনোর আগে, আমার মুখোমুখি পড়ে গেলে, তাঁরা ঘরে ঢুকে, আবার যাত্রা করেন বা কোনওমতেই আমার চোখাচোখি হন না।

এই ঘটনাগুলো কমবেশি ক্যান্সার যুদ্ধে জয়ী অনেক মানুষের সঙ্গেই ঘটে। আড়ালে চলে ফিসফাস কথা। হয়ত আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বদলাবে না, বা এদের অশিক্ষার দায় ঘাড়ে নিয়ে আমি নতুন করে আর মুষড়ে পড়ব না।

বরং ভুলগুলো ভেঙে দিতে একটা পরিষ্কার আলোচনা চালিয়ে যাব।

ব্রেস্ট ক্যান্সার তো দূর, কোনও ক্যান্সারেরই কোনও জীবাণু হয় না। বংশগতভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সারের একটা রিস্ক অবশ্যই থাকে। তবে আমার বংশে কারো ব্রেস্ট ক্যান্সার বা কোনও ক্যান্সারই হয়নি। জিন মিউটেশন বা জিনের গঠন ও চরিত্রে আকস্মিক বদলের কারণে ব্রেস্ট ক্যান্সার হতে পারে। হরমোনের কিছু কমবেশি হলে ব্রেস্ট ক্যান্সার হতে পারে। কিছু প্রোটিন ব্রেস্ট টিস্যুতে বেড়ে গেলেও হতে পারে। মোদ্দা কথা কী কী হলে হতে পারে, আর কী কী না হলে হয়না, দুটোর লিস্ট দৈর্ঘ্যপ্রস্থে সমান। কিন্তু কোনভাবেই কোনও জীবাণু সংক্রমণ ক্যান্সারের কারণ নয়, বা আজ পর্যন্ত সেরকম কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ক্যান্সার আর ছোঁয়াচে রোগের মধ্যে অনেক ফারাক আছে। না, আমাকে ছুঁলে ক্যান্সার হবে না। আমার ছোঁয়া জিনিস কেউ স্পর্শ করলে কারও ক্যান্সার হবে না। এইডস আর ক্যান্সার এক নয়! যাঁরা আমার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সরে থাকলেন, তাঁদের একবার ভাবা উচিত, আমার পরিবার তাহলে কীভাবে সুস্থ রইল এখনও!

দ্বিতীয় কথা, বেশিরভাগ ক্যান্সারই এক মারাত্মক আগ্রাসী রোগ। চিকিৎসা না করে ফেলে রাখলে আঠেরো বছর তো দূর, আঠেরো মাসও আমি বাঁচতাম না। ছ’ মাস সময় পেতাম কি না বলা মুশকিল।

অনেক সময় মহিলাদের স্তনে একটি, বা অনেকগুলি নির্দোষ মাংসপিণ্ড দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। একজন ডাক্তারই পরীক্ষা করে বলতে পারবেন, সেটি নির্দোষ, না ক্ষতিকারক।

ফাইব্রো অ্যাডেনোমা নামক, নির্দোষ মাংসপিণ্ডগুলোরও মাত্র এক শতাংশ ক্ষেত্রে কোষের গঠনে আচমকা পরিবর্তন এসে ক্যান্সার দেখা দেয়।

আপনি কি ওই এক পার্সেন্টের ভরসায় ফেলে রাখবেন, না কেটে ফেলে আপদ বিদায় করবেন, সেটা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু হোমিও, নেচারো, অ্যারোমা, আয়ুর্বেদ, বা বিখ্যাত বাবাপ্যাথি করার আগে দয়া করে একবার অবশ্যই একজন সার্জেন বা ব্রেস্ট থেরাপিস্ট দেখিয়ে নিন।

এক্ষেত্রে একটি গল্প বলি, গত বছর এক ভার্চুয়াল ‘বন্ধু’র সঙ্গে তর্ক হচ্ছিল, তাঁর দাবি, হোমিওপ্যাথি করলে আমি পুরোপুরি সেরে যেতাম। আমি বললাম, আমার ক্লিনিকাল রিপোর্টস দেখাচ্ছে আমি একশ শতাংশ রোগমুক্ত। তিনি বললেন, “না, তুমি হোমিও খাও, আর রোগ রেকার করবেই না”… এত জোর দিয়ে কেউ বললেই আমার শক্ত, জেদি ঘাড় বেয়াদপি করে বসে।

বললাম, “বেশ, তাহলে একটা রোগী দেখাও, যিনি কোনরকম অ্যালোপ্যাথি ট্রিটমেন্ট ছাড়াই আমার সমান সময় শুধু হোমিওপ্যাথি করে বেঁচে আছেন!”

উনি বললেন, “এই তো, অমুকের মা ভালো ছিলেন, রিসেন্টলি মারা গেলেন।”

আমি বললাম, “ভাই! কোথায় হয়েছিল তাঁর অসুখ?”

উনি দাবি করলেন, এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলে বসলেন, “প্রোস্টেটে।”

যে মহিলার প্রোস্টেট ছিল, আবার সেই প্রোস্টেটে ক্যান্সারও হয়েছিল, সেই বিরলতম ব্যক্তির মৃত্যুর খবরে কিছুক্ষণ রোমাঞ্চিত, শোকস্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ রইলাম।

তারপর বললাম, “ভাই, তুমি একটু খোঁজ নিয়ে কাল জানিও, ওটা বোধহয়, জরায়ু বা মূত্রথলির ক্যান্সার ছিল”।

কিছু মানুষ না জেনে, অনেক কিছু জানার দাবি করেন। কিছু মানুষ অর্ধেক জেনে অনেক বেশি বোঝার দাবি করেন এবং সেই অজ্ঞতায়, কিছু মানুষ বেঘোরে মরেন। আমি ঠিক এই জায়গাটাতেই আঘাত করতে চেয়েছি বারবার।

যখন কেমো স্টার্ট হল, আমি অসুস্থ ছিলাম, কিন্তু আমার কখনও চুপচাপ শুয়ে বসে থাকা ধাতে ছিল না। অনেক পড়তাম,অনেক…

নেট খুলে রাজ্যের নির্ভরযোগ্য তথ্য বের করে, যেটুকু শিখেছি, জানতে চেয়েছি, সেটুকু নিজের জন্যেই ছিল। কোনও তথ্য আশার আলো দেখায়নি। আমার ডাক্তারবাবুকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম, “স্যার! আমি কতদিন বাঁচব? ” উনি বলেছিলেন, “আমি কি জ্যোতিষী! ট্রিটমেন্ট হোক। পরিসংখ্যান বলছে সুস্থতার চান্স সত্তর শতাংশ”…

আমি তখনও দেখিনি, তখনও জানিনি, যে আমি ট্রিপল নেগেটিভ, আমি ইয়ং অ্যাডাল্ট। প্রথম কেমোর দিন, মুম্বই থেকে রিপোর্ট এল আমার সব নেগেটিভ। ডাক্তারি পরিভাষায় সব নেগেটিভ ভালো হলেও, ট্রিপল নেগেটিভ নয়। ট্রিপল নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যান্সারের মানে, অপারেশন, কেমো, রেডিয়েশন ছাড়া তোমার সামনে আর কোনও টার্গেটেড থেরাপি নেই। তাই, রেকারেন্স রেট বেশি, বা সার্ভাইভাল রেট খুব কম।

আমার ফোনে ততক্ষণে দেখে নিয়েছি, মাত্র ১৩% সার্ভাইভ্যাল রেট। ডাক্তার বিকেলের রাউন্ডে আসামাত্র ঘাড় গোঁজ করে বলেছিলাম, “আমি তো মরেই যাব জানেন, তাহলে কেমো দিচ্ছেন কেন?”

সেদিন ডাক্তারবাবু বুঝিয়েছিলেন, কীভাবে আমি খুঁজবো আশার আলো! কী কী পড়ব, আর কী কী পড়ব না, শুনব না। তারপর থেকে টানা তিন বছর ধরে নিন, একধরনের গবেষণাই করেছি। গোরু খোঁজাই বটে। কোথাও কোনও আশার আলো নেই। সবজায়গায় শুনছি, আমি মরে যাব। যত শুনছি, তত জেদ চেপে যাচ্ছে, কীসে মরব জেনে মরি!

সেইসময় কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইতাম না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত না। আমাকে কেউ বলেনি, আমি বাঁচব । ডাক্তারও পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। তবু তাঁর অতিব্যস্ত শিডিউলের মধ্যেও ফোন, মেলের রিপ্লাই দিয়েছেন। তিন বছর কাটিয়ে ওঠার পরে, তিনিই হেসে ফেলেছেন, “কী রে! তোর তো দু বছরের মধ্যে মরে যাবার কথা ছিল! তোর মতো এতো প্রশ্ন আমায় কেউ করেনি।”সেই সময় খুঁজে খুঁজে একজন অন্তত কেউ TNBC সার্ভাইভর এর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি, যিনি ভারতীয়। পাইনি। ব্যক্তি জীবনে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, যা লজ্জায় ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। নেট খুঁজেও হয়ত উত্তর পাইনি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপেন প্ল্যাটফর্মটুকু বেছে নিয়েছি, আমার মতো হাতড়ে বেরানো কেউ যদি থাকেন… কিছু যদি উপকারে আসে আমার এই ভয়ংকরতম স্তনরোগের অভিজ্ঞতা ও সেই সংক্রান্ত খুঁটিনাটি!

মঙ্গলাচরণ আমি নিজেই করিনা, যে ঈশ্বর আমায় জবাব দিতে পারেনি, “আমিই কেন? আমারই কেন?”  যে ঈশ্বর ভেট চড়ালে আশীর্বাদ করে, সে ডোমেরও, ডাক্তারেরও। সে তবে আমার নয়। তাই, কেউ মঙ্গলাচরণে না ডাকলেই বরং, অতিনাটকীয় ‘ভান’ থেকে বেঁচে যাই।

আমার ছেলে টানা ন’বছর ব্রেস্টমিল্ক খেয়েছে। আমার অসুখের সময় ওর বয়স ছিল ৯। ডাক্তারি পরীক্ষায় কিছু বাঁধাধরা প্রশ্নের উত্তরে, এই কথা জানতে পেরে, ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, ছ মাসের পর, বাচ্চার চোয়ালের চাপে ব্রেস্টের কোষের গঠনে পরিবর্তন আসা আশ্চর্য নয়, আমি ভুল কাজ করেছি। বুকে কোনওরকম মাংসপিণ্ড থাকলে জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। (আশাকরি জানেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি টানা তিনমাস খেয়ে আবার তিনমাস গ্যাপ দিয়ে খেতে হয়!) রেয়ার ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়েও কলকাতা ছেড়ে কোথাও চিকিৎসা করাতে যাইনি।

আজ ঠিক দশ বছর সুস্থ আছি, মরে গেলেও আফশোস থাকবে না। আমি জানি, ক্যান্সার কথাটায় একটা শব্দ লুকিয়ে আছে, সময়। বারবার হাসপাতাল, ডাক্তার পরিবর্তন করে যত সময় নষ্ট হবে, তত আয়ুরেখাও কমবে….

একদম শেষে বলি, মেয়েটা কার? বোনটা কার?বউটা কার? বাপের বাড়ির? শ্বশুরবাড়ির? না আপনার? সময়ে সচেতন হোন। রোগ হলে তার চিকিৎসা আছে। তাই বলে, ” যদি FNAC করলে ক্যান্সার ধরা পড়ে? যদি বায়োপসি করলে রোগ ধরা পড়ে? আমিতো মরেই যাব “.. গোছের কথা সহানুভূতি উদ্রেক করে পায় না, উলটে মৃত্যু ত্বরান্বিত করে। আমি মনে করি, যে মানুষ সাক্ষাৎ মৃত্যু সঙ্গে তুমুল লড়াই সেরে ফিরে এলেন, তিনি অলক্ষুণে নন, বরং তিনিই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গা।ভালো থাকুন, রোগ ছোঁয়াচে নয়, ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ছোঁয়াচে।অর্ধেক জেনে সবজান্তা হবেন না, ডাক্তার আর গবেষক ছাড়া আমরা কেউ কিচ্ছু জানিনা। রোগ পুষে রাখলে মনে রাখবেন কেউটে নিয়ে ঘুমোচ্ছেন। তাই, আমায় অচ্ছুত রাখুন, ক্ষতি নেই। কিন্তু রোগ সম্বন্ধে জেনে লড়াই করে তবেই হারুন বা জিতুন।

 

লেখিকা অরুণিমা চৌধুরী, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। পেশা হস্তশিল্প। নেশা লেখালেখি। লক্ষ্য কর্কট রোগ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা। বিশ্বের সবথেকে আগ্রাসী স্তনকর্কট থেকে মুক্ত আছেন আজ দশবছর।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More